সিনাত্রা আস্তে আস্তে অর্থটা বলল–
সূর্য আছে চন্দ্র আছে।
অস্তে গেলে অন্ধকারও আছে,
সুখও আছে দুঃখও আছে।
বন্ধু হে, কোনটা নেবে?
আমি বলি–দুটোই নাও।
সবই তো ঈশ্বরের দান।
খলিফা হাকিম আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, বাঃ বাঃ! সুন্দর কবিতা তো!
এবার ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। একটু মাথা নুইয়ে বলল, মান্যবর, একটা আর্জি।
বলো। খলিফা বললেন।
আমাদের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ আছেন তিনি এখানে এই দেশেই থাকবেন। অন্যজন আমাদের চিকিৎসক। বয়স্ক মানুষ। আমাদের বিচারের জন্যে বন্দী করা হোক, কিন্তু তাকে জাহাজে থাকতে দেওয়া হোক।
খলিফা ইয়েপুদার দিকে তাকালেন। ঠিক আছে। তাই হবে।
ইয়েপুদা কেন জানি আপত্তি করল না। ফ্রান্সিস এত সহজে মিটবে ব্যাপারটা কল্পনাও করেনি। খলিফা হাকিম বলে গেলেন। সেনাপতিকে ডেকে ইয়েপুদা কী সব নির্দেশ দিল। সেনাপতি ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল, চলো।
কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
গেলেই দেখতে পাবে। সেনাপতির গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
বেশ। ফ্রান্সিসরা প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে এল। আগে-পিছে যোদ্ধার দল।
ক্রেভানকে ডেকে সেনাপতি বলল, এই বুড়ো, তুই যেখানে খুশি চলে যা। ভেনকে ডেকে বলল, তুই জাহাজে গিয়ে থাকবি। পালাবার চেষ্টা করবি না। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল, চলো সব।
প্রাসাদের বাইরে এসে দাঁড়াল সবাই। ক্রেভান হাতে একটা কাপড়-চোপড়ের ঝোলা এনেছিল। সেটা শাঙ্কোর হাতে দিয়ে প্রায় ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ক্রেভানের দু’চোখ জলে ভরে উঠল। অরুদ্ধ স্বরে বলল, ফ্রান্সিস, তোমার মতো মানুষ এই বৃদ্ধ বয়েস পর্যন্ত দেখিনি। ঈশ্বরের কাছে তোমার দীর্ঘজীবন প্রার্থনা করি। ফ্রান্সিস আস্তে ক্রেভানের পিঠে চাপড় দিল। বলল, আমরা তো এখন জাহাজ থেকে নির্বাসিত। কী অবস্থায় পড়ব জানি না তবু এখানে থাকতে অসুবিধে হলে নিশ্চয়ই আমার কাছে আসবেন। চোখ মুছে ক্রেভান ঝোলা হাতে আস্তে আস্তে চলে গেল। ভেনও এগিয়ে এসে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। চড়া রোদের মধ্যে যোদ্ধাদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল।
রাস্তায় লোকজনের ভিড়। দোকানপাটে কেনাবেচা চলছে। ভাইকিংরা এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে চলল। কিছুদূর যেতেই আগে-দেখা সেই পাথর গাঁথা আধভাঙা দুর্গা দেখল। তার পাশেই পারপর দুটো পাহাড়। খুব উঁচু নয়। গাছ-গাছালি আছে। সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়। চুড়োয় অবশ্য বেশি গাছ-গাছালি নেই। কাছাকাছি আসতে দেখা গেল পাহাড় দুটোর মাঝখানে একটা সরু গিরিসংকট। উপত্যকার মতো। বিস্তৃত নয়। সেই গিরিসংকটের কাছে এসে সেনাপতি বলে উঠল, দাঁড়াও সব। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। এখানে কিন্তু দু’জন সশস্ত্র প্রহরীকে দেখা গেল। দুজনের পেছনে লোহার বেশ কয়েকটিা গরাদ পোঁতা। মাঝখানে লোহার দরজা মতো। তাতে একটা বড় তালা ঝুলছে।
