এবার একটা চৌকোনো গাঁঠরি করো। শাঙ্কো, এসো।
মারিয়া আর শাঙ্কো মিলে বেশ সুন্দর একটা গাঁঠরি করল।
গাঁঠরি বাঁধা হচ্ছে তখনই রাঁধুনি বন্ধু এল। বলল, তাড়াতাড়ি খাবে চলে এসো।
হ্যারি, শাঙ্কো, যাও তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।
চলো, আমিও খেয়ে নেব। ক্রেভান উঠে দাঁড়াল।
আমি একেবারে পোশাক পাল্টে খাব। মারিয়া বলল।
ঠিক আছে। আমিও যাচ্ছি। তোমার খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি, শাঙ্কো আর মারিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সিসরাও খেয়ে নিল। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল, একটু ভালো পোশাক পরে নাও তুমি আর শাঙ্কো। তারপর শুয়ে বিশ্রাম করো। ঘুমিয়ে পড়ো না। আমি সময়মতো ডাকতে যাব।
তিনজনে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। শেষ ধাপটা পেরোতে পারলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। মারিয়া নিরাপদে থাকবে। কী করতে হবে ফ্রান্সিস আগেই হরিদের বলে রেখেছে।
বন্দর এলাকা, রাস্তাঘাট আস্তে আস্তে নির্জন হয়ে গেল। দু’জন প্রহরী এতক্ষণ ঘাটের পাথুরে চাতালে ঘোরাঘুরি করে বোধহয় পরিশ্রান্ত হয়ে জাহাজ-বাঁধা খুঁটির কাছে বসে গল্পগুজব করছে।
রাত একটু বাড়ল। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু তীরে ঢেউ ভাঙার শব্দ আর সমুদ্রের হাওয়ার শব্দ।
এবার পায়চারি থামিয়ে ফ্রান্সিস বেরিয়ে গেল হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকতে। দু’জনেই তাড়াতাড়ি চলে এল। নতুন নয় তবে বেশ ভালো পোশাকই পরেছে দু’জনে। মারিয়া তো আগে থেকেই পোশাক পরে তৈরি। ফ্রান্সিস গাঁঠরিটা কাঁধে তুলে নিয়ে হ্যরি ও শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, সিন্দুকটা ধরাধরি করে নিয়ে চলো ডেক-এ। পারবে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, শাঙ্কো বলল। গাঠরিটা কাঁধে নিয়ে ফ্রান্সিস সিঁড়ির দিকে চলল। পেছনে ক্রেভান বিড়বিড় করে কী বলতে লাগল। বোধহয় ঈশ্বরের কাছে সকলের জন্যে আশীর্বাদ চাইছিল। বেশ ভারী সিন্দুকটা। তবুশাঙ্কো আর হ্যারি দুদিকের লোহার কড়া ধরে নিয়ে চলল। ডেক-এ উঠে ফ্রান্সিসের কাছে, সে হ্যারি বলল, সিন্দুকটা নৌকোসুদ্ধু ডুবে যাবে না তো?
