সেদিন শেষ বিকেলে মারিয়া রেলিং ধরে সূর্যাস্ত দেখছে। সূর্য এখনও অস্ত যায়নি। নজরদার পেদ্রোর চিৎকার শোনা গেল, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। বন্দর শহর। ওদিক থেকে। একটা জাহাজ আসছে। মনে হচ্ছে আমাদের দিকে।
শাঙ্কো সিঁড়িঘরের কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রেলিং ধরে পুব দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যারি আর মারিয়া ওর পাশে এসে দাঁড়াল। একটু পরেই ফ্রান্সিস বুঝল জাহাজটা ওদের জাহাজ লক্ষ্য করেই আসছে। হতে পারে জাহাজটা ওদের জাহাজের পাশ দিয়েই চলে যাবে। কাছে না এলে বোঝা যাবে না। জাহাজটা অনেক কাছে চলে এল। সূর্যাস্তের শেষ আলোর আভায় দেখা গেল মাস্তুলে একটা পতাকা উড়ছে। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল, পতাকাটা কোন দেশের ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ক্রেভানকে ডেকে আন তো।
হ্যারি দ্রুত ছুটে গিয়ে ক্রেভানকে নিয়ে এল। ক্রেভান এখন বেশ সুস্থ। একাই হেঁটে এল। মনোযোগ দিয়ে জাহাজের পতাকাটা দেখতে লাগল। জাহাজটা তখন অনেক কাছে এসে গেছে। সেই জাহাজের ডেকে দেখা গেল সশস্ত্র যোদ্ধাদের। গায়ের রং কালো। আঁটোসাঁটো কালো পোশাক। কোমরে চামড়ার চওড়া বেল্ট। তাতে তরোয়াল ঝুলছে।
এরা মুর। মুরদের টহলদারি জাহাজ। হয় পর্তুগাল নয় তো স্পেনের কাছে এসেছি আমরা। দুই দেশের বেশ কিছু এলাকায় মুররা রাজত্ব করছে। ক্রেভান বলল।
ফ্রান্সিস, কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল।
দেখি ওরা আমাদের কাছে আসে কিনা। এলে কী বলে শুনি। ফ্রান্সিস একটু চিন্তিত স্বরে বলল। ক্রেভান মৃদুস্বরে বলতে লাগল, আমি এইসব জায়গায় আগে এসেছি। মুররা হচ্ছে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার একটি মুসলিম জাতি। পোর্তুগাল, স্পেনের বেশ কিছু অঞ্চল জয় করে রাজত্ব করছে। যুদ্ধে পারদর্শী। কিন্তু পরধর্ম-অসহিষ্ণু। তবে এই মুর শাসকদের মধ্যে শিল্পানুরাগী, সাহিত্যপ্রেমিকও আছেন। এদের কবলে পড়লে কিন্তু মারিয়ার বিপদ হতে পারে।
বেশ চমকে উঠে ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, মারিয়া তুমি চলে যাও। আগে সব দেখি বুঝি। মারিয়া ঠিক বুঝল না কিছু। তবে নেমে কেবিন ঘরে চলে এল।
এবার সন্ধ্যার আবছা আলোয় জাহাজের সব কিছুই দেখা গেল। মুর যোদ্ধারা বেশ তৎপর দেখা গেল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটাই যে ওদের লক্ষ্য বোঝা গেল এবার। জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। আঁকুনি খেল দুটো জাহাজই। মুর যোদ্ধারা লাফিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেক-এ উঠে এসে সারি দিয়ে দাঁড়াল। জলদস্যুর দল হলে লড়াইয়ের কথা ভাবা যেত। কিন্তু মুরদের উদ্দেশ্য কি তা তো স্পষ্ট নয়।
মুরদের জাহাজ থেকে এবার যে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এল সে যোদ্ধা নয়। বেশ দামী কাপড়ের ঢোলা গভীর নীল রঙের পোশাক পরা। বেশ সুগঠিত শরীর। মুর যোদ্ধারাও বলিষ্ঠ চেহারার। লোকটির মাথায় পেঁচিয়ে বাঁধা লাল রঙের দামী কাপড়। মুখে দাড়ি-গোঁফ। বেশ ভারিক্কি ভঙ্গি চলাফেরায়। ফ্রান্সিসদের কাছে এসে পর্তুগিজ ভাষায় বলল, তোমরা কারা? ফ্রান্সিস লোকটির চোখের দিকে তাকাল। বেশ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি চোখে। বেশ ক্ষমতাধর মানুষের চাউনি।
আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
এখানে এসেছ কেন? লোকটি জানতে চাইল।
তার আগে বলুন আপনার পরিচয় আর এটা কোন বন্দর? ফ্রান্সিস বলল।
লোকটা এই প্রশ্নে খুশি হল না। বোঝা গেল প্রশ্ন করা পছন্দ করে না। তবে বিরক্তি চেপে বলল আমি উজীর ইয়েপুদা। এটা পোর্তুগালের একটি বন্দর শহর পোত। কিছুদূরে রাজধানী পৌরো। শাসকের নাম খলিফা হাকিম। একনাগাড়ে বলে গিয়ে উজির ইয়েপুদা এবার বলল, তোমাদের পরিচয় বলল।
আমরা ভাইকিং। দেশ থেকে বহুদিন আগে জাহাজে চড়ে বেরিয়েছি। কত দ্বীপদেশ ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
হুঁ। কিন্তু লুঠেরা দস্যুর বদনাম আছে তোমাদের। উজির বলল।
আমাদের সঙ্গে লড়াই করে যারা হেরে যায় তারা এই দুর্নাম দেয়। আর কিছু ভাইকিং জাতির কলঙ্ক ভাইকিং নিশ্চয়ই আছে। তাদের দলেরএক সর্দারকে আমি আমার স্বদেশবাসী হওয়া সত্ত্বেও হত্যা করেছি। বাকিদের বিন্দুমাত্র করুণা না করে তাড়িয়ে দিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
হুঁ। প্রথম শুনলাম। সমুদ্রের ধারে টহলদারি করি আমরা। আমি উজির, মাঝে মধ্যে আসি টহলদারির কাজ দেখতে। যাক গে, তোমাদের সঙ্গে দরবারে পরে কথা হবে। কিন্তু আমাদের জাহাজের সঙ্গে তোমাদের জাহাজ বাঁধা হবে। পোতো বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। জাহাজ তল্লাশি করা হবে। কালকে সকালে খলিফা হাকিমের দরবারে হাজির হন। করা হবে। খোঁজখবর করা হবে। উজির বলল।
তাহলে কি আমাদের বন্দি করা হল? হ্যারি বলল।
সেটা সব খোঁজখবর নিয়ে পরে স্থির হবে। উজির বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল, আমাদের জাহাজ বাঁধার দরকার নেই। আপনার জাহাজের পাশে পাশেই বন্দরে যাব।
বেশ। উজির ইয়েপুদা বলল। তারপর চলে যেতে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল, সাবধান! পালাবার চেষ্টা করবে না। একবার লড়াইয়ে নামলে আমরা শত্রুদের কাউকে বেঁচে থাকতে দিই না। শুনেছি তোমরা সাহসী, লড়াইয়ে দক্ষ। অনেক লড়াইয়ে বোধহয় জিতেছও। কিন্তু তবু সাবধান! উজির ইয়েপুদা নিজেদের জাহাজে চলে গেল। চারজন মুর যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের পাহারায় রইল। বাকিরা চলে গেল।
