একজন যোদ্ধা মোটামুটি স্পষ্ট পোর্তুগিজ ভাষায় বলল, ঠিক আছে, বলব। তবে মাননীয় উজির বড়ো মেজাজের মানুষ। তোমার অনুরোধ রাখবে কিনা জানি না।
তুমি ভাই বলল তো, তারপর যা হবার হবে। ফ্রান্সিস বেশ বিনয় দেখিয়ে বলল। যোদ্ধা চারজন নেমে গেল।
ওদিকে একটা ঘোড়ায় টানা সুদৃশ্য গাড়ি এসে থামল জাহাজঘাটে। মশালের আলোয় দেখা গেল ঘাটের প্রহরীরা সার বেঁধে গাড়িটার দুপাশে দাঁড়াল। উজির ইয়েপুদা আস্তে আস্তে পাটাতন দিয়ে নেমে গাড়িটার দিকে চলল। ফ্রান্সিস গভীর মনোযোগ দিয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিসের তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সেই যোদ্ধাটিকে খুঁজতে লাগল। হ্যাঁ, সেই যোদ্ধাটি উজিরের কাছে গিয়ে মাথা নুইয়ে সম্মান দেখিয়ে কিছু বলতে লাগল। উজির দাঁড়িয়ে পড়ে শুনল। বোধহয় কিছু বলল। তারপর গাড়িতে গিয়ে উঠল। গাড়ি চলে গেল। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। একটু আগেই পাতা পাটাতন দিয়ে। চারজন যোদ্ধা নেমে গিয়েছিল। প্রায় আট-দশজন যোদ্ধাকে দেখা গেল পাটাতনের দিকে আসতে। সবার সামনে বেশ জবরজং পোশাক পরা একজন। মাথায় শিরস্ত্রাণ। সবাই যখন উঠে আসছে হ্যারি চাপাস্বরে ডাকল, ফ্রান্সিস!
দাঁড়াও তল্লাসি ঠেকাতেই হবে। ফ্রান্সিসও বেশ চাপা স্বরে বলে উঠল।
যোদ্ধাদের নিয়ে সামনের জন ফ্রান্সিসদের কাছে এল। কোমরে সোনারুপোর কাজ করা চওড়া বেল্ট। তরোয়ালের হাতলে সোনারুলোর গিল্টিকরা। বোঝা গেল সেনাপতি। সেনাপতি কাছে এসে বলল, তোমাদের অস্ত্রঘরে যত অস্ত্রশস্ত্র আছে নিয়ে এসো। সব বাজেয়াপ্ত করা হবে।
খুব ভালো কথা। ফ্রান্সিস দ্রুত বলে উঠল, সত্যিই তো আমরা বিদেশী। লুঠেরা। দস্যু বলে আমাদের বদনামও আছে। কখন কী করে বসি। এক্ষুনি সব অস্ত্রশস্ত্র জমা দিচ্ছি। আপনারা অপেক্ষা করুন। শাঙ্কো যাও তাড়াতাড়ি। মাননীয় উজিরের হুকুম মানতেই হবে। শাঙ্কোর সঙ্গে আরো কয়েকজন বন্ধুও জুটে গেল। ফ্রান্সিস বলল, কিন্তু একজন যোদ্ধাকে তো বলেছিলাম আমরা অনেকটা দূর থেকে জাহাজ চালিয়ে আসছি। খুব পরিশ্রান্ত আমরা।
হুঁ। মান্যবর উজিরের হুকুম-কাল সকালে জাহাজ তল্লাশি হবে। সেনাপতি বলল।
খুব অনুগৃহীত হলাম। মহামান্য উজির দীর্ঘজীবী হোন। ফ্রান্সিস খুব খুশির ভঙ্গিতে বলে উঠল। হ্যারিফ্রান্সিসের এইবিগলিতভাব দেখে কেশআশ্চর্যইহল। তবেমনেমনেফ্রান্সিসের কেশ প্রশংসাই করল। উজিরের বিশ্বাস উৎপাদনে এই কৃতার্থভাব দেখাতেই হবে।
শাঙ্কোরা সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এল। ডেক-এ জড়ো করল।
কোনো অস্ত্রশস্ত্র পড়ে নেই তো? ফ্রান্সিস বলল।
না–না। সব এনেছি। এমনকি তীরধনুকও। শাঙ্কো বলল। সেনাপতি অস্ত্রের পরিমাণ দেখে খুশিই হল। সে ইঙ্গিতে যোদ্ধাদের সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যেতে বলল। যোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চলে যেতে লাগল। সেনাপতি বলল, কালকে তোমাদের মহামান্য খলিফার দরবারে হাজির করা হবে।
