ফ্রান্সিস বেশ চিন্তায় পড়ল। আজ রাতেই যদি তল্লাশি হয় তাহলে মারিয়াকেলুকিয়ে রাখা অসম্ভব। মারিয়ার বিপদ হতে পারে অভিজ্ঞ ক্রেভানের এই আশঙ্কা অমূলক নয়। একটা উপায় বের করতেই হবে এবং আজ রাতের মধ্যেই। কিন্তু তল্লাশি হলে কখন হবে, কতটা সময় হাতে পাবে তাও তো ফ্রান্সিস বুঝতে পারছে না। তবে কথায় ব্যবহারে– ইয়েপুদাকে যা দেখল তাতে এটা ভালো করেই বুঝল ঐ লোকটাকে চটানো চলবে না। বরং বিনাবাক্যে ওর হুকুম প্রত পালন করতে হবে। এটা ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ফ্রেজারের কাছে এল। মুর যোদ্ধা ক’জনকে দেখল ডেক-এর এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। ফ্রান্সিস দেশীয় ভাষায় বলল, ফ্রেজার, এক্ষুনি জাহাজ ঐ জাহাজের সামনে নিয়ে যাও। তারপর ঐ বন্দর লক্ষ্য করে আস্তে চালাও। তাহলে ঐ জাহাজও আমাদের। পাশে পাশে আসবে। শুনলে তো ঐ উজিরের কথা।
আমাদের ভাগ্য খারাপ, ফ্রেজার বলল।
দুর্ভাগ্য-টুর্ভাগ্য বাজে কথা। ভাগ-টাগ্য বলে কিছু নেই। ঘটনা ঘটে। কখনও আমাদের স্বপক্ষে কখনও বিপক্ষে। বিপক্ষে গেলে লড়তে হয়। যাক ওসব কথা। এখন অনেক চিন্তা। জাহাজ ছাড়ো। ফ্রান্সিস দ্রুত হ্যারিদের কাছে এল। মৃদুস্বরে বলল, হ্যারি এসো। কথা আছে।
কেবিন ঘরে ঢুকে দেখল মারিয়া চুপ করে বসে আছে। ঘর অন্ধকার।
আলো জ্বালো। ভয়কে জয় করতে হয়। ফ্রান্সিস আস্তে কথাটা বলে অভ্যেস মতো বিছানায় শুয়ে পড়ে চোখ বুজল। ক্রেভান নিশূপ। আস্তে আস্তে একপাশে বসল। হ্যারি চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়া আলো জ্বালল। কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়েই রইল। ঘর নিস্তব্ধ। কেউ কোনো কথা বলছে না।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস চোখ খুলে দ্রুত উঠে বসল। একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। তারপর বলল, হ্যারি, ছক কষা হয়ে গেছে। শুধু দুটো সুযোগ চাই। এক, আজকের রাতটা আর এই বন্দর এলাকায় নৌকো চলাচল করে কিনা। তারপর বলল, সন্দেহ নেই ঐ উজির ইয়েপুদা অর্থপিশাচ। প্রবল ক্ষমতালোভী। -ওকে বাগে আনতে হবে। হ্যারি। চুপ করে রইল। এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ওর সমস্ত পরিকল্পনা সংক্ষেপে বলল। হ্যারি অল্পক্ষণ ভেবে নিয়ে বলে উঠল, সাবাস ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, পারবে তো যা করতে বললাম?
