–রাজকুমারী যেভাবে তোমাকে ডেকে নিয়ে গেল, তাতে সত্যিই তুমি ভাগ্যবান।
–এখন ভাগ্যে খাওয়াটা জুটলেই পালাতে পারি।
–আমারও এত জাঁকজমক, বা নাচ, ভীড় ভালো লাগছে না। একসময় রাজা উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে আহারে বসতে বললেন। সবাই একে একে খেতে বসলো। একজন পরিচারক এসে ফ্রান্সিসকে ডেকে নিয়ে গেল। ওকে রাজকুমারীর পাশেই বসতে হ’ল সামনে টেবিলের কত রকমের খাবার থরেথরে সাজানো। চাইলেই। পরিবেশনকারীরা খাবার তুলে দিচ্ছে। কেউ-কেউ নিজেরাই তুলে নিচ্ছে। রাজকুমারী খেতে-খেতে বলল–আপনার ‘সোনার ঘন্টা’ গল্পটা আমায় বলুন।
ফ্রান্সিসের মনে পড়লো, আমদাদ শহরের বাজারে কুয়োর ধারে খেজুরতলায় কতদিন এই গল্পটা বলেছে ও। সেইভাবেই ও গল্পটা বলতে শুরু করল। কুয়াশা, ঝড় আর জাহাজ ভেঙে যাওয়ার ঘটনাগুলো বলার সময় ও খেতে ভুলে যাচ্ছিলো। রাজকুমারী হেসে তখন বললো–খেতে-খেতে বলুন।
এক সময় খাওয়া শেষ হ’ল। সকলেই টেবিল ছেড়ে উঠে এল। ফ্রান্সিসের গল্পও শেষ হ’ল। রাজকুমারী বললো–কিন্তু আপনার হীরে আনার গল্পটা শোনা হ’ল না। ওটা কবে বলবেন?
ফ্রান্সিস কি বলবে ভেবে পেল না। আমতা-আমতা করে বললো–সেটা মানে–যেদিন আপনি বলবেন।
–ঠিক আছে আমি আবার খবর পাঠাবো। ফ্রান্সিস হ্যারিকে খুঁজতে লাগল। ভীড়ের একপাশে ওকে পেলো। বললো, চলো পালাই।
–রাজা-রাণীকে অভিবাদন জানিয়ে যেতে হয়, এটাই রীতি। দেখছো না, সকলেই রাজা-রাণীকে অভিবাদন জানিয়ে চলে যাচ্ছে।
–চলো, ওটা সেরে আসি। ওরা যখন রাজা-রাণীকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন, জানাচ্ছে, তখন পাশে বসা রাজকুমারী হেসে মৃদুস্বরে বলল–আমি কিন্তু খবর পাঠাবো।
ফ্রান্সিস মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানাল!
দু’জনে বাইরে আসছে। হলঘরের দরজার কাছেই বাধা। ফ্রান্সিসের বাবা দাঁড়িয়ে বললেন–আমার সঙ্গে যাবে।
–হ্যারি রয়েছে আমার সঙ্গে—
—হ্যারিও আমাদের সঙ্গে যাবে। ওকে ওর বাড়ির কাছে নামিয়ে দেবো।
আর উপায় নেই, বাবার সঙ্গে যেতেই হবে। তিনজনে গাড়িতে উঠলো। গাড়ি চললো। কেউ কোন কথা বলছে না। ফ্রান্সিস, হ্যারি দু’জনেই বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিসের বাবা এক সময় বললেন–তুমি রাজকুমারীকে কি বলছিলে অতো।
–সোনার ঘন্টার গল্পটা শোনাচ্ছিলাম।
–হুম। ওর বাবা আর কিছু বললেন না।
***
পরের দিন সকালে জাহাজ থেকে হীরে গাড়ি দুটো নামানো হ’ল। ঘোড়া জুড়ে গাড়ি দু’টোকে রাস্তায় আনা হ’ল। সামনে সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্যদল, পেছনেও আর একদল অশ্বরোহী সৈন্য। গাড়িটা দু’জন কোচম্যান চালাতে লাগল। মিছিল চললো রাজধানীর পথ দিয়ে। হাজার হাজার লোক জড়ো হলো রাস্তায়, বাড়ির ছাতে, বারান্দায়, অলিন্দে। অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখতে লাগল হীরে দু’টো। সূর্যের আলো সোজা পড়েছে হীরে দু’টোয়। নীল, বেগুনী, সবুজে কত বিচিত্র রঙের আলোর খেলা চললো হীরে দু’টোর গায়ে। অতবড় দু’টো হীরে, আর তাতে ঐ রকম রঙের খেলা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শহরবাসীরা চেয়ে রইলো। সব প্রধান-প্রধান রাস্তা ঘুরে মিছিলটা রাজপ্রাসাদে এসে শেষ হলো। হীরে দু’টো রাখা হ’ল রাজার নিজস্ব যাদুঘরের বিরাট ঘরটায়। তার পাশেই রাখা । আছে সেই বিখ্যাত সোনার ঘন্টা।
.