না। আমার দেখা হয়ে গেছে। সমুদ্র আজ শান্ত। ঢেউয়ের বড়রকম ঝাপ্টা লাগার সম্ভাবনা নেই। তবু তোমরা তীরের কাছাকাছি থেকে নৌকো চালিয়ে যাবে। যদি নৌকো ডুবে যায় চিৎকার-চাচামেচি করবে না। মারিয়া ভালো সাঁতার জানে। মারিয়া জলে ভেসে থাকবে। তোমরা দু’জন নৌকো সোজা করে জলের তলা থেকে সিন্দুক আর গাঁঠরি নৌকোয় তুলে নেবে। তবে মনে হয় এত সব করতে হবে না। শাঙ্কো, সাবধানে নৌকো চালাবে। দেরি হোক। ভোর হবার একটু আগেই যা বলেছি সেভাবে কাজ সারবে। সকালের মধ্যেই শাঙ্কো নৌকো নিয়ে ফিরে আসবে। শেষ রাতে এই অঞ্চলে জেলেদের নৌকো মাছ ধরতে চলাচল করে। কাজেই কারো মনে সন্দেহ হবে না। খুব অন্ধকার আজ। নজরে পড়তে পড়তে তীরে নেমে যেতে পারবে। ফ্রান্সিস কথাগুলি যেতে যেতে বলে গেল।
হালের কাছে এসে ওরা দেখল বিনোলারা কয়েকজন ডেক-এ শুয়ে আছে। শাঙ্কো চাপাস্বরে ডাকল, বিনোলা! বিনোলা ঘুমোয়নি। রাতের অভিযানের কথা শাঙ্কোর কাছে আগেই শুনেছে। বিনোলা আর এক বন্ধুকে নিয়ে মাথা নিচু করে শাঙ্কোদের কাছে এসে। সিন্দুকটা ধরে নিয়ে চলল।
ততক্ষণ ফ্রান্সিস হালের কাছে চলে এসেছে। চারদিক ভালো করে নজর বুলিয়ে নিয়েছে। জাহাজঘাটের মশালের আলোয় অস্পষ্ট দেখে নিয়েছে প্রহরী দু’জন তখনও ঘাটের ওপর ঘোরাঘুরি করছে। বন্দর শহরের রাস্তা, বাড়িঘর ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে। অনেকটা নিশ্চিন্ত হল ফ্রান্সিস। এবার গাঠরি, সিন্দুক নিয়ে নিঃশব্দে নীচে জাহাজে বাঁধা নৌকোটা নামাবে বন্ধুদের সাহায্যে। শাঙ্কো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে সিন্দুকটা আস্তে আস্তে ঢেউয়ের ঠেলায় দুলতে থাকা নৌকোর মাঝখানে রাখল। অন্ধকারে খুব অস্পষ্ট দেখল নৌকোর গলুই থেকে জল অন্তত ছ’সাত আঙুল নীচে। ও অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। বিনোলা গাঁঠরিনামিয়ে আনল। মারিয়া আর হ্যারিও আস্তে আস্তে নিঃশব্দে নৌকোর মাঝখানে নামল। শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল, দুজন একপাশে। হ্যারি ও মারিয়া সে ভাবেই বসে পড়ল। জাহাজে বাঁধা দড়ি ধরে ধরে অন্ধকারে দড়ির মুখটা খুলে দিয়েই শাঙ্কো নৌকোর আর এক কানায় বসে পড়ল। টাল খেয়ে নৌকোটা সরে এল। শাস্কো দাঁড় তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে এতটুকু নড়াচড়া না করে নিঃশব্দে বইতে লাগল। নৌকো জাহাজ থেকে দূরে সরে এল। হ্যারি, মারিয়ার কাছে নৌকো চড়ার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। ওরা দুজনে চুপ করে নিথর বসে রইল। নৌকো শান্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে চলল জেলেদের ঘাটের দিকে। আজও জেলেদের নৌকো জলে নামানো হয়নি। তীরের কাছাকাছি নৌকো আনল শাঙ্কো। তারপর খুব সাবধানে দাঁড় বাইতে লাগল। জেলেপাড়ার এলাকা ছাড়িয়ে আসতেই অন্ধকারে আবছা দেখল দুটো জেলেদের নৌকো গভীর সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। জেলেরা শাঙ্কোদের দেখতে পেল না। অস্পষ্ট দেখলেও মাছধরা নৌকো বলেই ভাবত। তীরের ধার দিয়ে নৌকো চলল। হাওয়াও বেশ নিস্তেজ। মারিয়া আকাশের দিকে তাকাল। লক্ষ লক্ষ তারা জ্বলছে। টুকরো টুকরো সাদাটে মেঘ স্তব্ধ হয়ে আছে ফিসফিস করে বলল, হ্যারি, দেখো ওপরে। কী সুন্দর আকাশ!
হ্যারি মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল, এ তো আমাদের পরিচিত দৃশ্য। তবু যতবার দেখি আশ্চর্য হয়ে যাই। এই বিরাট বিশ্বে নিজেকে কত ক্ষুদ্র মনে হয়। অথচ দুঃখ এই পৃথিবীর সব মানুষই তো এই রহস্যময় উদার আকাশ দেখে। অথচ ক্ষুদ্র স্বার্থ প্রবঞ্চনা হত্যা লুঠ রক্তপাত নিয়ে ব্যস্ত তাদের মনে কোনো দাগই কাটে না।
