একটু ভেবে নিয়ে সেনাপতি বলল, তোমাদের অনুরোধ মাননীয় উজিরকে জানাব। তিনি যা বলবেন তাই হবে।
বেশ। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
সবাই ডেক-এ উঠে এসো। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলে উঠল। ফ্রান্সিসরা ওপরে ডেক-এ উঠে আসতে লাগল। দু’একজন ফ্রান্সিসকে মৃদুস্বরে বলল, এভাবে হার মানবে?
অস্ত্রঘরে একটা ছোরাও পড়ে নেই। আমার একটা মাত্র তরোয়াল বিছানার নীচে লুকোনো আছে। খালি হাতে লড়াই হয়? চলো, দেখা যাক সব।
আগে-পিছে যোদ্ধাদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নেমে এল। সদর রাস্তা দিয়ে পুবমুখো চলল। পোতো বন্দর শহর ছাড়িয়ে হেঁটে চলল সবাই। রোদের তেজ বাড়ছে। দু’পাশে গম জলপাইয়ের ক্ষেত-খামার। রাস্তার লোকজন কেউ কেউ ওদের দিকে তাকিয়ে দেখল। ভাইকিংরা কোনো কথা বলছিল না। হেঁটে চলল।
বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর কাঠ আর পাথরের ঘর-বাড়ি দেখা গেল। রাজধানী পৌরো শহরে এসে পৌঁছল সবাই। বাঁ দিকে কিছুদূরে দেখা গেল একটা মাথাভাঙা পাথরের দুর্গ। আগে অটুট ছিল উঁচু দুর্গা। রাস্তায় ঘোড়ায় টানা গাড়ি, বাজার এলাকায় দোকানপাট, লোকজনের ভিড়। কেনাকাটা চলছে। বেশ গুঞ্জনধ্বনি। ডান দিকে একটা লম্বাটে পাথর ও কাঠের বড় বাড়ি। তার সামনে এসে সেনাপতি সবাইকে থামবার ইঙ্গিত করল। বিরাট কাঠের দরজা। তার কোথাও কোথাও কুঁদে কুঁদে নানা নকশা তোলা। বোঝা গেল খলিফা হাকিমের প্রাসাদ। প্রবেশপথের ধারেকাছে কোনো প্রহরী নেই। লোজন ঢুকছে বেরোচ্ছে নির্বিবাদে। ফ্রান্সিস একটু অবাকই হল। সেনাপতি আছে। যোদ্ধারা আছে। অথচ প্রাসাদে কোনো দ্বাররক্ষী নেই। এবার ফ্রান্সিসরা সবাই অবাক হল যখন দেখল মূল দরবারের প্রবেশদ্বারেও কোনো দ্বাররক্ষী নেই। অদ্ভুত ব্যাপার। শাসক খলিফা হাকিম আত্মরক্ষার ব্যবস্থা রাখেননি? ফ্রান্সিস চারদিকেতাকাল। পাথরের গাঁথনিতে তৈরি লম্বাটে বড় ঘর। দু’পাশে বড় বড় জানালা। জানালার চারপাশে দেয়ালে সুন্দর কারুকাজ। নানা রঙের। কালো কাঠের গদিপাতা আর তাতে সোনা রুপোর গিলটি করা। একটি আসনে খলিফা হাকিম বসে আছেন। একটু মোটা। মুখে অল্প দাড়ি গোঁফ। পরনে ঢোলা হাতা ঘন হালকা সাটিন কাপড়ের পোশাক। মাথায় নীল কাপড়ের পাগড়ির মতো। কপালের ওপরেই পাগড়িতে বসানের একটা বড় গোল হীরে। আসনের নীচে একপারে সুন্দর কাজ করা আলবোলা রাখা লম্বা নলটায় সোনা রুপোর কাজ করা। খলিফা আলবোলার নল মুখে নিমীলিত চোখে বসে আছেন। পাশের আসনে ইয়েপুদা, অন্য আসনে সেনাপতি বসে আছে। বেশ ভিড় দরবারে। একজন মোটা মতো লোক ঢোলা কালো পোশাক, মুখে অল্প দাড়ি-গোঁফ। গানের সুরেলা সুর টেনে থেমে থেমে বলে থামতেইদরবারে প্রশংসার ঢেউ উঠল। কিহচ্ছে ফ্রান্সিস বুঝল না। সিনাত্রা থাকলে হয়তো বলতে পারত। ক্রেভান আর ভেনকেও ফ্রান্সিসদের সঙ্গে আসতে হয়েছিল। ফ্রান্সিস ক্রেভানের কাছে সরে এল। বলল, ক্রেন, কী ব্যাপার বলুন তো?
