তা ঠিক। ফ্রান্সিস সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল।
কেবিনে ঢুকে দেখল ক্রেভান বিছানার একপাশে চুপ করে বসে আছে। ফ্রান্সিস বলল, কী? ঔষুধ খেয়েছ তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ। মারিয়া বড় লক্ষ্মী মেয়ে। আমার হাত-মুখ ধুইয়ে ওষুধ খাইয়ে গেছে। কিন্তু তুমি সারারাতে ফিরলে না। কী ব্যাপার? ক্রেভান বলল।
ক্রেভান, ফ্রান্সিস তরোয়ালটা বিছানার নীচে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল, ইয়ুসুফ যে কী সংঘাতিক লোক কল্পনাও করতে পারবে না। ইয়ুসুফ সৈন্যভর্তি জাহাজ নিয়ে আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের খোঁজে এই ফাঁড়িতে ঢুকেও হামলা চালাবে। তাই আমরা গ্রামেই ছিলাম। রাত জেগে পাহারা দেওয়া চালিয়েছি।
সত্যি, চিন্তার কথা, ক্রেভান বলল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে পায়ের দিকে তাকাল। ছোট্ট ঘর। প্রায় পায়ের কাছে রাখা হ্যারল্ডের লুঠ করা ধনসম্পদের সিন্দুকটা। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিসের মনে হল কী হবে এই লুঠেরার সম্পদ নিয়ে? দেশের রাজাকে গিয়ে দিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু রাজা ম্যাগনামের সম্পদের গাঁঠরিটাও তো রয়েছে। এত মূল্যবান সম্পদ জাহাজে রাখা কি উচিত হবে? জলদস্যুর পাল্লায় পড়লে তো আমাদের জীবন বিপন্ন হবেই। এইসব ধনসম্পদও লুঠ হয়ে যাবে। এত ধনসম্পদ জাহাজে রাখা বিপজ্জনক নয় কি? তখনই মারিয়া ঢুকল। পেছনে সকালের খাবার হাতে রাঁধুনি বন্ধু। তিনজনে বিছানায় বসে খেতে লাগল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, যার বাড়িতে আমরা রাজা ম্যাগনামের এক পাটি জুতো পেয়েছিলাম তার নাম লায়েন্ড। তাকে বলে এসেছি তুমি যাবে।
আমি এখনই যাব। খুশিতে বলে উঠল মারিয়া।
ঠিক আছে। কিন্তু দুপুরে জাহাজে এসে খাবে। ওরা কিন্তু দরিদ্র। বাড়তি লোকের খাবার জোগাড় করা ওদের পক্ষে কষ্টকর হবে। ফ্রান্সিস বলল।
না, না। ওরা খেতে অনুরোধ করলেও আমি শুনব না। চলে আসব। কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে যাব। ওদের দেব। মারিয়া বলল।
একটু চমকে উঠে ফ্রান্সিস বলে উঠল, ঠিক। এ কথাটা এতক্ষণ আমার মাথায় আসেনি।
মারিয়া অবাক। বলল, হঠাৎ এ কথা বলছ?
হ্যাঁ মারিয়া। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অবাক মারিয়া বলল।
শোন। হ্যারল্ডের লুঠ করা ধনসম্পদের অর্ধেক এই স্লাভিয়া গ্রামবাসীদের জন্যে লায়েন্ডকে দিয়ে যাব। যে অর্থ ওরা এসব বিক্রি করে পাবে তাই দিয়ে চাষবাসের কাজে লাগাতে পারবে, বাড়িঘর মেরামত করতে পারবে, মাছ ধরবার ভালো ভালো জাল কিনতে পারবে, নৌকো কিনতে পারবে। এই দারিদ্র্য সবটা না হলেও কিছু তো ঘুচবে। জীবনে কোনোদিন এই গ্রামে আর আসব না। কিন্তু ওরা তো আমাদের মনে রাখবে। কত মানুষ, নারী, শিশুর রক্ত লাগা এই অভিশপ্ত সম্পদ সকাজে তো ব্যয় হবে।
সত্যি ফ্রান্সিস, তুমি কত কিছু ভাবো। মারিয়া বলল।
ভাবায় বলেই ভাবি। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
আমি তাড়াতাড়ি যাব। মারিয়া বলল।
নিশ্চয়ই। যাও।
মারিয়া উঠতে উঠতে বলল, ফ্রান্সিস, দোরেস্তাদ বন্দরে যে নতুন পোশাকটা তৈরি করিয়েছিলাম সেটা তো একবারও পরিনি। ওটা পরে যাব?
