দুপুরে গড়িয়ে বিকেল হল। কোনো বিপদ ঘটল না। মারিয়া ফিরে এসে রেলিং ধরে সূর্যাস্ত দেখতে লাগল।
সন্ধের পরেই গত রাতের মতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সব বন্ধুরা তীরভূমিতে নেমে এল। গত রাতের মতোই পাহারা দেওয়ার কাজ শুরু হল। ফ্রান্সিস, হ্যারিরা কয়েকজন। লায়েন্ডের বাড়ির বাইরের ঘরে ঠাসাঠাসি করে রাত কাটাল। প্রায় কেউই সারারাত ঘুমোবার সুযোগ পেল না।
ভোর হতে সবাই জাহাজে ফিরে এল।
জাহাজের ডেক-এ উঠে ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল, নীচে এসো কাজের কথা আছে। কাল রাতে পাছে বৃদ্ধের ঘুম ভেঙে যায় তাই তোমাকে বলা হয়নি। শাঙ্কোকে ডেকে নিয়ে এসো।
ফ্রান্সিস কেবিনে ঢুকল। একটু পরেই হ্যারি আর শাঙ্কো এল। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, ছেঁড়া পালের একটা বড় টুকরো নিয়ে এসো। শাঙ্কো চলে গেল। একটু পরেই শাঙ্কো ছেঁড়া পালের একটা বড় টুকরো, নিয়ে এল। ফ্রান্সিস ওটা মেঝেয় পাতল। তারপর হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যারি, আমি স্থির করেছি হারন্ডের অভিশপ্ত ধনভাণ্ডারের অর্ধেক এই স্লাভিয়া গ্রামের মানুষদের কল্যাণের জন্য দিয়ে যাব।
খুব ভালো কথা। এটা একটা কাজের কাজ হবে। হ্যারি আনন্দে বলে উঠল।
শাঙ্কো, সিন্দুকটা খুলে সবকিছু এই কাপড়টায় ঢালো। দুটো ভাগ করবে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়ল। সিন্দুক খুলে সব অলঙ্কার মুদ্রা সোনার চাকতি মণিমুক্তো কাপড়টার ওপরে ঢালল। তিনজনে মিলে দেখে দেখে দু’টো ভাগ করল সব। এক ভাগ কাপড়টায় রেখে গাঁঠরি মতো বাঁধা হল। বাকি ভাগ সিন্দুকে তুলে রাখা হল।
হ্যারি বলে, এখনই কাজটা সেরে আসি। শাঙ্কো গাঁঠরিটা নাও। শাঙ্কো গাঁঠরিটা কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস হ্যারিও এল। তিনজনে। একে একে পাটাতন দিয়ে হেঁটে তীরে নামল। উঁচু পাড়ে উঠল। চলল লায়েন্ডের বাড়ির দিকে। লায়েন্ড দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দেখে হেসে বলল, এখন এলেন?
ভেতরে চলুন, কথা আছে ফ্রান্সিস বলল। ভেতরে ঢুকে মেঝেয় গাঁঠরিটা রেখে। শাঙ্কো বলল, আমাদের রাজকুমারী কোথায়?
ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল, আঃ শাঙ্কো! লায়েন্ড তো অবাক। বলল, উনি রাজকুমারী? আপনাদের দেশের? ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বলে, আরে না না। উনি গরীব ঘরের মেয়ে। আমরা ঠাট্টা করে রাজকুমারী বলে ডাকি।
ও। তাই বলুন। লায়েন্ড হাসতে হাসতে বলল।
শাঙ্কো, ফ্রান্সিস বলল, মুখটা খোলো। শাঙ্কো গাঁঠরির মুখটা খুলল। অত অলঙ্কার, সোনা দেখে লায়েন্ড হাঁ করে সেই দিকে চেয়ে রইল। বিস্ময়ে হতবাক।
লায়েন্ড, এসব কোথা থেকে কী করে পেলাম আপনার জানার দরকার নেই। এই সব সম্পদ আপনাকে দিলাম। কিন্তু শর্ত আছে। এই সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাবেন গ্রামের সব পরিবারকে সমানভাবে ভাগ করে দেবেন সতোর সঙ্গে। এই সব কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে আপনি কিছু বেশি অর্থ নেবেন। আমরা চাই আপনাদের গ্রামের মানুষেরা দুঃখ-দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হোক। এটা কিন্তু দয়া দেখানো নয়। কৃতজ্ঞতার উপহার। ফ্রান্সিস বলল।
এতক্ষণে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে লায়েন্ড বলল, আপনাদের যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব। সত্যি, বড় কষ্টে দিন কাটে আমাদের।
ঠিক আছে। এবার অর্থের বিনিময়ে উন্নতির সুযোগ কাজে লাগান। কিন্তু রাজকুমারী কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
ওপাশের এক ধার্মিক বুড়ি রাজকুমারীকে প্রায় জোর করে নিয়ে গেছে। বোধহয় ধর্মকথা শোনাতে। লায়েন্ড হেসে বলল।
ঠিক আছে। চলি। আজ দুপুরেই আমরা জাহাজ ছাড়ব। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। জাহাজে ফিরে ডেক-এ দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাই সব, কাছে এসো আমার কিছু বলার আছে। বন্ধুরা অনেকেই ডেক এর এদিকে-ওদিকে কাজে ব্যস্ত ছিল অনেকে ডেক-এও বসেছিল। ফ্রান্সিস বলতে লাগল, শোন, এখন মনে হচ্ছে বিপদ কেটে গেছে। দুপুরেই আমরা জাহাজ চালাব। কিন্তু দাঁড়ঘরে যারা থাকবে তারা ছাড়া বাকি সবাই ডেক-এ তরোয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই এলাকা ছেড়ে যত দ্রুত সম্ভব পালাতে হবে। সবাই তৈরি হও। গভীর সমুদ্রে পড়ে যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালাতে হবে। যাও।
বন্ধুদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। পাল খোলা, হালের দড়িদড়া পরীক্ষা করা, কাজ তো কিছু কম না।
দুপুরে নোঙর তোলা হল। একদল দাঁড় টানতে দাঁড়ঘরে চলে গেল। কয়েকজন পালের কাঠামোয় উঠে বেশি বেশি হাওয়া ধরার জন্যে পাল ঠিক করতে লাগল। ফ্রেজার জাহাজ চালাতে শুরু করল। জাহাজের গতি বাড়তে লাগল। ফাঁড়ির মুখে জাহাজ এল। দিকচিহ্নহীন সমুদ্রে পড়ে জাহাজ উঁচু উঁচু ঢেউ ভেঙ্গে ছুটল। জাহাজের দুলুনির মধ্যেও ভাইকিংরা যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল জাহাজের গতি বাড়াতে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ দ্রুত চলল। সন্ধেবেলা ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। ফ্রেজারের কাছে এসে বলল, দিক ঠিক রেখেছ তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তবে কোনো ছোট-বড় বন্দর পেলে বুঝতে পারব কত দূরে এলাম।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। ভেবে নিশ্চিন্ত হল ইয়ুসুফের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে আসা গেছে।
সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে জাহাজ চলল। এতদিন ভাইকিংরা সমুদ্রে যাত্রীবাহী বা মালবাহী জাহাজ খুব কমই দেখেছে। কিন্তু এখন ইউরোপে এসে মাঝেমাঝে জাহাজগুলোর মাস্তুলের মাথায় বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে। ওদের দেশের জাহাজও একটা দেখেছে। কিন্তু বেশ দূরে। সেই জাহাজের কাছে যেতে ফ্রান্সিস খুব একটা আগ্রহ দেখাল না। হ্যারল্ডের মতো আবার যদি কোনো লুঠেরা দস্যুদলের পাল্লায় পড়তে হয়!