আরবী ভাষায় মুখে মুখে কবিতা বলার আসর চলছে। ঐ দেখো আর একজন কবিতা বলা শুরু করল। এইসব কবি তাকে বলে গিজেল। খলিফা হাকিমদের সম্মান করেন। বলেছিলাম না কোনো কোনো মুর শাসক গান, কবিতা ভালোবাসেন। অর্থাৎ যাকে বলে কাব্য-প্রেমিক। ক্রেভান মৃদুস্বরে বলল। পর পর কয়েকজন এইভাবে মুখে মুখে গিজেল বলে গেল। প্রশংসার উঠল শ্রোতাদের মধ্যে।
ফ্রান্সিস ভাবল হ্যারি, মারিয়া থাকলে খুশি হত। কবিতার অর্থ হ্যারি কিছু কিছু বুঝত। এই সুন্দর পরিবেশটা ভালো লাগত ওদের। শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, এ কেমন রাজদরবার? অভিযোগ নেই, বিচার নেই, শাস্তি নেই। একজনের বলা শেষ হলে ইয়েপুদা আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। চোখেমুখে প্রচণ্ড বিরক্তি। খলিফা হাকিমের কাছে এসে মাথা নিচু করে একনাগাড়ে কিছু বলে গেল।
খলিফা হাত তুললেন। আস্তে আস্তে শ্রোতারা বেরিয়ে গেল। দরবারে ভিড় কমে গেল। খলিফা ফ্রান্সিসদের এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলেন। তারপর পোর্তুগিজ ভাষায় বললেন, তোমরা ভাইকিং দেশ থেকে এসেছ। তোমাদের জাহাজে মূল্যবান ধনসম্পত্তি পাওয়া গেছে। তোমরা লুঠ কর, ডাকাতি কর। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল, মাননীয় খলিফা, এই অভিযোগ সত্য নয়। তারপর ফ্রান্সিস অল্প কথায় হ্যারল্ডের ঘটনাটা বলল।
বিশ্বাস করলাম। আমি কাউকে অবিশ্বাস করি না। আচ্ছা, একটা কথা, তোমাদের দেশে কবিতা, গানের প্রচলন আছে? খলিফা জানতে চাইলেন।
দেখুন মান্যবর খলিফা–আমি কাঠখোট্টা মানুষ। সিনাত্রাকে দেখিয়ে বলল, ও আমার বন্ধু সিনাত্রা। আমাদের দেশের গান গায়। নিজে গানও বাঁধে।
খলিফা হাকিম খুব খুশি হয়ে বলে উঠলেন, তাহলে তো শুনতে হয়। সিনাত্রার দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনাও তো সিনাত্রা। অসহায় ভাবে ফ্রান্সিসের দিকে একবার তাকিয়ে সিনাত্রা বলল, মহামান্য খলিফা, আমাদের ভাষা তো আপনি বুঝবেন না।
সুরটা তো বুঝব। আর অর্থটা পোর্তুগিজ ভাষায় বলবে। খলিফা বললেন।
সিনাত্রা বলল, আমার অল্প বয়সে আমাদের বাড়ির কাছে একজন কবি ছিল। সকলে তাকে পাগল বলত। তার একটা কবিতা বলছি। সিনাত্রা মনে করে নিয়ে আস্তে আস্তে কবিতাটা সুর করে বলে গেল। খুশি হয়ে খলিফা বলে উঠলেন, বাঃ। সুন্দর তো! বড় সুরেলা তোমার কণ্ঠ। এবার অর্থটা বলো।