ফ্রান্সিস, মনে হচ্ছে কয়েদ ঘর। শাঙ্কো বলল।
ঘর নয়। অদ্ভুত ব্যবস্থা কয়েদ রাখার। এর মধ্যেই বন্দীজীবন কাটাতে হবে। নীচের মেঝে পাথুরে, ঝড়বৃষ্টির সময় মাথার উপরে থাকবে শুধুদু’পাশের ঝুঁকে পড়া গাছের ডাল-পাতা। কী অদ্ভুত ব্যবস্থা! ফ্রান্সিস ঐ গিরিসংকটটা দেখতে দেখতে বলল।
এখান থেকে পালানো যাবে না ফ্রান্সিস। সিনাত্রা বেশ ভীত গলায় বলল।
আগেই হাল ছেড়ো না। দেখা যাক সব ব্যবস্থা। ফ্রান্সিস বলল।
একজন প্রহরী এগিয়ে এসে কোমর থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে দিল। তারপর ফ্রান্সিসদের ঢুকতে ইঙ্গিত করল।
তাহলে বন্দীই হলাম। বিনোলা মৃদুস্বরে বলল। ফ্রান্সিস বলল, ইয়েপুদাই সর্বেসর্বা। খলিফার কোনো ক্ষমতাই নেই। কবি আর কবিতা নিয়ে মশগুল। তাই মানুষ হিসেবে ভালো। দেখা যাক কয়েকটা দিন। ফ্রান্সিস ঢুকতে ঢুকতে মৃদুস্বরে বলল।
ভেতরে সরাসরি সূর্যালোক পড়েছে। এখানে-ওখানে ঝুঁকে-পড়া গাছের ছায়া। দেখা। গেল আগে থেকে বন্দী আট-দশজন তোক শুয়ে-বসে আছে। দু’জন মুর, বাকিরা শ্বেতকায়। এবড়ো-খেবড়ো পাথরের মেঝে। ফ্রান্সিস সেখানেই বসে পড়ল। ভাইকিং বন্ধুরাও বসে পড়ল। বন্দী রাখার এই ব্যবস্থায় সবাই অবাক। এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। কিছুটা দূরে গরাদ পোঁতা। পালাবার সব রাস্তাই বন্ধ। দু’পাশে প্রায় খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। একটুকরো ঘাসও নেই। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। ওপরে দুপুরের আলোকোজ্জ্বল নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক চিন্তা মাথায়। হ্যারি, মারিয়া নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে সত্যি কিন্তু বেশি দিন তো থাকতে পারবে না। শাঙ্কোও যেতে পারবে না। ব্যবসার কাজ ফেলে হ্যারি, মারিয়া ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছে, কর্মচারীও মালপত্র নিয়ে আসছে না। স্বাভাবিকভাবেই সেই সার্মেন্তো নামের ভদ্রলোকের মনে সন্দেহ হতে পারে। হ্যারিরা বিপদে পড়তে পারে। হাতে সময় খুব কম।
গরাদ বসানো দরজায় শব্দ হল। দু’জন প্রহরী আর একজন রাঁধুনি খাবার নিয়ে ঢুকল। চিনেমাটির বড় প্লেটে হাতে হাতে খাবার দেওয়া হল। বুনো আনাজ-টানাজ নয়। চাষ করা জমির আনাজপাতি। রান্নাও সুস্বাদু। সঙ্গে সামুদ্রিক মাছ। ফ্রান্সিসরা মোটামুটি পেট পুরে খেল। একটা বেশ বড় মাটির জালা থেকে জল খেল। প্রহরীরা এঁটো প্লেট নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস এবার ভালো করে সব বন্দীদের দেখল। সবার শরীরই বেশ রোগাটে। এমনকি মুর দু’জনেই কেমন রক্তশূন্য চোখমুখ। বুঝল এই পরিবেশে কেউ সুস্থ থাকতে পারে না। ইয়েপুদা অত্যন্ত ধুরন্ধর। ও বন্দীদের হত্যা করে না। কিন্তু এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যে, রোদে-জলে, প্রচণ্ড গরমে, শীতে এমনিতেই বন্দীরা অসুস্থ হয়ে মারা যাবে। অসুখে মারা গেলে ওর ঘাড়ে কোনো দোষই পড়বে না।
