তারপর? আগ্রহে ফ্রান্সিস বলে উঠল।
এক অন্ধকার রাতে ওরা পাঁচজন ঐ পথে অসম্ভব কষ্ট করে ঐ পাহাড়ের মাথার গাছটার কাছে পৌঁছেছিল। ঝুঁকে পড়া গাছটার ডাল ধরে ধরে তিনজন নাকি উঠছিল। পালাবার আনন্দে উত্তেজনায় ওরা তিনজনই ডালটা ধরে একসঙ্গে উঠতে গিয়েছিল বোধহয়। ডাল ভেঙে তিনজনের সঙ্গে বন্ধুটিও একবারে নীচে পাথরের মেঝের ওপর আছড়ে পড়েছিল। কেউ বাঁচেনি।
ফ্রান্সিস খুব মন দিয়ে শুনছিল। বলল–তাহলে ওপরে ওঠার একটা উপায় আছে।
হ্যাঁ। কিন্তু সেইঝুঁকে পড়া গাছটা পরদিনই যোদ্ধারা কেটে ফেলেছিল। আস্তাসো বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল। বলে উঠল, অবমানে ওপর থেকে নেমে গাছটা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়।
নিশ্চয়ই। নইলে ওরা ওপর থেকে নেমে এসে গাছটা কাটল কী করে? আস্তাসো বলল।
ওপরে ওঠার রাস্তাই বলুন আর উপায়ই বলুন–সেটা ওরা নেমে এসে নষ্ট করে দিতে পারেনি। ফ্রান্সিস বলল।
না। তা পারেনি। আস্তাসো অন্ধকারে মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিস আবার ঠেস দিয়ে বসল। দু’চোখ বোজা। একটু অপেক্ষা করে আস্তাসো বলল কী হল?
ছক কষা বোঝেন তো? ছক কষছি। পালাবার ছক। তবে তার আগে ঐ গোড়াকাটা গাছটা পর্যন্ত পৌঁছোত হবে। ফ্রান্সিস থেমে থেমে বলল।
পাগলামি করবেন না। ঐ মৃত্যুর দৃশ্য দেখলে
আস্তাসোকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠল–এইখানে এভাবে থেকেও কি বাঁচার আশা রাখেন?
দেখুন–খলিফা হাকিমকে তো দেখেছেন। তাঁর দরবারও দেখেছেন। তার কাছ থেকে উজির কিন্তু সব কিছু গোপন রাখে। আস্তাসো বলল।
তাহলে তো খলিফা হাকিমের কানে আমাদের এই নরকবাসের কথা পৌঁছবেই না। ফ্রান্সিস বলল।
কোনোদিন হয়তো কোনো কারণে শুনতে পারবেন। সেটাই একমাত্র আশার আলো। আস্তাসো বলল।
ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল–দেখুন। আপনার চেয়ে অনেক বেশি দ্বীপ, দেশ আমি ঘুরেছি। নিষ্ঠুর হত্যাকারী প্রবঞ্চক মিথ্যেবাদী হীনমনা মানুষ অনেক দেখেছি। আমি মানুষের মুখ দেখে কথা শুনে সহজেই তার চরিত্র বুঝতে পারি। অবশ্য উদার মনের দয়ালু মানুষও দেখেছি। সংখ্যায় কম। তবে এঁরা আছেন বলেই মানুষের জীবন সুন্দর, পৃথিবী বাসযোগ্য। বলুন–তাই কি না? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
আপনার অনেক অভিজ্ঞতা আছে দেখছি। একটু অবাক হয়ে আস্তাসো বলল।
অভিজ্ঞতা থেকে বলছি–উজির ইয়েপুদা ক্ষমতালোভী, অর্থপিশাচ। ও যে কেন খলিফা হাকিমকে মেরে ফেলেনি সেটাই ঠিক বুঝতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে পালাবার জন্যে তো আপনাকে ঐ পথটা খুঁজে বের করতে হবে এবং ছক কষতে হবে। আস্তাসো বলল।
অবশ্যই। খোলা আকাশের নীচে তো কম রাত কাটেনি। দেখেছি–তারার আলো খুব অস্পষ্ট হলেও চোখের সামনে অনেক কিছু দেখা যায়। খোঁজ পাবোই। ফ্রান্সিস বলল।
এক কাজ করুন না। আর তেরো দিন পরে পূর্ণিমা পাবেন। আস্তাসো বলল।
এত নিশ্চিত হয়ে বলছেন? ফ্রান্সিস বলল।
