সমুদ্রতীরের ছোট ছোট টিলা বনজঙ্গল দেখা গেল। মানুষের বসতি নেই। সমুদ্রতীরের বেশ কাছে ফিরে যেতে যেতে দূর থেকে খাঁড়ির মুখ দেখা গেল। বেশ বড় খাঁড়ি। ধারেকাছে কোন জনবসতি নেই।
তখন একটু বেলা হয়েছে। হ্যারি ডেক ফ্লেজারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বিনোলাকে ডেকে বলল–ফ্রান্সিসকে খবর দাও। একটু পরেই ফ্রান্সিস ডেকএ উঠে এল। ফ্লেজার ও হ্যারির পাশে এসে দাঁড়াল।
–হ্যারি–এইটাই সেই খাঁড়ি কিনা একমাত্র ক্রেভানই বলতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
-ঠিক আছে। আমরা ক্রেভানকে নিয়ে আসছি। হ্যারি চলে গেল। হ্যারি আর শাঙ্কো ক্রেভানকে ধরে ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে এল ফ্রান্সিসদের কাছে।
-দেখুন তো–এটাই সেই খাঁড়ি কিনা? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। ক্রেভান খাঁড়ির মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল–হ্যাঁ-এটাই সেই খাঁড়ি। তবে আগে মুখের দু’পাশে কিছু গাছপালা ছিল। এখন দেখছি নেই।
–ফ্রান্সিস কী করবে? হ্যারি বলল।
–এক্ষুনি জাহাজ খাঁড়িতে ঢোকাতে হবে। কিছুদূর গেলেই আড়ালে পড়ে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–দুপুরে নেয়েটেয়ে–হ্যারি বলতে গেল।
–না না ইয়ুসুফ আমাদের সহজে ছেড়ে দেবে না। নিশ্চয়ই রাজা নেভেলের সৈন্য নিয়ে জাহাজে চড়ে ইয়ুসুফ আমাদের খুঁজতে বেরোবে। তার আগেই আমরা যতটা পারি খাঁড়ির ভেতর ঢুকে পড়বো৷ ফ্রান্সিস বলল। তারপর ক্রেভানের দিকে তাকিয়ে বলল
–সেই স্লাভিয়াগ্রাম কতদূর?
–বেশ ভেতরে। জাহাজ চলুক। দেখিয়ে দেব। ক্রেভান বলল।
ফ্লেজার জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে জাহাজটা খাঁড়ির মধ্যে ঢোকাল। বেশ চওড়া খড়ি। দু’দিকের তীর ভূমিই পাথুরে।
ফ্রান্সিস এবার বলল–ফ্লেজার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চালাও।
বাতাস, বেশ জোরে বইছিল। পালগুলো দুলে উঠেছে। শাঙ্কোরা কয়েকজন চলে গেল দাঁড়ঘরে। দ্রুত দাঁড় টানতে লাগল। খাঁড়ির দুদিকের পাড়ই বেশ উঁচু।
বেশ বেলায় বাঁদিকে একটা ছোট পাহাড় দেখা গেল। খাঁড়ি থেকে খাঁড়া উঠে গেছে। চূড়াটা যেন ডাঙা সমান। ক্রেভান বলে উঠল–এসে গেছি। ঐ পাহাড়ের উল্টেদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল–ঐ যে বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। ওটা স্লাভিয়াগ্রাম। আমি যখন এসেছিলাম তখন এত ঘরবাড়ি দেখিনি। ঘাটমত আছে একটা। ঐ ঘাটেই জাহাজ ভেড়াতে হবে। গ্রামের কাছাকাছি এসে দেখা গেল বেশ জলকাদা ছাড়িয়ে পাথুরে তীর উঠে গেছে। এখানে জোয়ার ভাটা খেলে বলেই কাদাটে। ফ্লেজার আস্তে আস্তে ঐ ঘাটমত জায়গাটায় জাহাজ ভেড়াল। তখন দুপর হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, কত অজানা, অচেনা ঘাটে বেশ চিন্তা-ভাবনা করে বিপদের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে নেমেছি। তারপর, সে তো কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এখানে যাহোক নিশ্চিন্তে নামা যাবে।
