সত্যি। মারিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শাঙ্কোরা এবার তীরভূমির একটু জংলা এলাকায় তীক্ষ্ণ নজর রেখে চলল। বেশ কিছুটা আসার পর আবছা দেখল উঁচু তীরভূমিতে পাশাপাশি দুটো বড় পাথর পড়ে আছে। তার মাঝখানে ঘাস নেই। শাঙ্কো নৌকো উল্টোদিকে বেয়ে প্রায় নিশ্চল করে ফেলল। ফিসফিস করে বলল, হ্যারি, দেখো তো এইটা কি একটা ঘাট? মনে হচ্ছে এখান দিয়ে তোক চলাচল করে।
হ্যারিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বলল, হ্যাঁ, একটা সাদাটে জায়গা দেখা যাচ্ছে। মনে হয় কাছেই মানুষের বসবাস আছে। নৌকো ভেড়াও।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে নৌকো ভেড়াল। তারপর নৌকো থেকে হাত দশেক দূরের বালিয়াড়িতে নামল। দ্রুত ওপরের দিকে ছ’সাত পা গিয়ে আবার দ্রুত ফিরে এল। ফিসফিস করে বলল, পায়ে-চলা পথের আভাস দেখলাম।
এখানেই নামব। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো হাত বাড়িয়ে বলল, রাজকুমারী, নেমে আসুন। মারিয়া আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তারপর শাঙ্কোর বাড়ানো হাত ধরে তীরের বালিকাদার মধ্যে নামল। তারপর হ্যারিও একইভাবে নামল।
শাঙ্কো ডান হাত দিয়ে সিন্দুকের একপাশের কড়াটা ধরল। অন্য পাশে হরি ধরল। তারপর উঁচু তীরভূমির দিকে আবছা অন্ধকারে উঠতে লাগল। পেছনে মারিয়া। দুটো পাথরখণ্ডের মাঝখান দিয়ে উঠে অস্পষ্ট দেখল একটা সাদাটে পায়ে-চলা রাস্তা পুবমুখো চলে গেছে। দু’পাশে কালো কালো গাছ-গাছালি। কিছুটা দূরে ডানদিকের অন্ধকারে ডুবে আছে একটা বাড়ি। পাথরের বাড়ি। সামনে টানা বারান্দা। ফুলের বাগান। বোঝা গেল অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ি। হ্যারি বলল, এই বাড়িতে নয়। এরা বড়লোক। সাবধানী নানা প্রশ্ন করবে। এগিয়ে চলল। ঐ বাড়িটা পার হয়ে কিছুটা এগোতে বাঁ দিকে একটা বাড়ি দেখা গেল আবছা অন্ধকারে ডুবে আছে। ছাউনি শুকনো ঘাস পাতার। তবে খুব শক্ত করে সমান করে বাঁধা। হ্যারি ঐ বাড়ির দিকে চলল। ছোট ছোট গুল্মের বেড়া। কয়েকটা ফুলগাছ। ওসব পার হয়ে হ্যারি বন্ধ দরজার সামনে সিন্দুকটা রেখে একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বন্ধ দরজায় আঙুল ঠুকেশব্দকরল। একবার। ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। আর একবার আঙুল ঠুকতেই ডান পাশের কাঠের জানালাটা খুলে গেল। এক বৃদ্ধ চাদর গায়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালেন। বললেন, কে?
একটু বাইরে আসবেন। কিছু বলব। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
ভদ্রলোকটি মাথা সরালেন। একটু পরেই দরজা খুলে বাইরে এলেন। অন্ধকারে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বললেন, কী চাই?
