ঠিক আছে। এত করে বলছেন। সার্মেন্তো তারপর মুদ্রা দুটো নিয়ে বললেন, আপনারা বিশ্রাম করুন। ভোর হতে খুব দেরি নেই। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি ভিতরে এসে শুতে পার।
একটু পরে যাচ্ছি। বিছানাটা একটু গুছিয়ে দিয়ে যাই। মারিয়া বলল।
বেশ। সার্মেন্তো বেশ খুশি হলেন। উনি চলে গেলে মারিয়া বলল, বিছানা ঢাকা, চাদরটাদর তো কিছু আনতে পারিনি।
দরকার নেই। যে কাপড়টা আছে ওটাই একটু গুছিয়ে দিন। হ্যারি বলল।
তাহলে আমি যাচ্ছি। ভোর হবার আগেই জাহাজে পৌঁছতে হবে। শাঙ্কো বলল।
হ্যাঁ হ্যাঁ। চলে যাও। ফ্রান্সিসকে বলো ভালো আশ্রয় পেয়েছি। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো বাইরের আবছা অন্ধকারে বেরিয়ে এল। দ্রুত পায়ে সমুদ্রতীরের দিকে চলল।
নৌকো চালাতে চালাতে শাঙ্কো দেখল আকাশের তারাগুলি উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই পুব আকাশ ফর্সা হয়ে গেল। যখন নৌকো জাহাজে বেঁধে দড়িদড়া বেয়ে জাহাজে উঠছে তখন পুব দিগন্তে কমলা রঙ ছড়িয়ে সূর্য উঠল। শাঙ্কো এসে ফ্রান্সিসকে সব বলল। ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিন্ত হল।
ভাইকিংদের সকালের খাবার খাওয়া সবে শেষ হয়েছে। সেই সেনাপতির সঙ্গে সাত আটজন যোদ্ধা জাহাজঘাটে এসে সার বেঁধে দাঁড়াল। সেনাপতি ফ্রান্সিসদের জাহাজের, কাছে এসে দাঁড়াল। সিনাত্রা রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল, পাটাতন ফেল। তল্লাশি হবে। ততক্ষণে আরও দু’জন বন্ধু এসে দাঁড়িয়েছে। ওরা তাড়াতাড়ি পাটাতন তীরে পেতে দিল। যোদ্ধাদের নিয়ে সেনাপতি জাহাজের ডেক এ উঠে এল। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বলল, তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালাও। মূল্যবান কিছু পেলেই এসে আমাকে বলবে। যোদ্ধারা তল্লাশির কাজে নেমে পড়ল। জোর তল্লাশি শুরু হল। ছোট্ট কেবিন ঘরগুলি, রান্না ও খাবার ঘর, বাতিল পাল-দাঁড় রাখার ঘর, ফাঁকা অস্ত্রঘর, কাঠের তক্তা-পেরেক রাখার স্থান, মেরামতির কাজের জন্যে ব্যবহৃত ঘর। দু’জন যোদ্ধা এল ফ্রান্সিসের ছোট্ট কেবিন ঘরে। ফ্রান্সিস আর ক্রেভান বিছানায় চুপ করে বসেছিল। মারিয়ার ব্যাগ, ঝোলা-টোলা খুলে মেয়েদের পোশাক পেল। একটু অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাতেই ফ্রান্সিস বলল, ওসব আমার স্ত্রীর পোশাক। গত মাসে মারা গেছেন। এবার সেই ময়লা ছেঁড়া পালের গাঁঠরি দেখল। কাছে গিয়ে একজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসকে জিগ্যেস করল, এটা কী?