খুব আনন্দের কথা, ফ্রান্সিস বলল। সেনাপতি ও যোদ্ধারা নেমে গেল। ঘাটে নেমে সেনাপতি পিছু ফিরে পাটাতন তুলে নিতে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো, বিনোলা ছুটে গিয়ে পাটাতন তুলে ফেলল। ফ্রান্সিস ছুটে এসে রেলিং থেকে ঝুঁকে গলা চড়িয়ে বলল, মাননীয় সেনাপতি, নোঙর ফেলা হয়েছে, কিন্তু মোটা কাছি দিয়ে ঘাটের ঐ খুঁটির সঙ্গে কাছিটা বাঁধা হয়নি। সেনাপতি দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হাত নেড়ে কথাটার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে চলে গেল। পেছনে যোদ্ধারাও চলল।
হ্যারি, দুটো সিঁড়ি পেরোলাম। এবার তৃতীয় সিঁড়িটা। তোমরা শিগগির এসো।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি চলে আসে কেবিনঘরে। মারিয়া চিন্তাগ্রস্ত মুখে তখন থেকে বসে আছে। ক্রেভানও কম চিন্তিত নয়। ফ্রান্সিস কোনোদিকে না তাকিয়ে দ্রুত গিয়ে সিন্দুকের ডালাটা খুলল। হিসেব করে দেখল সিন্দুক যতটা ফাঁকা হয়েছে তাতে বেশ কিছু কাপড় চোপড় আঁটানো যাবে। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, দোরেস্তাদ বন্দরে তোমাদের যেনতুন পোশাকগুলি তৈরিকালেতারই গোটা সাত-আট পোশাক নিয়ে এসো। তাড়াতাড়ি। শাঙ্কোরা কয়েকজন প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার নতুন পোশাকটা বের করো। আর একটা তুলে রাখা মানে কম ব্যবহার করেছএমন পোশাকআর একটা গায়ে দেবার চাদর বের করে আনো।
সেই চাদর তো গরম চাদর। ফুল-পাতার কাজ করা। দামি। মারিয়া বলল।
ক্ষতি নেই। বের করো তাড়াতাড়ি। মারিয়া ছুটে গিয়ে ওর সবচেয়ে শৌখিন চামড়ার ঝোলা থেকে দুটোই বের করে আনল। ফ্রান্সিস সেই দামি চাদরটা একবার দেখল। তারপর মেঝেয় পাতল। মারিয়াই পাততে সাহায্য করল। ততক্ষণে শাঙ্কো নতুন পোশাকগুলি নিয়ে এল।
মারিয়া, সব পোশাক দ্রুত পরিপাটি করে ভাঁজ করে সিন্দুকে সাজিয়ে দাও। মারিয়া সব পোশাক তাড়াতাড়ি পরিপাটি করে ভাঁজ করে সিন্দুকে ভরল। ফ্রান্সিস বলল, তোমার নতুনপোশাকটা একেবারে ওপরে রাখো। মারিয়া পোশাকটা ভাঁজ করতে করতে ভাবল পোশাকটা একবারও পরা হয়নি। কিন্তু এই ভাবনাটা আমল দিল না। ওটা ভরা হলে ফ্রান্সিস ডালাটা নামাল। দেখলআঙুল তিনেকজুহয়ে আছে ডালাটা। ফ্রান্সিস ডাকলশাঙ্কো তোমরা হাতলাগাও। জোরে চেপে ডালা বন্ধ করো। শাঙ্কোরা এগিয়ে এসে চেপে চেপে ডালা লাগাল। ফ্রান্সিস ডালাটার কড়া নেড়ে নীচের গোল ছাদাটায় ঢুকিয়ে জোরে সিন্দুকটা বন্ধ করল। তারপর শাঙ্কোদের দিকে তাকিয়ে আরো কিছু পোশাক নিয়ে আসতে বলল। নতুন না হলেও চলবে। শাঙ্কোরা আগের মতোই ছুটে চলে গেল। আরো কিছু পোশাক নিয়ে এল। মেঝেয় পাতা চাদরটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল, ভালো ভাবে ভাজ করে পোশাকগুলি ওখানে রাখো তাড়াতাড়ি। মারিয়া অল্পক্ষণের মধ্যেই কাজটা সারল।
