মারিয়া, আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আমরা কিন্তু এখনও নিরাপদ নই। যে কোনো সময় আমরা আক্রান্ত হতে পারি। তাই রাতে আমাদের এই স্লাভিয়া গ্রামেই থাকতে হবে। গরিব চাষি এরা। পাথুরে জমিতে চাষের মাটি বেশি পাওয়া যায় না। অন্য সময় নিশ্চয়ই এই খাঁড়িতে ওরা মাছ ধরে। ওদের বাড়ি-ঘরে থাকার মতো বাড়তি জায়গাও বেশি নেই। কাজেই তুমি জাহাজেই খাওয়া সেরে সারাদিন ওদের বাড়িতে থাক। রাতে তোমাকে জাহাজে এসে থাকতে হবে। ভেন থাকবে আর অসুস্থ ক্রেভান থাকবে। ওকেও তো দেখাশোনার জন্যে লোক চাই। বলল, এই ব্যবস্থা তোমার পছন্দ কি না। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে। তাই হবে।
দু’জনে যখন কথা বলছে তখনই শাঙ্কো এল।
শাঙ্কো, সমস্ত ঘটনাটা বলো তো এদের। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু ফ্রান্সিস, সব ঘটনা তো আমি দেখিনি। শাঙ্কো বলল।
সেসব আমি বলব এখন। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো উৎসাহের সঙ্গে হাত-পা নেড়ে সে যতটুকু ঘটনা জানে সব বলতে শুরু করল। চুপ করে মারিয়া আর ক্রেভান শুনল। বাকিটুকু ফ্রান্সিস খুব সংক্ষেপে বলল। ক্রেভান বলে উঠল, সত্যি ফ্রান্সিস, ভাইকিং জাতির গৌরবগাথায় তোমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে পাশ ফিরে শুল।
সন্ধে হল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে শাঙ্কো নোঙর তুলল। ফ্রেজার জাহাজটা চালিয়ে স্লাভিয়া গ্রামের ঘাটে এনে ভেড়াল। নোঙর ফেলা হল। হ্যারিকে ডেকে ফ্রান্সিস বলল, জাহাজে শুধু মারিয়া, ভেন আর ক্রেভান থাকবে। বাকি সবাইকে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে তীরে নামতে হবে। সবাইকে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে বললো।
হ্যারি ডেক-এ উঠে এল। সবাইকে ডেকে ফ্রান্সিসের নির্দেশ জানাল।
রাঁধুনি বন্ধুরা তাড়াতাড়ি রান্না সারল। সবাই খেয়ে নিল। তরোয়াল নিয়ে ফ্রান্সিস ও হ্যারি সবার আগে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। ততক্ষণে পাটাতন পাতা হয়ে গেছে। দু’জনে পাটাতন দিয়ে হেঁটে তীরে নামল। একটু খাড়াইতীর দিয়ে উঠে গ্রামের বাড়িগুলোর কাছে এল। যে বয়স্ক লোকটির বাড়িতে ওরা রাজা ম্যাগনামের পুরনো এক পাটি জুতো পেয়েছিল সেই বাড়িটার সামনে এল দু’জনে। গাছের কাটা ডালের টুকরো দিয়ে তৈরি দরজাটা বন্ধ। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে বোধহয় বয়স্ক লোকটিই বলে উঠল, কে?
দরজাটা খুলুন। কথা আছে। হ্যারি বলল।
ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে দরজাটা খুলে গেল। বাইরের ম্লান জ্যোৎস্নায় ফ্রান্সিসদের চিনতে পেরে হাসল লোকটি বলল, আপনারা জাহাজ নিয়ে ঐ পাহাড়ের কাছে গেলেন, ফিরে এলেন, কী ব্যাপার?
সব পরে বলব। আপনার নামটা যদি বলেন। ফ্রান্সিস বলল।
আমার নাম লায়েন্ড। অর্থ-পরিচ্ছন্ন। লায়েন্ড হেসে বলল।
দেখুন লায়েন্ড কোনো কারণে কয়েকটা রাত আমরা আপনাদের এই গ্রামের সকলের বাড়িতে থাকব।
কারণটা পরে বলব। তবে ঘরে বেশিক্ষণ একসঙ্গে সবাই থাকব না। রাতে দফায় দফায় কয়েকজন করে থাকব। বেশির ভাগই বাইরে থাকবে। জানি আপনাদের ঘর বেশি নেই। থাকার জায়গারও খুব অভাব। তবে কথা দিচ্ছি–কোনো ভাবেই আপনাদের অসুবিধে ঘটাব না। আপনারা নিশ্চিন্তে ঘুমোবেন। ভেতরের ঘরে কেউ থাকবে না। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু আপনারা কষ্ট করে এই বাড়িগুলোয় থাকবেন কেন? আপনাদের জাহাজ তো ঘাটেই নোঙর করা আছে! লায়েন্ত বলল।
কারণ আছে বললাম তো–সেসব পরে বলব। এখন আপনি আমার এই বন্ধু হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে আপনার প্রতিবেশীদের আমাদের অনুরোধ জানান। ফ্রান্সিস বলল।
আপনারা ভালো মানুষ সন্দেহ নেই। তার ওপর ক্রেন, যাঁকে আম খুব শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি, তিনি আপনাদের সঙ্গে এসেছেন। কেউ আপত্তি করবে না। লায়েন্ড বলল।
সে তো ভালো কথা। তাহলে হ্যারিকে নিয়ে আপনি বলে আসুন। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে লায়েন্ড চলে গেল। ততক্ষণে অন্য বন্ধুরা এসে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। সবার কোমরেই তরোয়াল ঝুলছে। সিনাত্রা শাঙ্কোর তীর ধনুকও নিয়ে এসেছে।
বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, এই গ্রামের মানুষরা সৎ আর অতিথিবৎসল। কিন্তু এরা গরিব। বাড়িঘর খুবই ছোট। তোমাদের পালা করে এদের ঘরে রাতে থাকতে হবে। সাবধান, তোমরা বেশি কথার্বাতা বলবেনা। এদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে না। ঘুমিয়ে পড়লেও সবাই সতর্ক থাকবে। এখানকার কোনো একটা উঁচু গাছের মাথায় নজরদার পেড্রো সারারাত পাহারায় থাকবে। ওর হাঁক শোনা মাত্র সবাই এই বাড়ির সামনে এসে জড়ো হবে। কারণ এক মহা ধুরন্ধর লোক–ইয়ুসুফ জাহাজভর্তি সৈন্য নিয়ে এই খাঁড়ি দিয়ে এসে আমাদের আক্রমণ করতে পারে। এই আক্রমণ রাতের অন্ধকারেই হতে পারে বলে আমার মনে হয়। কাজেই সবাইকে সারারাত সর্তক থাকতে হবে। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল, হ্যারি ফিরে এলে বাড়িগুলোয় আশ্রয় নিতে যাবে। হ্যারি এসে তোমাদের চারটে দলে ভাগ করবে। দু’দল শুতে যাবে। দু’দল পাহারা দেবে মাঝরাত পর্যন্ত। তারপর অন্য দুই দল যাবে পাহারা দিতে।
বন্ধুরা বুঝল লড়াই হতে পারে। ওরা ভীত হল না। বরং খুশিই হল। জাহাজে নিরুপদ্রবে হেসে-খেলে সময় কাটাতে ওরা বাধ্য হয়। লড়াইয়ের উন্মাদনা ওরা পছন্দ করে। যেন বেঁচে থাকার একটা অর্থ খুঁজে পায়। লড়াই করা এবং লড়াইয়ে জেতার আনন্দই আলাদা এদের কাছে।
