সেই সুপুরুষ কোথা থেকে এসেছিলেন?
তা তো শুনিনি।
সেই সুপুরুষ কিছু বলেননি?
তিনি কথাই বলতে পারেননি।
কেন?
তার দু’হাত ভাঙা ছিল। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত। সারা পোশাক, রাজারাজড়ার পোশাক যেমন হয়, রক্তে ভেজা। সারা শরীর, মুখ-হাত কাদায় মাখামাখি। পায়ে ছিল নাকি ঐ একপাটি জুতো।
হুঁ। পাও ভেঙেছিল। বোঝাই যাচ্ছে বুকে হিঁচড়ে খাঁড়ি থেকে উঠে এসেছিলেন। আচ্ছা, পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া কিছু পাতা কি আপনাদের সেই সময়কার পূর্বপুরুষ কেউ পেয়েছিলেন? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
এটা তো সেদিনের কথা। ক্রেভানকে দেখিয়ে লোকটি বলল, উনি এখানে অনেকদিন ছিলেন। ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন। মনে হত উনি কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমাদের কাঠকুটো রাখার ঘরে এক দড়ির ঝোলায় নাকি উনি কিছু পাতা পেয়েছিলেন। কী সব নাকি লেখা ছিল তাতে। তা আমরা তো মুখসুখু মানুষ–পড়তেই জানি না। উনিও অবশ্য এই ব্যাপারে কোনো কথা আমাদের কিছু বলেননি।
শুনুন, সেই সুপুরুষ ছিলেন নরওয়ের রাজা ম্যাগনাম। পাতাগুলোয় কিছু লিখে রেখেছিলেন তিনি। ফ্রান্সিস বলল।
তাই নাকি? লোকটি ভীষণ অবাক হল। সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, তাহলে এসব গল্পকথা নয়?
না। উনি কতদিন বেঁচে ছিলেন?
শুনেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এখানে ভালো বৈদ্য কোথায়?
তারপর?
এসবই শুনেছি। খাঁড়ির তীরে কোথায় নাকি তাকে কবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব জেনে কী হবে?
সেটা আপনাকে কয়েকদিন পরে বলব। আরো কিছু জানার থাকলে আসব। আশা করি আপনি আমাদের সাহায্য করবেন। ফ্রান্সিস বলল।
ক্রেভান আমাদের মত পরিচিত। কত ভালো মানুষ। তাঁকে নিয়ে আপনারা এসেছেন। নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য পাবেন। লোকটি হেসে বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বলল, চলো ফেরা যাক। ঢাল বেয়ে নেমে পাটার ওপর দিয়ে সবাই জাহাজে ফিরে এল। ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, রাতে এসো। কথা আছে।
শাঙ্কো ক্রেভানকে ধরে ধরে নিয়ে এল। বিছানায় শুইয়ে দিল।
রাতের খাওয়া শেষ। ফ্রান্সিস নিজেদের কেবিনে এসে আধশোয়া হল। মারিয়া
ক্রেনের সারা গা ভেজা কাপড়ে মুছিয়ে দিয়ে খাইয়ে দিল। তারপর ওষুধ খাইয়ে ফ্রান্সিসের পাশে এসে বসল। হ্যারি তখনই এল। ফ্রান্সিস ডাকল, ক্রেন?
উ?
রাতে ছেঁড়া পাণ্ডুলিপিটা ঠেকে ঠেকে পড়লাম। বুঝলাম, শেষ পাতা ওটা। পাণ্ডুলিপির আরম্ভটা আর একবার বলতে পারবেন?