কেন পারব না। এমন কি কঠিন কাজ? হ্যারি তো সঙ্গেই থাকবে। মারিয়া বলল।
এবার বন্দরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। হ্যারি, তুমি, মারিয়া আর শাঙ্কো তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবে। উপোসি পেটে কোনো কাজ হয় না। একটু চুপ করে থেকে বলল, হ্যারি, এবার শাঙ্কোকে গিয়ে সব বুঝিয়ে বলো। মুর যোদ্ধারা আছে। দেশীয় ভাষায় বলবে। যাও। হ্যারি কোনো কথা না বলে চলে গেল। ক্রেভান মৃদুস্বরে বলল, ফ্রান্সিস, তুমি শুধু দুঃসাহসী নও, বুদ্ধিমানও। ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে আবার শুয়ে পড়ল। মারিয়া বলল, তাহলে আমার বিপদ হবে না, কিন্তু তোমাদের কী হবে? চোখ বন্ধ করে ফ্রান্সিস বলল, পরের ঘটনা কী ঘটে তা দেখে বাকি ছক ভাবব।
উজির ইয়েপুদার টহলদারি জাহাজের পাশে পাশে ফ্রান্সিসদের জাহাজ বন্দরের কাছে এল। ফ্রান্সিস ততক্ষণে ডেক-এ উঠে এসেছে। পাশে দাঁড়ানো হ্যারিকে মৃদুস্বরে বলল, পেড্রোকে ডাকো। হ্যারি দ্রুত গিয়ে পেড্রোকে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস আগের মতোই মৃদুস্বরে বলল, পেড্রো, মাস্তুলে ওঠো। কেউ. এই অন্ধকারে দেখবে না। জাহাজঘাটে মালের আলো আছে। ওপরে উঠে যতটা সম্ভব নজর দিয়ে দেখবে তীরের কাছে কোথাও নৌকো আছে কিনা। ঘাটে পৌঁছবার আগেই নেমে আসবে। তাড়াতাড়ি যাও।
পেড্রো এ ব্যাপারে অভ্যস্ত। মুর যোদ্ধাদের দেখল। দু’জন সিঁড়িঘরের কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে। অন্য দু’জনের একজন জাহাজের মাথার দিকে, অন্য জন হালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। পেড্রো নিঃশব্দে দ্রুত মাস্তুলের মাথায় উঠে গেল। নিজের জায়গায় বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জাহাজঘাট ও দু’পাশ দেখতে লাগল। ঘাটে বেশ কয়েকটা মশাল জ্বলছে। কয়েকজন প্রহরীকেও দেখল। ডানদিকে তীরভূমিতে কিছু বাড়ি-ঘর অস্পষ্ট দেখল। বাঁদিকে তাকাতেই দেখল বেশ দূরে কয়েকটা নৌকোর কালো ছায়া মতো। বালিয়াড়িতে কয়েকটা খুঁটিও।
তার মানে ওগুলো মাছ-ধরা জাল টাঙানোর খুঁটি। ওটা জেলেপাড়া। পেড্রো নিঃশব্দে দ্রুত নেমে এল। তারপর কোনো ব্যস্ততা না দেখিয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এসে মৃদুস্বরে বলল, বাঁদিকে জেলেপাড়া, নৌকো কয়েকটা বাঁধা। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল, হ্যারি, মূল্যবান তথ্য। এবার রাতের তল্লাশি আটকানো।
দুটো জাহাজই জাহাজঘাটে ভিড়ল। মুর যোদ্ধা চারজন নামার জন্যে তৈরি হল। ফ্রান্সিস দ্রুত ওদের কাছে এল। বলল, আমাদের জাহাজের নোঙর ফেলব। তবু তীরের কোনো খুঁটির সঙ্গে শক্ত কাছি দিয়ে আমাদের জাহাজের হালটা বাঁধা। কাজটা করে মান্যবর উজিরকে গিয়ে বলবে আর আমাদের একটা অনুরোধ জানাবে। উনি মান্যবর উজির, সম্মানিত মানুষ তাকে তো এখানে আসতে বলতে পারি না। তাকে বলবে যে আমরা অনেকটা সমুদ্র এলাকা একটানা চলে এসেছি। আজকের রাতটা বিশ্রাম করতেই হবে। নইলে কালকে উঠে দাঁড়াতে পারব না। কাজেই উনি যেন কাল সকালে তল্লাশির ব্যবস্থা করেন। অনুরোধ, আমার কথাগুলো বুঝিয়ে বলো, কেমন?
