ফ্রান্সিস মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়ল।
মারিয়া বলে উঠল, হাঙর-টাঙর নেই তো?
চোখে পড়েনি। ফ্রান্সিস হাঁপানো স্বরে বলল। একটুক্ষণ দম নিয়ে ফ্রান্সিস আবার ডুব দিল। দ্রুত জল কেটে নীচে নেমে এল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবছা আলোর মধ্যে দিয়ে দেখতে দেখতে দশ-পনেরো পা যেতেই দেখল একটা বিরাট পাথরের চাইয়ের গায়ে জাহাজের ভাঙা কাঠামো। চারদিকে ছড়ানো ভাঙা মাস্তুল, কাঠ, ছেঁড়া পাল, দড়িদড়া। কিন্তু দম ফুরিয়ে এসেছে। আবার জল ঠেলে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে লাগল। জলের ওপর হুস করে মাথা তুলল। হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। বেশ কিছুটা দূরে নৌকোটা ভাসছে।
শাঙ্কো দ্রুত নৌকো চালিয়ে এল। গলা চড়িয়ে বলল, চোখে পড়ল কিছু? ফ্রান্সিস হেসে হাত তুলল। শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে নৌকোয় উঠে এল। মারিয়া সাগ্রহে বলে উঠল, জাহাজটা দেখেছ?
হ্যাঁ। তবে ভেঙে চৌচির। আজকে আর নয়। কাল সকালে আসতে হবে। হাতে সারাটা দিন পাওয়া যাবে। ভালো আলো পাওয়া যাবে।
পরের দিন সকালেই নৌকোয় চড়ে এল ওরা। ফ্রান্সিস জলে ডুব দিল, ভাঙা জাহাজের ছড়ানো কাঠ, বড় বড় পেরেক, এটা-ওটা পড়ে আছে। ফ্রান্সিস সেই আবছা আলোয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক তাকাতে তাকাতে দেখল সাদাটে মাটির আস্তরণের মধ্যে একটা বসে যাওয়া লম্বাটে সিন্দুক। দম ফুরিয়ে আসছে। দু’হাতে দ্রুত জল সরিয়ে ফ্রান্সিস ভুস করে জলের ওপর মাথা তুলল। হাঁপাতে হাঁপাতে গলা চড়িয়ে বলল, রাজা ম্যাগনামের ধনসম্পদ—শুধু তুলে আনার অপেক্ষা। হ্যারির কাছেশাঙ্কো মারিয়া ফ্রান্সিসের উদ্দেশ্যের কথা শুনেছিল।
মারিয়া বলল, তাহলে তোমার অনুমানই সত্য হল।
হ্যাঁ। ও নৌকোয় উঠে বলল, চলো, জাহাজটা এখানে আনতে হবে। নৌকো দিয়ে হবে না।
বেলা হয়েছে। খেয়েটেয়ে এসো।
হুঁ। শাঙ্কো জাহাজ লক্ষ করে নৌকো বাইতে লাগল।
ওরা জাহাজে ফিরে এল। ভাইকিং বন্ধুরা এগিয়ে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। শাঙ্কো বলল, রাজা ম্যাগনামের ডুবেথাকা ধনসম্পদের হদিস মিলেছে।
ফ্রান্সিস সব বলে বলল, চলো, খাওয়া সেরে যাব।
না। আমরা সবাই এখনই যাব। বিনোলা বলে উঠলো। দু’চারজন বন্ধুও তখন বলে উঠলো–চলল, এখনই যাই। এসে খাওয়া-দাওয়া হবে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, খাটাখাটুনির ব্যাপার আছে। উপোসী থেকে সে সব করা কঠিন। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও সবাই।
এবার ফ্লেজার জাহাজ চালিয়ে সেই জায়গায় নিলে এল। ফ্রান্সিস বলল, দড়িসুন্ধু। নোঙরটা নিয়ে এসো আর শাঙ্কো–তুমি দেখো তো যেমন-তেমন একটা নোঙর পাও কিনা। শাঙ্কো চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুঁজে পেতে মরচে ধরা প্রায় বাতিল একটা নোঙর নিয়ে এল। ফ্রান্সিস একটা শক্ত লম্বা দড়ি নিল। ও আরও দুটো লম্বা দড়ি আনাল।
ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই সব–মন দিয়ে শোনো। আমি আর শাঙ্কো কয়েক দফা জলের নীচে ডুবে গিয়ে সিন্দুকটা দড়ি দিয়ে বাঁধব। তারপর দুটো নোঙর সিন্দুকটার দুপাশে বাঁধা দড়িতে আটকে দেব। তোমরা ডেক থেকে ওটা টেনে তুলবে। খুব আস্তে আস্তে তুলবে। রেলিঙের ওপর দিয়ে আনবে সাবধানে। দেখো, কাঠের রেলিং না ভেঙে যায়। এবার তৈরি থাকো সবাই। আমরা জলে নামছি।
ফ্রান্সিস লম্বা দড়ির একটা কোমরে জড়িয়ে নিল। তরোয়াল খুলে হ্যারির হাতে দিল। তারপর জলে ঝাঁপ দিল। দ্রুত জল কেটে নীচে নেমে এল। কোমর থেকে দড়ি খুলে দ্রুত সিন্দুকটা পাশাপাশি বাঁধতে তৈরি হল। ওরা শক্ত গিট বাঁধার নানা কৌশলে অভিজ্ঞ। কিন্তু কতদিন আগে থেকে সিন্দুকটা জলের তলায় পড়ে আছে। সাদাটে মাটিতে বেশ এঁটে বসে গেছে। সিন্দুকটা দুহাতে ধরে তুলতে দেরি হল।
দম ফুরিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস দড়ি রেখে জলের ওপরে তাড়াতাড়ি উঠে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শাঙ্কো ডুব দাও। সিন্দুকটার একপাশে বাঁধা। শাঙ্কো তৈরি হয়েই ছিল।
জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শাঙ্কোও জল কেটে দ্রুত নীচে নেমে এল। আবছা আলোয় দেখল ফ্রান্সিস একটা পাশ তুলে রেখেছে। ও দ্রুত দড়িটা সেই পাশে বেঁধে গিঁট দিয়ে জলের ওপরে উঠে এল। হাঁ করে হাঁপাতে লাগল।
এবারে ফ্রান্সিস ডুব দিল। সিন্দুকের অন্য পাশটা দু’হাতে জোরে কয়েকটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে কাদার ওপর তুলে জলের ওপরে উঠে এল। এবার শাঙ্কো ডুব দিল। দড়ি বাঁধল। শক্ত গিট দিল। জলের ওপরে উঠে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে রেলিঙের কাছে জড়ো হওয়া বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, মরচে পড়া নোঙরটা দড়ির মাথায় বাঁধো। দুটোই আমাকে দাও। বন্ধুরা অল্প সময়ের মধ্যেই বেঁধে দড়ি ধরে নামিয়ে দিল। ফ্রান্সিস দড়ি বাঁধা নোঙর দুটো কাঁধে রেখে এক হাতে জল ঠেলে ঠেলে নীচে নামল। দ্রুত নামতে পারল না। সিন্দুকটার দু’পাশে আড়াআড়ি বাঁধা দড়ির মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি নোঙরের মাথা দুটো ঢুকিয়ে দিয়ে জলের ওপর হুস করে ভেসে উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, সাবধানে আস্তে আস্তে টেনে তোল। চুনামাটির কাদায় সিন্দুকের কাঠ ক্ষয়ে গেছে। আঁকুনি লাগলেই ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে।
এবার বন্ধুরা দড়ি দুটো ধরে আস্তে আস্তে টানতে লাগল। জলের মধ্যে বস্তুর ওজন কমে যায়। কাজেই জলের ওপরে ওঠা পর্যন্ত সিন্দুকের সঠিক ওজনটা বোঝা যাচ্ছিল না। জলের ওপরে সিন্দুকটা উঠে এল। এবার টেনে তুলতে গিয়ে ওরা বুঝল ওজনটা ভালোই। সিন্দুক্টা ওঠাতে লাগল। খুব আস্তে আস্তে। রেলিঙের গায়ে পর্যন্ত সিন্দুকটা উঠে এল। এবার রেলিংটা পার করতে গিয়েই হল বিপত্তি। দড়াম করে রেলিঙের বেশ কিছুটা অংশ ভেঙে গেল। সিন্দুকটা প্রায় ছিটকেডেকের ধারে পড়েইতলার কাঠটা ভেঙে ছিটকে গেল। সোনার কত চাকতি, মণিমুক্তো, দামি গয়না-টয়না ডেকের ওপর ছড়িয়ে গেল। কিছু কিছু সমুদ্রের জলেও পড়ে গেল। পচা কাঠের টুকরোও এদিক-ওদিক ছিটকে গেল।