দেখুন আমরা বিদেশি বণিক। কাপড়ের তৈরি পোশাকবিক্রি করতে এসেছি। হ্যারি বলল।
জাহাজে চড়ে? ভদ্রলোক বললেন।
হ্যাঁ। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল।
বন্দরে তো থাকার মতো সরাইখানা আছে। ভদ্রলোক বললেন।
তা আছে। কিন্তু মুস্কিলে পড়েছি প্রহরীদের নিয়ে। বেশ কিছু মেকালেশ মানে স্বর্ণমুদ্রা চায়। আগেও তো ব্যবসার কাজে এসেছি। এখানকার সরাইখানায় থেকেছি। কিন্তু প্রহরীদের অন্যায় দাবি মেটাতে গিয়ে ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। তাই জাহাজ থেকে কিছু মালপত্র নৌকোয় চাপিয়ে লুকিয়ে এখানে এসেছি। কয়েকদিন থাকব। যদি আপনি আশ্রয় দেন তাহলে বাধিত হব। হ্যারি বলল।
একটু ভেবে নিয়ে বৃদ্ধ বললেন, আসুন, তবে এখানে উজির ইয়েপুদার প্রহরীরা। কিন্তু মাঝে মাঝে টহল দিয়ে যায়। বিদেশী দেখলে সন্দেহ করে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন।
তখন না হয় লুকিয়ে পড়ব। হ্যারি বলল।
ঠিক আছে। আসুন। গৃহস্থ ভদ্রলোক বললেন। উনি সরে দাঁড়ালেন। তিনজনে সিন্দুক, গাঁঠরি নিয়ে ঢুকল। অন্ধকার ঘর। ভদ্রলোক চকমকি ঠুকে ঘরের এককোণে একটা তেলের দীপ জ্বাললেন। ছোট ঘর। একপাশে একটা কাঠের পাটাতনে ছোট বিছানামতো। একটু অগোছালো। আলোতে এবার মারিয়াকে দেখে একটু চুপ করে থেকে বললেন, ইনি কে?
আমার স্ত্রী। ব্যবসার জন্যে তো অনেক জায়গায় যেতে হয়, উনি সঙ্গে থাকেন। আমাদের দেখাশুনো করেন। হ্যারি বলল।
ছেলেপুলে? ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন।
মাদ্রিদের শহরতলিতে আমার কাপড়ের ব্যবসা। ওখানেই দিদিমার কাছে ওরা থাকে। হ্যারি বলল।
স্পেনই তো আপনাদের দেশ। পোর্তুগিজ ভাষা তো ভালোই বলছেন।
পাশাপাশি দেশ। ব্যবসা করি। কথাবার্তা তো চালাতে হয়।
তা ঠিক। ভদ্রলোক বললেন।
তা আপনার নামটা জানতে পারি? হ্যারি বলল।
নিশ্চয়ই। আমার নাম সার্মেন্তো। মুস্কিল হল আমার তো বেশি বাড়তি ঘর নেই। আপনারা তিনজন মানে–এখানে–
না না। শাঙ্কোকে দেখিয়ে হ্যারি বলল, ও শাঙ্কো আমাদের কর্মচারী। ব্যবসার মালপত্র ওই সব দেখেটেখে। শাঙ্কো এখুনি জাহাজে ফিরে যাবে। আরও মালপত্র তো আছে। সেসবও তো আনতে হবে। আর এই ঘরে আমরা বেশ থাকতে পারব। উনি মারিয়া, অন্দরে কোথাও থাকবেন। কোন অসুবিধে নেই। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ হ্যাঁ যদি ওর কোনো অসুবিধে না হয়। সার্মেন্তো বললেন।
না না। কয়েকটা দিন তো! ভালই থাকবেন। হ্যারি বলল। তারপর শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, শাঙ্কো, ডন সার্মেন্তোকে দুটো স্বর্ণমুদ্রা দাও। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করল।
সেকি! আপনারা আমাদের অতিথি। সার্মেন্তো বললেন।
এ দুটো আপনাকে নিতেই হবে। ব্যবসা করি তো। এরকম আতিথেয়তা তো মূল্য দিয়েও সরাইখানায় পাব না। এই সামান্য খরচের মূল্য আপনাকে নিতেই হবে। হ্যারি বলল।
