হ্যারি এসে পাশে দাঁড়াল। বলল, জাহাজ কীভাবে ডুবেছিল?
প্রচণ্ড ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজ ভেঙে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে ডুবে যাওয়া জাহাজটা তো এখানেই কোথাও জলের নীচে
হ্যাঁ কিন্তু কোথায়? এতটা বিস্তৃত খাঁড়ির জল। এখানে জোর জোয়ার-ভাটা খেলে। ভাঙা ডোবা জাহাজটা যে কোনোদিকে সরে যেতে পারে।
আবার বালিকাদার স্তরে গেঁথেও যেতে পারে।
হ্যাঁ, তা পারে।
তাহলে কোথায় খুঁজবে?
সেটাই তো আসল রহস্য। কোথায়? একটা জায়গা তো নির্দিষ্ট করতে হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে করব? একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, জাহাজটা ডুবে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত। রাজা ঐ কাগজে লিখছিলেন। আচ্ছা হ্যারি, ঐ ছেঁড়া পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে এসো তো। ঐটা কোনোরকমে বাঁচিয়েছিলেন তিনি।
আমার কোমরেই গোঁজা আছে। সময় পেলেই পড়ি।
বের করো। শেষের দিককার লেখাগুলো পড়ো তো।
হ্যারি কোমরে-গোঁজা পাণ্ডুলিপিটা বের করল। সামনে মেলে ধরে পড়তে লাগল মুষলধারে বৃষ্টি…দু’পাশেটাল খেতে খেতে.. আর লিখতে পারছি না… প্রচণ্ড ধাক্কা… কে ঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে বলল, সামনে সাদাটে–ব্যস, এখানেই শেষ। শেষ শব্দ ঐ সাদাটে।
ঐ সাদাটে কী?
বৃষ্টির সময় চোখের সামনে সাদাটে আস্তরণ মতো মনে হয়। এটা তো সাধারণ অভিজ্ঞতা। হ্যারি বলল।
না হ্যারি। ভুলে যেও না তখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল বারবার। সেই আলোয় বৃষ্টির আস্তরণ ছাড়িয়েও কিছুদূরের জিনিস দেখা যায়। তাই প্রশ্ন, সাদাটে কী? আচ্ছা, সাদাটে শব্দটা আর কোথাও আছে?
দেখছি। হ্যারি কাগজটা উঁচু করল। দেখছে, তখনই ফ্রান্সিস কাগজটার দিকে তাকাল। আলো পড়েছে কাগজটায়। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট দেখল, কাগজটায় আবছা তিনকোনা বড় দাগমতো। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলে উঠল, দাঁড়াও। কাগজটা ধরে থাকো। ফ্রান্সিস দ্রুত এগিয়ে গেল। এবার আবছা তিনকোনা দাগটা দেখতে পেল।
সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস দ্রুত ঘুরে তাকাল ঐ পাহাড়টার দিকে। অস্পষ্ট ছাপটা ঠিক ঐ পাহাড়ের মতো। পাহাড়ের মাথাটা ভাঙা। বেশ সমান। ঠিক ছাপটার মতো। ফ্রান্সিস বলে উঠল, হ্যারি, ঐ পাহাড়টার দিকে তাকাও। পাহাড়টা দেখো। হ্যারি কিছু বুঝল না। পাহাড়টা দেখতে লাগল।
এবার ঐ মাথাভাঙা পাহাড়ের সঙ্গে কাগজের এই অস্পষ্ট ছাপটা মেলাও। দেখো একরকম কিনা। কাগজটা উল্টেনাও, ভালো করে মেলে ধরে দেখো।
হ্যারি কাগজটা ঘুরিয়ে উঁচু করে মনোযোগ দিয়ে দেখল। সত্যিই খুব অস্পষ্ট তিনকোনা দাগ। বেশ মোটা দাগ।
দেখো, পাহাড়টা দেখতে এরকম কিনা। মাথাটা ভাঙা, সমতল। হ্যারি মিলিয়ে দেখে, বলে উঠল, তাই তো।
এসব কাগজের মতো পাতলা চামড়ায় তো কোনো দাগ থাকে না। কীসের দাগ এটা?