এখন কি নামবে? হ্যারি জানতে চাইল।
অনেক বেলা হয়েছে। খাওয়া সেরে ক্রেভানকে সঙ্গে নিয়ে নামব। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরের খাওয়া শেষ হল। শাঙ্কো আর সিনাত্রা ঘাট মতো জায়গাটায় পাটাতন ফেলল। হ্যারি আর ফ্রান্সিস নামল। তখনই মারিয়া এল।
–আমিও যাব।
–বেশ। এসো।
শাঙ্কো আর সিনাত্রা ধরে ধরে ক্রেভানকে নামাল। মারিয়াকেও নামতে সাহায্য করল। ঢাল বেয়ে সবাই উঠতে লাগল। উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস বলল, অন্য কোনো বাড়িতে যাওয়ার দরকার নেই। যে বাড়িতে আপনি রাজা ম্যাগনামের একপাটি জুতো দেখেছিলেন, পাণ্ডুলিপি পেয়েছিলেন সেই বাড়িতে নিয়ে চলুন।
আস্তে আস্তে হোঁচট খেতে খেতে ক্রেভান ফ্রান্সিসদের একটা বাড়ির সামনে নিয়ে এল। বাড়িটা অন্য বাড়িগুলোর মতোই। তবে খাঁড়ির জলের কাছে। ওদিকে গ্রামের লোকজন কৌতূহলী হয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল। সকলেই জানতে চায় ওরা এসেছে কেন? তবে ক্রেভানকে অনেকে আগে এখানে থাকতে দেখেছে। তাদের কেউ কেউ এসে ক্রেভানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করল।
বাড়িটায় ঢুকল সবাই। প্রথম ঘরটাতে দেখল একটা গাছের কাটা ডাল থেকে তৈরি বিছানায় পশুলোমের কম্বল জড়িয়ে এক বেশ বৃদ্ধ, সারা মুখে দাড়িগোঁফ, বসে আছে। তখনই ভেতরে থেকে এক বয়স্ক লোক এগিয়ে এল। ঢোলা হাতা জামা পরা। ক্রেভানকে দেখে হেসে এগিয়ে এল। দুজনে কিছু কথাবার্তা কুশল বিনিময় হল।
ক্রেভান, জুতোটা দেখাতে বলুন। ক্রেভান লোকটিকে বলল সে কথা।
এই ঘরেই আছে। লোকটি উবু হয়ে পাথরের মেঝেতে বসল। মাথা নিচু করে হাত বাড়িয়ে একপাটি জুতো নিয়ে এল। ফ্রান্সিস হাতে নিল জুতোটা। দেখল, বেশ দামি চামড়ায় তৈরি জুতো। জুতোর এখানে-ওখানে ছোট ছোট গর্ত দেখে বুঝল দামি কিছু সোনা-হিরেও হতে পারে জুতোটায় গাঁথা ছিল। কাজ করাও ছিল। জুতোটার কোথাও ছেঁড়া নেই। মজবুত চামড়ার জুতো। তবে খুব পুরোনো।
-জুতোটা আপনাদের বাড়িতে কী করে এল? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–সেসব তো গল্পকথা। বংশানুক্রমে আমরা শুনে আসছি।
সেই বৃদ্ধকে দেখিয়ে ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল, উনি কিছু বলতে পারবেন?
–অনেক বয়েস হয়েছে ঠাকুর্দার। শরীরের মনে কোনো সাড়াই নেই। তবে ঠাকুর্দার মুখে শুনেছি, অনেক দিন আগে এই খাঁড়িতে প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিল। তার পরদিন সকালে নাকি একজন খুব অভিজাত সুপুরুষ আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।
–সেই রাতে কি এই খাঁড়িতে জাহাজডুবি হয়েছিল?
–তেমন তো কিছু শুনিনি।
