কিছুক্ষণের মধ্যেই লায়েন্ডকে নিয়ে হ্যারি ফিরে এল। ফ্রান্সিসকে বলল, সবার সঙ্গেই কথা হয়েছে। সবাই সাগ্রহে রাজি হয়েছে। তবে সবাই এর কারণ জানতে চাইছিল।
স্বাভাবিক। জাহাজ থাকতে আমরা গ্রামের বাড়িগুলোয় রাতে আশ্রয় নিচ্ছি কেন এর কারণ তো জানতে চাইবেই। যাক গে, এবার দুটো করে দল করো। কীভাবে পাহারার কাজ চলবে বন্ধুদের বলেছি। কাজে লাগো সবাই। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি দল গড়তে তৎপর হল। এর মধ্যে পেড্রো খুঁজে খুঁজে একটা বেশ উঁচু চেস্টনাট গাছ পেল। গ্রামের ভেতরেই। ও গাছে চড়তে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই গাছটার মগডালে উঠে গেল। গাছটার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে দু’টো মোটা ডালের গোড়ায় বসার জায়গা বানাল। তারপর বসে পড়ল। ম্লান জ্যোৎস্নার আলোয় খাঁড়ির যতদূরে দৃষ্টি যায় ততদূরে তাকিয়ে রইল। চারদিক নিস্তব্ধ। দু’একটা রাতজাগা পাখির পাখা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল। হাওয়ায় গাছের পাতায় সরসর শব্দ হতে লাগল। রাত বাড়তে লাগল।
হ্যারি বন্ধুদের দুটি ভাগ করে বিভিন্ন বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। বাকি দু’দল তখন গ্রামের আশেপাশে তীরভূমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাহারা দিতে শুরু করল। সবারই চোখ মূল সমুদ্রের দিকে। ওখান দিয়েই কোনো জাহাজ খাঁড়ির দিকে আসছে কিনা। অবশ্য গাছের ওপর থেকে পেড্রো নজর রাখছে। তবু আবছা জ্যোত্সার আলোয় ওরা তীক্ষ্ণ নজর রেখে চলল।
ফ্রান্সিস, হ্যারি আর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে লায়েন্ড-এর বাইরের অন্ধকার ঘরে ঢুকল। ছোট ঘর। অন্ধকারে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। লায়েন্ড অন্ধকারের মধ্যে থেকে বলল, দাঁড়ান। আলো জ্বেলে দিচ্ছি।
ফ্রান্সিস আপত্তি করল, আপনার ঠাকুর্দার ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে।
না, না, ঠাকুর্দা সব সময় শুয়েই থাকে। কখন ঘুমোয় কখন জাগে আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি। অন্ধকারে আপনাদের নড়াচড়া করতে অসুবিধে হবে। লায়েন্ড বলল।
খুব বেশি আলো হবে না তো? হ্যারি জিগ্যেস করল।
না না। সামুদ্রিক এক ধরনের মাছের তেল। মৃদু আলো হয়। ওতেই রাতের কাজ চালাই আমরা। লায়েন্ড বলল। তারপর চকমকি পাথর ঠুকে আলো জ্বালল। সত্যিই মৃদু আলো। এখন ফ্রান্সিসরা সবকিছুই মোটামুটি স্পষ্ট দেখতে পেল। এক কোনায় বৃদ্ধটি বিছানায় শুয়ে আছে। বাকি জায়গা থেকে লায়েন্ড সংসারের জিনিসপত্র সরিয়ে নিল। বেশ কিছুটা জায়গা কঁকা হল। পাথুরে মাটির কিছুটা এবড়ো-খেবড়ো মেঝেয় ফ্রান্সিস বসে পড়ল। হ্যারিরাও বসল। ফ্রান্সিস হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে পড়ল। হ্যারি পা মুড়ে দেয়ালে পিঠ ঠেসে বসল। সবার শোয়ার মতো জায়গা নেই। তবু কয়েকজন। গুটিসুটি মেরে শুল। বাইরে নিশুতি রাত। দূরের সমুদ্রের হাওয়া ধারে-কাছের গাছপালার পাতা ও ডালের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। মৃদু শব্দ হচ্ছে। আর কোনো শব্দ নেই চারিদিকে।
রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিসরা কোনো কথা বলছে না। মাঝে মধ্যে বৃদ্ধের কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সারারাত পালা করে পাহারা দেওয়া চলল। খাঁড়ির জলে কোনো জাহাজকে আসতে দেখা গেল না।
রাত শেষ হল। ফ্রান্সিস হ্যারি সারারাতই জেগে ছিল। দূরের গাছপালায় পাখির ডাকাডাকি শুরু হতে ফ্রান্সিসের তন্দ্রার ভাবটা কেটে গেল। কাছের গাছে কয়েকটা পাখির স্পষ্ট ডাক শোনা গেল।
ভোর হল। বন্ধুরা আস্তে আস্তে নিজেদের জায়গা থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনে এসে জড়ো হতে লাগল। ফ্রান্সিসরা উঠে বসল। কয়েকজন বন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চলে এল। বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে মৃদুস্বরে কথা বলতে লাগল।
লায়েন্ড এসে ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি উঠে দাঁড়াল। আড়মোড়া ভেঙে হ্যারি বলল, আপনি রাতে ঘুমোননি?
কী করে ঘুমোই! বেশ বুঝতে পারছিলাম কোনো আশঙ্কা নিয়ে আপনারা একরকম জেগে আছেন। আমারও একটু চিন্তা হচ্ছিল। লায়েন্ড হেসে বলল।
শুনুন, আজকের রাতটাও আমাদের এই গ্রামেই থাকতে হবে। দুশ্চিন্তায় রাত জাগা এসবে আমরা অভ্যস্ত। আপনি মিছিমিছি রাত জাগবেন না। নিশ্চিন্তে ঘুমুবেন। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। লায়েন্ড হেসে মাথা কাত করল।
একটা কথা। আমার স্ত্রী সকালের খাবার খেয়ে এখানে আসবেন। আপনার আর অন্য কোনো কোনো বাড়ির অন্দরমহলে গল্পগুজব করবেন। দুপুরে খেয়ে এসেও থাকবেন। বিকেলে জাহাজে ফিরে যাবেন। আপনাদের কোনো অসুবিধে হবে না তো? ফ্রান্সিস বলল।
না, না। এ তো আমাদের সৌভাগ্য। খুব খুশি হয়ে লায়েন্ড বলল।
আমরা এখন জাহাজে ফিরে যাচ্ছি, হ্যারি বলল, আপনাকে ধন্যবাদ।
বন্ধুদের নিয়ে ফ্রান্সিসরা এক এক করে জাহাজে উঠে এল। ডেক-এ উঠে একজন বন্ধু সখেদে বলল, রাত জাগাই সার। কোনো জাহাজও এল না। লড়াইও হল না। পেছনেই ছিল হ্যারি। মৃদুস্বরে বলল, বন্ধু হে, লড়াইয়ের দিন এখনও শেষ হয়নি।
ডেক-এ উঠে ফ্রান্সিস দেখল রেলিং ধরে মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস কাছে এসে বলল, সেকি–তুমি রাতে ঘুমোওনি।
হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব ভোরে পাখির বিচিত্র ডাকাডাকি শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সমুদ্রে তো ডাঙার পাখির ডাক শোনা যায় না। এত ভালো লাগছিল উঠে পড়লাম। মারিয়া বলল।
সামুদ্রিক পাখির ডাক তো শোনো। ফ্রান্সিস বলল।
সে তো বন্দরের কাছে এলে। তাও কী তীক্ষ্ণ ডাক। ডাঙার পাখির ডাক কত সুন্দর। কত বিচিত্ররকম।
