সারাদিন রোদে পুরে বিকেলে একটু স্বস্তি পেল ফ্রান্সিসরা। খুব হাওয়া ছুটেছে। সন্ধে হল। ফ্রান্সিস পাথরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসেছিল। পিঠের এখানে-ওখানে ছুঁচোলো পাথর যেন হাড়ে বিধে যাচ্ছিল। ও ডাকল, শাঙ্কো, শোনো। শাঙ্কো শুয়েছিল। উঠে এগিয়ে এল। বন্দীদের দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল, ওদের সঙ্গে কিছু কথা বলো তো। জেনে নাও ওরা কী অপরাধে বন্দী হয়েছে। এখানে থাকতে থাকতে কী অভিজ্ঞতা হয়েছে। ওদের সব কথা জানতে হবে। শাঙ্কো বন্দীদের কাছে গিয়ে গল্প জমাল। নিজের কথা বলল। তারপর খবরাখবর নিতে লাগল। কিছুক্ষণ শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে ফিরে যাবে বলল, ঐ মুর যুবক দু’জন ভাই। গুপ্তচর এই অভিযোগে উজির বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সবাই মরেছে। ওরা গ্রামের দিকে গিয়েছিল বলে বেঁচে গেছে। কিন্তু পরে ধরা পড়েছে।
হ্যাঁ, গুপ্তচর এই বদনাম সবরকম অত্যাচার চালানো যায় হত্যাকেও অপরাধ বলে গণ্য করবে না। অন্যদের কথা বলো। ফ্রান্সিস বলল।
ওরা কেউ স্পেন, কেউ পোর্তুগালের মানুষ। একজন ফরাসি, নাম আস্তাসো। ঐ আস্তাসোই এখানে সব থেকে বেশিদিন বন্দী হয়ে আছে। শাঙ্কো বলল।
— হুঁ, ওর সঙ্গে কথা বল অনেক কিছু জানা যাবে। প্রহরীদের সামনে নয়। বলে এসো রাতে খাওয়া সেরে ও যেন আমাদের কাছে আসে। তখন কথা হবে।
শাঙ্কো চলে গেল। আস্তাসোকে ফ্রান্সিসের কথা বলল। আস্তাসো বলল বেশ। — তোমার বন্ধু বুদ্ধিমান। প্রহরীদের নজর আমি এড়িয়ে যাব।
ওদিকে বিকেলে হ্যারি ও মারিয়া চুপ করে ছোট বিছানাটায় বসেছিল দু’জনেই বেশ চিন্তান্বিত। শাঙ্কো এল না। ফ্রান্সিসদের কোনো খবরই পাওয়া গেল না। একসময় হ্যারি বলল, সন্দেহ নেই। ঐ উজির ইয়েপুদা ফ্রান্সিসদের জাহাজ তল্লাশি করিয়েছে। হ্যারল্ডের সেই ধনসম্পদ ওরা পেয়েছে। কাজেই ফ্রান্সিসদের রেহাই দেয়নি। নিশ্চয়ই বন্দী করেছে।
চিন্তা হচ্ছে ফ্রান্সিসরা বন্দীদশা থেকে পালাতে পারবে কিনা। মারিয়া বলল।
সব নির্ভর করছে ঐ খলিফা হাকিমের ওপর। তিনি কেমন মানুষ তা তো জানি না যদি উজিরের মতো ক্রূর প্রকৃতির হন তাহলে ফ্রান্সিসদের ভীষণ বিপদে পড়তে হবে। হারি বলল। যাকগে। আপনি এসব নিয়ে ভাববেন না ফ্রান্সিস, শাঙ্কো নিশ্চয়ই বিপদ-আপদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। মুসকিল হয়েছে। আপনি সমুদ্রতীরে গিয়ে সমস্ত দেখে আসুন।
না। ভালো লাগছে না। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল।
না-না। মন খরাপ করবেন না। বীরের পক্ষে সেটা ভালো না। আপনি নিশ্চিন্ত মনে যান। বেশি দূরে তো নয়। জানেনও। তবে সাবধান। মুর যোদ্ধারা নাকি এদিকে টহল দিতে আসে। কেউ যেন আপনাকে দেখতে না পায়। আর অন্ধকার হবার আগেই চলে আসবেন। দুশ্চিন্তা করবেন না। রাত জাগবেন না। নিশ্চিন্তে ঘুমোবেন। শরীরটা সুস্থ রাখতেই হবে। যান। হ্যারি বলল।
মারিয়া আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলে বাইরের বাগানটা ছাড়িয়ে পায়ে চলা রাস্তায় এল। চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। একজন লোক দূরে পায়ে চলা পথটা দিয়ে চলেছে। আর কোনো মানুষ দেখল না। মারিয়া একটু পা চালিয়ে সমুদ্রতীরের দিকে চলল। সেই দুটো পাথরখণ্ডের একটাতে বসে পশ্চিমের দিগন্তের দিকে তাকাল। সূর্য তখনও অস্ত যায়নি। দু’পাশে গাছ-গাছালিতে ঘরে ফেরা পাখিরা ডাকছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর কমলারঙের আলোয় দিগন্ত মায়াময় হয়ে উঠেছে। দুশ্চিন্তার মধ্যেও মারিয়ার মন আনন্দে ভরে উঠল। কত পরিচিত দৃশ্য। যতবার দেখে আনন্দ যেন বাঁধ মানে না।
.