শুরু হ’ল ফ্রান্সিসের গৃহবন্দী জীবন। ওর বাবা যা বলেছিলেন, তাই করলেন। আট দশজন সৈন্য বাড়ির চারিদিকে ছড়িয়ে পাহারা দিতে লাগলো। ফ্রান্সিস হতাশ হ’ল। এবার আর পালানো যাবেনা। ও ভাবতে লাগলো পালাবার একটা উপায় বার করতেই হবে। প্রথমে যেতে হবে মরিটাস দ্বীপে। বসির আয়নাওলাকে খুঁজে বের করতেই হবে। একটা বিশেষ শক্তিশালী আয়না ওকে দিয়ে তৈরি করাতে হবে। তারপর চাঁদের দ্বীপে। লা ব্রুশের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তারপর মুক্তোর সমুদ্র থেকেমুক্তো সংগ্রহ। কিন্তু তার আগে বাড়ির এই বন্দীজীবন থেকে তো মুক্তি চাই। সেটা কি করে হবে।
বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে একটা উপায় বার করা যেতো। কিন্তু বাবার স্পষ্ট হুকুম কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হবে না। অতঃপর ফ্রান্সিস মাকে বলল–ঠিক আছে–আর কেউ না আসুক, অন্ততঃ হ্যারিকে এখানে আসতে দাও।
মা বাবাকে বলল। দু’একবার আপত্তি করে বাবা রাজি হলেন। বললেন–হ্যারি একা আসতে পারবে।
তাই হলো। হ্যারি দু’বেলাই আসে। ফ্রান্সিস এতেই খুশি। দু’জনেই নানা পালাবার এ বন্দী-ফিকির ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনটাই কার্যকরী হবে বলে মনে হয় না।
কিছুদিন পরে একদিন সন্ধ্যাবেলা রাজবাড়ির একটি গাড়ি এসে ফ্রান্সিসদের বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। গাড়িটা কালো কাঠের তৈরি। নানা সোনালি কারুকাজ সারা গাড়িটার গায়ে। ঘোড়াদু’টোরও সাজের কতো ঘটা। সবুজ-সাদা পোষাক-পরা কোচম্যান ফ্রান্সিসের সঙ্গে দেখা করে একটা চিঠি দিল। মোটা কাগজে বাঁকা-বাঁকা হরফে লেখা। ওপরে কোন সম্বোধন নেই। শুধু লেখা–আপনি গল্প শোনাবেন বলেছিলেন। আজকে অবশ্যই আসবেন–ইতি–মারিয়া।
রাজকুমারী গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কাজেই সোজা কথা নয়। ফ্রান্সিসের না গিয়ে উপায় রইল না। মা ওকে সাজিয়ে গুজিয়ে দিলো। রাজকুমারীর পাঠানো গাড়ি চড়ে ও রাজপ্রাসাদে গেল। বিরাটহলঘর পেরিয়ে টানা বারান্দা। তারপর কত ঘর। মেঝেটা শ্বেতপাথরে বাঁধানো। দেয়ালে, জানালায়, দরজায় সোনালি-রূপালি কাজ করা। একজন পরিচারক ফ্রান্সিসকে অন্দরমহলে নিয়ে এসেছিল, এক পরিচারিকার জিম্মায়। পরিচারিকাটি ওকে রাজকুমারীর বসার ঘরে নিয়ে গেল। ছোটবেলায় ফ্রান্সিস অনেকবার বাবার সঙ্গে এসেছে। বড় হয়ে এই প্রথম এল। তখন যেমন অবাক চোখে তাকিয়ে সব দেখতো, আজও তেমনি অবাক চোখে দেখতে লাগলো চারিদিকের সাজসজ্জা, আলো, রঙ।
