ভাইকিংরা থমকে দাঁড়াল। দেখতে লাগল ডেকে ছড়িয়ে থাকা সোনা রুপোর ধনসম্পদ। তারপরই ধ্বনি তুলল, ও হো হো। হ্যারি ছুটে গেল সিঁড়ির দিকে। নীচে নেমে একটা ছেঁড়া পালের বড় টুকরো নিয়ে এল। সেটা ডেকে পেতে ছড়িয়ে-থাকা সোনার চাকতি, রুপো, মণিমুক্তো কাপড়ের ওপর রাখতে লাগল। দেখাদেখি বন্ধুরাও কয়েকজন এগিয়ে এল ওকে সাহায্য করতে। সব রাখা হলে হ্যারি আরশাঙ্কো একটা গাঁঠরি মতো বাঁধল।
হ্যারি বলল, বিনোলা, এটা ফ্রান্সিসের কেবিনে রেখে দাও। বিনোলা গাঁঠরিটা কাঁধে নিয়ে চলে গেল।
ওদিকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো জাহাজে উঠে এল। ফ্রান্সিস ভেজা পোশাকেই ডেকের ওপর শুয়ে পড়ল। হ্যারি এসে ওর পাশে বসল।
মারিয়া এসে বলল, ভেজা পোশাক ছাড়বে এসো।
ও আমার অভ্যেস আছে। খুব খাটাখাটুনি গেছে। একটু জিরিয়ে নিই। ফ্রান্সিস তখনও হাঁপাচ্ছিল।
হ্যারি বলল, সাবাস ফ্রান্সিস! তোমার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতে হয়। ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
রাজা ম্যাগনামের ধনসম্পদ কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল।
হ্যারল্ডের সিন্দুকে ভরে রাখব।
সব দেশে নিয়ে যাবে তো? পাশে বসা মারিয়া বলল।
না। নরওয়ে যাব আমরা। নরওয়ের বর্তমান রাজাকে সব দিয়ে দেব। রাজা ম্যাগনামের শেষ সিদ্ধান্তটা জানাব। অনুরোধ করব সেই অনুযায়ী ধনসম্পদ কাজে লাগাতে। হ্যারি, কী বলো?
তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক। হ্যারি বলল।
মারিয়া বলল, এবার চলো৷ ফ্রান্সিস উঠে বসল। আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে হেঁটে চলল।
আবু হামিদের রোজনামচা
বিকেল হয়ে এসেছে। সূর্য পশ্চিম দিগন্তের কাছাকাছি নেমে এসেছে। মারিয়া সূর্যাস্ত দেখবে বলে ডেক-এ উঠে এসেছে। ক্লান্ত ফ্রান্সিস তার কেবিনে আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। হ্যারি ওর কাছে এল। বলল, তাহলে আজ রাতটা এখানেই থাকি। কালকে না হয় জাহাজ ছাড়া যাবে।
না। এখানে আরও দু’একদিন থাকব। ফ্রান্সিস বলল।
কেন বলো তো? হ্যারি জানতে চাইল।
ভুলে যেও না ইয়ুসুফ সাংঘাতিক ধুরন্ধর। রাজা নেভেলের সঙ্গে তার খুব ভাব। হাজার হোক–ইয়ুসুফ যথেষ্ট ধনী। ও ঠিক রাজা নেভেলকে বলে তার সৈন্য নিয়ে জাহাজে চড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের খোঁজে নিশ্চয়ই বেরিয়ে পড়েছে। এই খাঁড়ি থেকে বেরোলেই আমরা ধরা পড়ে যাব। কাজেই এখন এই খাঁড়িতে জাহাজ রেখে দু’একদিন অপেক্ষা করতে হবে। বাইরের সমুদ্রে আমাদের জাহাজের হদিস না পেলে ওরা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু ইয়ুসুফ তো আমাদের খোঁজে জাহাজ নিয়ে এই খাঁড়িতেও ঢুকতে পারে। হ্যারি বলল।
