রাজকুমারী ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিলো। ও কাছে আসতে রাজকুমারী ডান হাতটা বাড়িয়ে ধরলো। ও সেইহাতচুম্বন করল। গদিমাড়া একটা সবুজ রঙের চেয়ারপরিচারিকাটি এগিয়ে দিল। ও তাতে বসল। রাজকুমারী মারিয়া হেসে বলল–কি খাবেন বলুন?
–আমি এইমাত্র খেয়ে এসেছি। ফ্রান্সিস দ্রুত ব’লে উঠল।
–তবু একটু ফলের রস খান। রাজকুমারী পরিচারিকাটিকে ইঙ্গিত করলো। পরিচারিকাটি চলে গেল। একটু পরে শ্বেতপাথরের গ্লাসে ফলের রস নিয়ে এল। ওটা খাচ্ছে ও। তখনই রাজকুমারী বললো–হীরে দু’টো আনার গল্পটা বলুন।
ফ্রান্সিস ফলের রস খেতে-খেতে গল্পটা শুরু করল–গল্পটা প্রথম শুনেছিল। মকবুলের মুখে, আমদাদের এক সরাইখানায়।
ও গল্পটা বলে চললো। রাজকুমারী থুতনিতে আঙ্গুল ঠেকিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল গল্পটা। গল্প শেষ হতে রাজকুমারী অবাক হয়ে বললো এত সব কান্ড করেছেন আপনি?
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। শুধু সলজ্জ মৃদু হাসলো। ফ্রান্সিস উঠে দাম রাজকুমারীর হস্ত চুম্বন করে বলল–আজকে এই থাক্। আর একদিন আপনাকে মুক্তোর সমুদ্রের গল্প বলবো।
–আমিও আপনাকে আনাতে গাড়ি পাঠাবো। রাজকুমারী বললো।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–বেশ।
সেই গাড়ি চড়েই ও বাড়ি ফিরে এল। গাড়ি চড়ে ফিরে আসতে-আসতেই একটা চিন্তা ওর মাথায় খেলে গেলো। রাজকুমারী তো আবার গাড়ি পাঠাবে। সেদিন এই চলন্ত গাড়ি থেকেই পালাতে হবে। এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। বাড়ির ঐ কড়া পাহারা থেকে পালাবার কোন উপায় নেই। আবার রাজকুমারী কবে গাড়ি পাঠায় ও সেই আশায় রইল। এর মধ্যে ফ্রান্সিস বাবাকে বলল–আমি রোজ কয়েক ঘন্টার জন্যে সমুদ্রের ধারে যাবো।
–কেন? বাবা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
–মুক্তোর শিকারীরা কিভাবে মুক্তো তোলে, তাই দেখবো।
–বেশ যেতে পারো–কিন্তু তিনজন সৈন্য পাহারা যাবে।
ফ্রান্সিস সম্মত হলো।
ফ্রান্সিস তিনজন সৈন্যের পাহারায় সমুদ্রের ধারে যেতে লাগলো। যে সব মুক্তো। শিকারীরা শুধু কোমরে গোঁজা একটা মাত্র ছোরা নিয়ে জলে ডুব দিয়ে ঝিনুক তুলে আনে, তারপর ঝিনুক ভেঙে বা মুখ খুলে মুক্তো বের করে, ও তাদের সঙ্গে ক’দিনের মধ্যেই ভাব জমিয়ে ফেললো। ওরা কিভাবে ডুব দিয়ে, কিভাবে দ্রুত জল ঠেলে নামে, কিভাবে হাঙরের হাত থেকে আত্মরক্ষা করে, কিভাবে দম বেশিক্ষণ রাখে, ঐ সবকিছুই শিখে নিল। তারপর ওদের সঙ্গে জলে ডুব দিয়ে ঝিনুক আনতে লাগলো। দিন সাত আটের মধ্যেই ও প্রায় পাকা মুক্তো শিকারী হয়ে গেল। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় জলের নীচে থাকতে শিখলো, দ্রুত কেটে নেমে যেতে, উঠে আসতে শিখলো। শিখলো কি করে হাঙরের আক্রমণ ঠেকাতে হয়। ওরা শেখালো যে জলের নিচে কখনো হাঙরকে নীচে থাকতে দেবে না। তাহলেই হাঙরের হৃৎপিন্ড লক্ষ্য করে ছোরা চালানো সহজ। ফ্রান্সিস এভাবে দুটো আক্রমণকারী হাঙরও মারলো। মুক্তো শিকারীরা খুব খুশী হ’ল। ও যে অল্পদিনেই প্রায় একজন পাকা মুক্তো শিকারী হয়ে গেছে, এ বিষয়ে ওদের কোনো সন্দেহ রইলো না। ফ্রান্সিস চলে আসার দিন অনেক রাত পর্যন্ত মুক্তো শিকারীদের সঙ্গে রইলো। ওদের সঙ্গে সমুদ্রের ধারে রান্না-বান্না করলো, খাওয়া-দাওয়া করলো। তারপর ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো।
পরের দিন সকালে হ্যারি ওর কাছে এলো। ও হ্যারিকে সমস্ত পরিকল্পনার কথা। বলল। হ্যারি বলল–তার চাইতে তুমি রাজকুমারীকেই বলো না–ও যেন রাজাকে বলে, তোমাকে একটা জাহাজ দেবার জন্যে।
–তা আমি বলতে পারি। রাজাও আপত্তি করবেন না, জানি। কিন্তু মুস্কিল হয়েছে। বাবা-মাকে নিয়ে। বাবা কিছুতেই রাজি হবেন না। কাজেই আমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে, সুযোগ বুঝে আবার জাহাজ চুরি করে পালাতে হবে।
হ্যারি আর কিছু বললো না, বুঝল ফ্রান্সিস ওর পরিকল্পনা পাল্টাবে না। যা ভেবেছে তা করবেই।
দু’দিন পরে আবার সন্ধ্যের সময় রাজকুমারীর পাঠানো গাড়ী এল। ফ্রান্সিস যথারীতি সাজগোজ করল। বাড়ির বাইরে যাবার আগে মা’কে একবার জড়িয়ে ধরল। মা তো অবাক। জিজ্ঞেস করল–কি হ’ল তোর? হঠাৎ এভাবে জড়িয়ে ধরলি।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। ওর চোখে জল এসে গেছে। জানে কথা বললেই ওর অরুদ্ধ কণ্ঠস্বর মা ধরে ফেলবে। মা’র মনে সন্দেহ হবে। কাজেই ও তাড়াতাড়ি মা’কে এড়িয়ে দিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল।
মেঝেয় দামী-দামী কার্পেট পাতা, দরজা-জানালায় নানা কারুকাজ করা ঘরগুলো পেরিয়ে ও অন্দরমহলে রাজকুমারীর বসার ঘরে এলো। রাজকুমারী মারিয়া ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিলো। ও মুক্তোর সমুদ্র’র গল্প বলতে লাগলো, জলের নীচে মেঝের মত একটু এবড়ো-খেবড়ো জায়গায় কত মুক্তো ছড়িয়ে আছে। একটা নীচে বেগুনী রঙের আলোয় জায়গাটা ভরে আছে। বীভৎস চেহারার লা মাছ পিঠের কাটাগুলো উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরাই হচ্ছে মুক্তোর সমুদ্রের প্রহরী….।
গল্প শেষ হ’তে রাজকুমারী বললো–আপনি কি আবার মুক্তো আনতে যাবেন?
–কেন? ফ্রান্সিস ভেঙে কিছু বললো না।
–আমার লকেটের জন্যে একটা বড়ো মুক্তো আনবেন কিন্তু।
ফ্রান্সিস হেসে মাথা ঝাঁকালো।
রাজবাড়ির গাড়ি চলে ও ফিরে আসছে। তখন রাত হয়েছে। রাস্তাঘাটে আঁধারি বাজারের কাছে গাড়ি, ঘোড়া, লোকজনের ভিড়। কোম্যান গাড়ির গতি কমালো। ফ্রান্সিস এই সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল। কোচম্যানের অজ্ঞাতে চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে আস্তে-আস্তে রাস্তায় নেমে পড়ল। কোম্যান কিছু বুঝতেই পারল না। গাড়ি চালিয়ে সে আপনমনেই চলে গেল।