না, না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল, ঐ দামি পোশাক পরে গেলে ওরা তোমাকে আপন করে নিতে পারবে না। আর একটা কথা, তুমি যে আমাদের দেশের রাজকুমারী এ কথা কক্ষনো বলবে না। যা পরে আছ তাই পরে যাও। ওদের ঘর রাজপ্রাসাদের আলোকোজ্জ্বল অন্তঃপুর নয়।
বেশ, তোমার কথা তো অমান্য করতে পারি না। মারিয়া বলল। তারপর মাথার চুলে চিরুনি বুলিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। বৃদ্ধ ক্রেভান এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এবার বলল, ফ্রান্সিস, আমি তোমাকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। তুমি সত্যিই ভাইকিং জাতির গর্ব।
ক্রেভান, মানুষের প্রতি ভালোবাসা পেতে গেলে নিজের আচার-আচরণকে পবিত্র রাখতে হয়। বলো, তাই কিনা? ফ্রান্সিস বলল।
অবশ্যই। এই বৃদ্ধ বয়েসেও তোমার কাছে আমার অনেক কিছু শেখার আছে। ক্রেভান বলল।
থাক ওসব। আজকের রাতটাও আমাদের প্রায় জেগেই কাটবে। যদি বিপদ না ঘটে তাহলে কালকে দুপুরেই জাহাজ ছাড়ব। এখন বলুন, আপনি কী করবেন? আমাদের সঙ্গে থাকবেন? ফ্রান্সিস বলল।
না, না। তোমরা আমার জন্যে অনেক করেছ। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। দোরেস্তাদ বন্দরে আমাকে নামিয়ে দিও। তোমাদের বোঝা হব না। ক্রেভান বলল।
মুশকিল হয়েছে দোরেস্তাদ বন্দরে জাহাজ ভেড়ালে আমাদের জীবন বিপন্ন হবে। বরং আমাদের সঙ্গে চলুন। পরে যে দেশের বন্দরে থামব সেখানে আপনাকে বেশকিছু সোনার চাকতি দিয়ে নামিয়ে দেব। তারপর আপনার যা মন চায় করবেন। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে। সেটাই ভালো হবে। তোমাদের যেন কোনো বিপদ না হয়, ক্রেভান বলল। ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা আমার।
দুপুরে খুশিতে উচ্ছল মারিয়া এল। ফ্রান্সিসকে বলল, উফ, যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। প্রায় সব বাড়ির মেয়েরা এসে জড়ো হয়েছিল। কত কথা, কত গল্পগুজব–কী আনন্দে যে সময়টা কাটল। মারিয়াকে এত খুশি, এত উচ্ছল দেখে ফ্রান্সিসের মনও প্রসন্ন হল। ও সব সময়ই চায় মারিয়া আনন্দে থাকুক, খুশিতে উচ্ছল থাকুক। খেয়ে নিয়ে আবার যাও কিন্তু বিকেলেই ফিরে এসো ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে বন্ধুরা কয়েকজন মিলে দূর সমুদ্র-মুখের দিকে নজর রেখে চলেছে। পেড্রো তো সকাল থেকেই ওর নজরদারির জায়গায় বসে আছে।