দিনরাত তো ওপরের ঝুঁকে পড়া গাছের ডালপাতার মধ্যে দিয়ে সূর্য-চাঁদের আকাশ দেখে হিসেব রাখতে ভালোবাসি। সময়ও বেশ কাটে। আস্তাসো বলল।
আবার জলঝড়ের আকাশও দেখতে হয়। ফ্রান্সিস একটু হাসল।
তখন পাথুরে মেঝেতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি। গায়ের ভেজা পোশাক গায়েই শুকোয়। আস্তাসোও অন্ধকারে হাসল।
আস্তাসো আমার অতদিন অপেক্ষা করবার মতো সময় নেই। যত দ্রুত পারি। পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
কী আর বলব? আস্তাসো উঠে চলে গেল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। চোখ বুজল। যাক একটা ক্ষীণ আশার রেখা দেখা যাচ্ছে। কাল রাতের অন্ধকারে কাজে নামতে হবে। দুপুরের কড়া রোদে তেতে ওঠা পাথরের মেঝে যেমন গরম রাতে তেমনি ঠাণ্ডা। ফ্রান্সিস কোমরে ফেট্টির কাপড়টা খুলে গায়ে যতটা পারল জড়াল।
পরের দিন সকালে শাঙ্কো জিগ্যেস করল–আস্তাসোর সঙ্গে কথা হল? ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল। তারপর সব কথা বলল।
তাহলে তো একবার চেষ্টা করতে হয়। শাঙ্কো বলল।
আজ রাতের অন্ধকারে খোঁজ চালাতে হবে। কতদিন এখানে পচে মরব? ফ্রান্সিস বলল।
আমিও থাকব। শাঙ্কো বলল।
না। আমি একাই দেখব। তোমরা কয়েকজন নীচে হাঁটু মুড়ে বসে তৈরি থাকবে। যদি হাত ফসকে পড়ে যাই তোমরা আমাকে ধরবে। খুব সাবধানে আগে পাঁচজন আছড়ে পড়ে মারা গেছে ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে ফ্রান্সিস দরকার নেই এই ঝুঁকি নেওয়ার। শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল।
না শাঙ্কো। একটা চেষ্টা করতেই হবে তোমরা আমাকে ধরে ফেলতে পারবে না? ফ্রান্সিস বলল।
এটা কী বলছ? তোমাকে বাঁচাতে আমরা মরতে রাজি। এটা কি নতুন করে বলতে হবে! শাঙ্কো অভিমানের সুরে বলল।
ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে শাঙ্কোর হাত ধরল। চাপ দিয়ে হেসে বলল–তাই তো আমি এত দুঃসাহসী হতে পেরেছি।
সন্ধে থেকে রাত। কিছুক্ষণ পরে প্রহরী আর রাঁধুনি রাতের খাবার নিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা নিঃশব্দে খেয়ে নিল। প্রহরীরা চলে গেল। শাঙ্কো অন্ধকারে বিনোলাদের কাছে এল। ফ্রান্সিসের রাতের অভিযানের কথা বলল। ওদের কী করতে হবে সেসবও বলল। তারপর ফ্রান্সিসের পাশে এসে শুয়ে পড়ল।
রাত গভীর হল। ভাইকিংরা কেউ ঘুমোল না। একসময় ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে চাপাস্বরে ডাকল, শাঙ্কো। শাঙ্কোও আস্তে আস্তে উঠে পড়ল। চাপাস্বরে ডাক হলেও তা শুনে বন্ধুরাও আস্তে আস্তে উঠে বসল। ফ্রান্সিস মশালের আলোয় গরাদ দিয়ে দেখল দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। অন্য দুজন একটা ছোট পাথরের চাঁইয়ের ওপর বসে আছে। বোধহয় তন্দ্রাচ্ছন্ন। প্রহরীদের সংখ্যা বেড়েছে। তবু এই সুযোগ ছাড়া হবে না। শাঙ্কোকে মৃদুস্বরে বলল-যাও, আস্তাসোকে নিঃশব্দে নিয়ে এসো। মাথা নিচু করে যাবে আসবে।