অভিশপ্ত ধনসম্পদ। ফ্রান্সিস নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল। যোদ্ধাটি অবাক। কথাটার অর্থ ঠিক বুঝল না। কোমরে ঝোলানো তরোয়াল বার করল। গাঁঠরিতে কয়েকটা খোঁচা দিল। ছোট্ট ছেঁড়া দিয়ে কিছু বেরিয়ে এল না।
ঠাট্টা করছ, আঁ? যোদ্ধাটি বলল।
যদি ঠাট্টা মনে কর তবে তাই। ফ্রান্সিস একইরকম উদাস ভঙ্গিতে বলল।
যত্ত সব। নাক কুঁচকে বলে উঠল। তারপর চলে গেল। সব যোদ্ধা তল্লাশির শেষে ডেক-এ বসে জড়ো হল।
দামি কিছু পেলে? সেনাপতি বলল।
কিছুই না। একজন বলল।
ভিখিরির দল। আর একজন বলল।
কোমরবন্ধনীগুলো খুলিয়ে হয়তো কিছু মুদ্ৰাটুদ্রা পাওয়া যেত। তবে সোনার নয়। আর একজন বলল।
যে দু’জন ফ্রান্সিসের কেবিন ঘর তল্লাশি করেছিল তাদের একজন বলল, একটা ময়লা ছেঁড়া পালের গাঁঠরি দেখলাম।
তাতে কী আছে? সেনাপতি জানতে চাইল।
ছেঁড়া কাপড়জামা বোধহয়। যোদ্ধাটি বলল।
খুলে দেখেছ? সেনাপতি বলল।
ঐ নোংরা কাপড়ের বস্তা?
বস্তা নয়। কিছু বেঁধে রাখা হয়েছে। চলো তো। সেনাপতি সিঁড়ির দিকে চলল। পেছনে ঐ যোদ্ধা দু’জনও চলল। ফ্রান্সিস একই ভাবে বিছানায় বসেছিল। ক্রেভান মৃদুস্বরে ডাকল, ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। ঘরে ঢুকে সেনাপতি বলল, এই গাঁঠরি ঘরের মধ্যে রেখেছ কেন?
পছন্দ হলে আপনি নিয়ে যেতে পারেন। ফ্রান্সিস নির্বিকারভাবে বলল।
ঠাট্টা রাখো। কী আছে এতে যে বেঁধে রেখেছ?
বলেছি তো অভিশপ্ত ধনসম্পদ-রক্তে ভেজা। ফ্রান্সিস নির্বিকার।
সেনাপতি চড়া গলায় বলে উঠল, অ্যাই, খোল গাঁঠরিটা।
দু’জন যোদ্ধা লাফিয়ে এসে গাঁঠরির মুখ টেনে টেনে খুলে ফেলল। দু’চারটে অলঙ্কার গড়িয়ে পড়ল। অন্য যোদ্ধাটি টান মেরে মুখটাই খুলে ফেলল। কাঠের মেঝেয় ছড়িয়ে পড়ল সোনার চাকতি, মুদ্রা, অলঙ্কার, মণি-মুক্তো। ঝিকিয়ে উঠল হীরে বসানো গলার হার। সেনাপতি, যোদ্ধা দু’জন হাঁ করে তাকিয়ে রইল সেই দিকে। অল্পক্ষণ। তারপরই ফ্রান্সিসের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে সেনাপতি বলল, মিথ্যে বলে পার পাবে ভেবেছিলে?
আমি তো মিথ্যে বলিনি। যা সত্য তাই বলেছি। ফ্রান্সিস বলল।
এই সোনাটোনা, অলঙ্কার–তোমরা যে জলদস্যুতা কর এটাই তো বড় প্রমাণ। সেনাপতি বেশ গম্ভীর গলায় বলল।
লুঠ-ডাকাতি করলে এসবের ওপর মায়া থাকত নিশ্চয়ই, লুকোবার চেষ্টা করতাম। এভাবে সকলের চোখের সামনে ঘরে রেখে দিতাম না। ফ্রান্সিস বলল।
ওসব দরবারে গিয়ে শুনিও। তোমাদের সবাইকে বন্দী করা হল। দু’জন যোদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলল, গাঁঠরি বেঁধে নিয়ে চলো।
ফ্রান্সিস এবার উঠে দাঁড়াল। বলল, একটা অনুবোধ। সবাইকে বন্দী করে বেঁধে নিয়ে চলুন। কিন্তু এই বৃদ্ধ এখানেই নেমে যাবে। অন্য একজন আমাদের বৈদ্য-বয়স্ক। তাকে এই জাহাজেই থাকতে দিন। তাকে ফেলে তো আমরা পালাতে পারব না।