রক্তের দাগ। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
বলো কী! হ্যারি চমকে উঠল।
আবার কল্পনার রাশ আলগা করছি। রাজা ম্যাগনাম মৃত্যুর পূর্বে রক্তঝরা হাতের আঙুল দিয়ে শেষ দেখা এই পাহাড়টা এঁকেছিলেন। অবশ্য এটাকে আঁকা বলা চলে না। চিহ্ন বলা যায়।
কিন্তু এই পাহাড়টা তো সবুজ। সাদাটে কথাটা লিখেছিলেন কেন?
ভালো করে পাহাড়টার দিকে তাকাও। দেখো মাথায় গাছ-গাছালি নেই, পাথরের রঙ ধূসর। তাছাড়া গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে বেশ দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গা। ধূসর, প্রায় সাদাটে। জাহাজ ডুবেছিল অনেকদিন আগে, তখন এই পাহাড়ে গাছপালা বলে কিছু ছিল না। আসলে পাহাড়টা চুনা পাথরের সাদা পাহাড় ছিল। পরে দীর্ঘ দিন ধরে অল্প অল্প মাটি জমে জমে আজকের গাছ-গাছালির জন্ম। লক্ষ করো ঘাস নেই। সবুজে ভাবটাই নেই।
তাহলে কি
হ্যাঁ, ঐ পাহাড়ের নীচে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে রাজার জাহাজ ভেঙে ডুবে গিয়েছিল। ঐ পাহাড়ের নীচেই জলের মধ্যে দেখতে হবে। খুঁজতে হবে।
এখনই যাবে?
হ্যাঁ, এখুনি। শাঙ্কোকে ডাকো। আর আমার তরোয়ালটা নিয়ে এসো। হ্যারিশাঙ্কোদের ডাকল। ফ্রান্সিতেরোয়াল আনতে কেবিনে নেমে এল। বিছানার পাশ থেকেও তরোয়াল নিল। মারিয়া বলে উঠল, কী ব্যাপার হ্যারি?
ফ্রান্সিসরা ঐ পাহাড়ের নীচে যাবে।
আমিও যাব। মারিয়া উঠেদাঁড়াল।
আসুন। দেখুন, ফ্রান্সিস নিয়ে যেতে রাজি হয় কিনা। ক্রেভান তাকিয়ে রইল। কিছুই বুঝল না।
দড়ির মই বেয়ে ফ্রান্সিসরা নৌকোয় নেমে এল। শাঙ্কো নৌকো বাইতে লাগল। খাঁড়ির জলে খুব ঢেউ নেই। উজ্জ্বল রোদ চারদিকে। একসময় নৌকোতিনকোনা পাহাড়টার নীচে এসে থামল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে নৌকো একপাশে থামানো হল। ফ্রান্সিস তরোয়ালটা কোমরে গুঁজে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ডুব দিল।
ওপরের সূর্যালোকে নীলচে জলের নীচে বেশ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। সেই মুক্তোর সমুদ্রে মুক্তো তোলার জন্যে ফ্রান্সিস ওর দেশের ডুবুরিদের কাছে জলে বেশিক্ষণ ডুবে থাকার কায়দা শিখেছিল। সেই শিক্ষাটা এবারে কাজে লাগল।
ফ্রান্সিস অল্পক্ষণের মধ্যেই দু’হাতে জল ঠেলে ঠেলে একেবারে নীচে নেমে এল। পাথরের ছোট ছোট চাই ছড়ানো। সামুদ্রিক শ্যাওলাগাছ, ঝোঁপটোপ নেই। পাথরের এদিক-ওদিক কখনও আড়ালে নানা রঙিন মাছের আঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস পাথরে পা ফেলে ফেলে লাফিয়ে লাফিয়ে পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকার দিকে চলল। এখানে নিস্তেজ আলো। বেশ আবছা দেখাচ্ছে সবকিছু। দম ফুরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস ডোবা পাথরে পা দিয়ে ধাক্কা মেরে দ্রুত ওপরে উঠে এল। জল থেকে ভুস্ করে মুখ তুলে হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। দেখল বাঁ দিকে কিছুদূরে নৌকো ভাসছে। ফ্রান্সিসকে জল থেকে মাথা তুলতে দেখে শাঙ্কো দ্রুত নৌকো চালিয়ে ওর কাছে এল। গলা চড়িয়ে বলল, কিছু হদিস পেলে?