কতবার পড়েছি। সব মুখস্থ হয়ে গেছে। বলছি, শুনুন। ক্রেভান শুয়ে শুয়ে দু’চোখ বুজে বলতে লাগল।
আমি, ম্যাগনাম, নরওয়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আজহঠাই লিখতে শুরু করলাম এই সব। কেউ পড়বে সেজন্য নয়। এ যেন আমার মনের সঙ্গে কথা বলা। বলা যায় মনের সঙ্গে বোঝাঁপড়া একটা ঘটনা জানি না শুনেছিলাম কিনা হঠাইমনটা ভীষণ নাড়া দিল। এইমাত্র নেমে এলাম ডেক থেকে। ওখানে–রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ধূসর কুয়াশা ঢাকা সমুদ্রের দিগন্ত। ওপরে ধোঁয়াটে মেঘের মধ্যে অস্পষ্ট পূর্ণ চাঁদ। চারদিকে। আবছা আলো। বাতাসের শন্ শন্ শব্দ নেই। নিস্তেজ বাতাস। অসীম নৈঃশব্দ্যের মধ্যে জাহাজের গায়ে ভেঙে পড়া ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। হঠাৎ খুব অস্পষ্ট একটা কথা শুনলাম, ধিক্। ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। কে বলল কথাটা? চারদিকেতাকালাম। গভীর রাত। ডেকে কেউ নেই। ঠাণ্ডার রাত। কান পাতলাম। খুব মৃদুস্বরে, ধিক্। কথাটা কে বলল? মুহূর্তে বুকে একটা অসহ্য কষ্ট– এ কি আমাকেই লক্ষ্য করে বলা? কষ্টটা সহ্য করতে করতে এলোমেলো পা ফেলে কেবিনে এসে শুয়ে পড়লাম। জানি না–ঘুম–
ক্রেন থামল। ফ্রান্সিসরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ক্রেভান বলল, তারপরের পাতাগুলিতে বর্ণনা করেছেন লুঠ, অগ্নিসংযোগ আর নির্বিচারে নরহত্যার কাহিনি। কী অনির্বচনীয় কী অর্থবহ কী নিপুণ ভাষায় মৃত্যুকে বর্ণনা করেছেন। কী গভীর মমতায় স্মরণ করেছেন সেইসব নারী-পুরুষ-শিশুর মৃত মুখগুলি। ক্রেন থামল। তার পরের পাতাটায় কিছু লেখা নেই। শুধু কাটাকুটি আঁকিবুকি। তারপর লেখা–দেশে ফিরে সব লুটের ধন প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দেব। শূন্য করে দেব রাজকোষের সঞ্চিত সবকিছু। রাজপ্রাসাদের রাজকীয় বিলাসবাসন, আত্মসুখী উদ্দাম উজ্জ্বল জীবন-সব পেছনে ফেলে চলে যাব দীর্ঘ রাত্রি আর দীর্ঘ দিবসের দেশ আইসল্যান্ডে। শুনেছি কয়েকটা ধর্মীয় মঠ আছে ওখানে। মঠবাসীর কঠিন তপস্যাই হবে আমার শেষ জীবন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। ধিক্ কথাটা যেন আমাকে আর শুনতে না হয়।
ক্রেন থামল। ফ্রান্সিসরা কেউ একটি কথাও বলতে পারল না। ক্রেভান একটু চুপ করে থেকে বলল, তারপরের শেষাংশ তো তোমাদের হাতেই আছে। ফ্রান্সিস মুখ নিচু করে শুনছিল। এবার মৃদুস্বরে ডাকল, হ্যারি।
হ্যাঁ। রাজা ম্যাগনামের মনে গভীর বৈরাগ্য এসেছিল–আশ্চর্য পরিবর্তন। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস ডেকে উঠে এল। চারদিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল। রাজা ম্যাগনামের জাহাজ ঝড়ের ধাক্কায় এতদূর এসেছিল। তারপর ডুবে গিয়েছিল। এখানেই। কিন্তু কোথায়? মোটামুটি বিস্তৃত খড়ির জলরাশি। এদিকে স্লাভিয়া গ্রামের সেই লোকটির বাড়ি। মারাত্মক আহত রাজা ঐ বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওপাশে দেখা যাচ্ছে একটাই মাত্র পাহাড়। তেমন উঁচু নয়। পাহাড়ের গায়ে সবুজ ছাড়া ছাড়া গাছ-গাছালি। একটা ব্যাপার একটু অদ্ভুত লাগল। পাহাড়ের মাথাটা ভাঙা। ওপরে গাছ গাছালি নেই। ঘাসও নেই। কেমন ধূসর রঙ। গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের যেটুকু ছাড়া ছাড়া গা দেখা যাচ্ছে তারও রঙ ধূসর। ফ্রান্সিস চুপ করে গভীর ভাবে সব কিছু ভাবতে লাগল।