রাত হল। প্রহরী আর রাঁধুনি এসে ফ্রান্সিসদের খাবার দিল। সেই আনাজ মাছের ঝোলমতো, মোটা সুস্বাদু রুটি। এঁটো প্লেট নিয়ে ওরা চলে গেল। গরাদের দরজা বন্ধ হল।
শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে রইল। আস্তাসোর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। চারদিক নিস্তব্ধ। মাথার ওপর কালো আকাশে তারাগুলি জ্বলজ্বল করছে।
কিছু পরে আস্তাসো নিঃশব্দে ফ্রান্সিসের কাছে এল। গলা নামিয়ে বলল–আপনিই ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস চোখ বুজে ছিল। চোখ খুলে তাকিয়ে বলল–হ্যাঁ। আস্তাসোর গায়ে এখানে-ওখানে ছেঁড়া পোশাক। মুখে অল্প লালচে দাড়ি-গোঁফ। মাথার চুলও লালচে। ফ্রান্সিস দেখেই বুঝল–একসময় বলিষ্ঠ শরীর ছিল। কিন্তু এখানে রোগা হয়ে গেছে। বেশ শুকনো চোখ মুখ। তবে চোখ দুটো বেশ উজ্জ্বল। বুদ্ধিদীপ্ত।
সংক্ষেপে বলুন তো আপনার সব অভিজ্ঞতার কথা। আপনি তো ফ্রান্সের মানুষ। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। ক্রুসেডের লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু ধর্মের নামে অযথা খুনোখুনি রক্তপাত মৃত্যু দেখে অল্পদিনের মধ্যেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লাম। জানেন তো সৈন্যবাহিনী থেকে পালানো কত কঠিন। ধরা পড়ে গেলে সহযোদ্ধাদের হাতেই অবধারিত মৃত্যু। তবু জীবন বিপন্ন করেই পালালাম। এদেশ-ওদেশ উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এই পৌরোয় এসে পড়লাম। নানা বিপদ-আপদের কথা থাক। মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোয় ছেদ পড়ল। উজির ইয়েপুদার যোদ্ধাদের কুনজরে পড়লাম। আমাকে এখানে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দী করা হল।
পালাবার চেষ্টা করেননি? ফ্রান্সিস বলল।
সেটাই সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। এখানে ধারেকাছের দেশের বন্দীদের পেয়েছিলাম। একজন স্পেনীয় যুবকেরসঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হল। খাবার ভাগ করে খেতাম। পাশাপাশি শুতাম। সুখ-দুঃখের কথা হত। খুব দুঃসাহসী ছিল যুবকটি। কী ভাবে জানি না যুবকটি এই পাহাড়ের প্রায় খাড়া গায়ে ওঁচানো পাথরের খোদল ধরে ধরে ওপরে প্রায় পাহাড়ের মাথার কাছে একষ্টা ঝুঁকে পড়া গাছের কাছাকাছি পৌঁছোবার উপায় বের করেছিল। ও বলেছিল প্রায় কুড়ি-পঁচিশ দিন অন্ধকারে রাত জেগে ঐ পথটা ও খুঁজে খুঁজে বের করেছিল। আস্তাসে থামল।