সেই জন্যেই দিনের বেলা আমরা জাহাজে থাকব। কিন্তু রাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এই স্লাভিয়া গ্রামে আশ্রয় নেব। সারারাত সজাগ থাকব। জাহাজের ডেক-এ লড়াই করার চেয়ে গ্রামে থেকে লড়াই করা সহজ হবে। কারণ ওখানে আমরা বাড়িঘর গাছগাছালির আড়াল পাব। লড়াই করার অনেক সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি একটু ভেবে নিয়ে বলল, বরাবরই দেখেছি তুমি আগে থেকে অনেক কিছু ভেবে নাও।
সেটাই তো বুদ্ধিমানের লক্ষণ। অবশ্য তুমিও কম বুদ্ধিমান নও। কিন্তু ইদানিং দেশে ফিরে যাওয়ার আনন্দে তুমি বড় দ্রুত জাহাজ চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
হ্যারিও হাসল। বললে, তুমি ঠিকই বলেছ।
হ্যারি, সভ্য তারাই যারা আগে থেকে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তৈরি থাকে। অসভ্য জাতিরা কিন্তু সেটা পারে না। বর্তমানের কথাই ভাবে শুধু। ফ্রান্সিস বলল।
বৃদ্ধ ক্রেন চুপ করে এতক্ষণ দু’জনের কথাবার্তা শুনছিল। এবার বলল, ফ্রান্সিস, সত্যি তুমি বুদ্ধিমান আবার সাহসীও। অবশ্য বলা উচিত দুঃসাহসী।
হ্যারি হেসে বলল, আপনি আর ক’দিন ফ্রান্সিসকে দেখছেন। ওর কত দুঃসাহসিক বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী আমরা।
ফ্রান্সিস মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করে বলল, ক্রেভান–ঐ গাঁঠরিটা তো দেখেছেন। ওটাই রাজা ম্যাগনামের গুপ্ত সম্পদ।
কিন্তু এসব কীভাবে উদ্ধার করলে তা তো বললে না। ক্রেভান বলল।
হ্যারিকে পাঠাচ্ছি শাঙ্কোকে ডেকে দিতে। শাঙ্কো এসব ঘটনা খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ বলতে পারে। বন্ধুদের মুখে শুনেছি। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া তখনই ঢুকল। বলল, এত কিছু ঘটল ফ্রান্সিস, তুমি তো কিছুই বললে না।
অপেক্ষা করো। শাঙ্কো আসবে। সব বলবে। এখন আমার বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে চলি। হ্যারি বেরিয়ে গেল। মারিয়া বিছানায় বসতে বসতে বলল, আমি জাহাজে থাকব না।
তাহলে কোথায় থাকবে? ফ্রান্সিস একটু অবাক চোখে মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল।
দেখো, শুধু তোমাদের সঙ্গে থেকে থেকে আমি যে মেয়ে সেটাই মাঝে মাঝে ভুলে যাই।
ফ্রান্সিস জোরে হেসে উঠল। বলল, বেশ বলেছ।
আমি এই শ্লাভিয়া গ্রামের কারো বাড়ির অন্দরে মেয়েদের মধ্যে থাকব। একটু হাঁপ ছাড়তে পারব। মারিয়া বলল।
খুব ভালো কথা। তবে এখানকার মেয়েরা আমাদের ভাষায় পরিষ্কার কথা বলতে পারে কিনা জানি না। ফ্রান্সিস বলল।
যেটুকু বলতে পারবে তাই শুনে সব বুঝে নিতে পারব। মারিয়া বলল।
তা পারবে। কিন্তু গরিব চাষি বৌ-মেদের কথা কি তোমার–মানে রাজবাড়ির অন্তঃপুরেই তো তোমার দিন কাটত, ওদের কথাবার্তা কি তোমার ভালো লাগবে? ফ্রান্সিস বলল।
কেন লাগবে না? ঘর-সংসার ছেলে-মেয়ের কথা সব মেয়েদেরই ভালো লাগে, সে রাজকুমারীই হোক আর গরিব ঘরের মেয়েই হোক। মারিয়া বলল।
