তালা খোল। আস্তে তরোয়াল ফেলে দাও। ফ্রান্সিস একইভাবে বলল–খোল দরজা। প্রহরীটি অবশ্য পাথুরে মেঝেতে তরোয়াল রাখল। ককাময়ের ফেট্টি থেকে চাবি বের করে কয়েদঘরের দরজা খুলে দিল। শাঙ্কো একলাফে এগিয়ে এগিয়ে দরজার সবটা খুলে দিয়ে চাপাস্বরে বলল–পালাও। প্রথমেই ছুটে বেরিয়ে এল চাৰ্মান্ত। ফ্রান্সিস ওকে দেখে খুব একটা অবাক হল না। তারপরেই বাকিরা দরজার দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–সবাই জাহাজঘাটের দিকে ছোটো। যত জোরে পারো। দুই প্রহরীকে ফ্রান্সিসরা তরোয়াল ঠেকিয়ে আটকে রাখল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–শাঙ্কো-বিনোলা–পালাও। ওরা তিনজনই এবার তরোয়াল সরিয়ে নিয়ে পেছন ফিরে দরজার দিকে ছুটল। প্রহরী দু’জন এবার পালাচ্ছে–পালাচ্ছে বলে চেঁচিয়ে উঠল। দুজনেই ফ্রান্সিসদের ধরবার জন্য দরজার দিকে ছুটে এল। শাঙ্কো বিনোলা একলাফে দরজা পার হয়ে চিলতে গলিতে নামল। নেমেই আবছা অন্ধকারে চিলতে গলি ধরে রাস্তার দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস দেখল চাৰ্মান্ত দাঁড়িয়ে আছে। চাৰ্মান্ত চাপাগলায় বলে উঠল-সাবধান–ওপাশের ঘরে একজন যোদ্ধা থাকে। তখনই একজন প্রহরী চাঁচাতে চাঁচাতে দরজার কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস এই সুযোগটাই চাইছিল। ও সঙ্গে সঙ্গে তরোয়াল ফেলে দু’হাতে প্রচণ্ড জোরে দরজার পাল্লাটা দিয়ে প্রহরীর মুখের ওপর বন্ধ করে দিল। তখনই চিলতে গলি দিয়ে একজন যোদ্ধাকে ছুটে আসতে দেখা গেল। কিন্তু কারো হাতে অস্ত্র নেই। অস্ত্র নেবার সময় পায়নি। চাৰ্মান্ত ততক্ষণ চিলতে গলি দিয়ে রাস্তার দিকে ছুটেছে। ফ্রান্সিসও তরোয়ালটা ফেলে রেখে চাৰ্মান্তর পেছনে পেছনে প্রাণপণে ছুটে রাস্তায় চলে এল। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দেখল শাঙ্কোরা বেশ দূরে ছুটে চলেছে।
ফ্রান্সিসের পাশে পাশে ছুটতে ছুটতে চার্মান্ত হাঁপানো গলায় বলল–আর ভয় নেই। ঐ যোদ্ধারা সদর রাস্তায় আসবেনা। ইয়ুসুফ যে একদল যোদ্ধা পোষে–এ খবরটা ও গোপন রাখে সবার কাছে।
হুঁ ধুরন্দর–সন্দেহ নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিসও বলল। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে ছুটে চলা শাঙ্কোকেলক্ষ্য করে বলল–ছুটো না। আস্তে। আস্তে। ও নিজেই গতি কমাল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–তুমি ইয়ুসুফ–বলছিলে কাকে? ঐ তিমব্রানটকে। ও আসলে আরব দেশের লোক। ক্রীতদাস ব্যবসা
–গোপন রাখতে–ঐ নাম নিয়েছে। চাৰ্মান্ত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
–এখানকার রাজা কে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–রাজা নেভেল। ইয়ুসুফের সঙ্গে খুব ভাব রাজা নেভেলের।
–ইয়ুসুফ তো–ধনী ব্যবসায়ী। চাৰ্মান্ত বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস বলল–এভাবে ছোটা চলবে না। রাজার পাহারাদের নজরে পড়ে যেতে পারি। ও আবার চেঁচিয়ে বলল–শাঙ্কো–থামো। শাঙ্কোরা দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল–সবাই স্বাভাবিকভাবে হাঁটো। কারো নজরে যেন না পড়ি। সবাই এবার হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটতে লাগল।
শাঙ্কো–তুমি একটু জোরে ছুটে যাও। জাহাজের নোঙর তুলে ফেল। নয়ত পোল তোল। দাঁড় বাইতে বলো। এই বন্দরে আর একমুহূর্তও থাকবো না। এখানকার রাজা নেভেল আমাদের বিপদে ফেলতে পারে। যাও। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ঘাটের দিকে ছুটল।
জাহাজঘাটে পৌঁছে ফ্রান্সিস দেখল ওদের জাহাজে বন্ধুরা ততক্ষণে পাল খাটিয়ে ফেলেছে। বোধহয় দাঁড়ঘরেও দাঁড় বাইতে চলে গেছে একদল। ও বুঝল-বন্ধুরা কেউ ঘুমোয় নি। যথেষ্ট সজাগ ছিল। রেলিঙ ধরে মারিয়াও দাঁড়িয়েছিল।
ইংরেজ বন্দীরা কয়েকজন এসে ফ্রান্সিসদের দুহাত জড়িয়ে ধরল। একজন বলল কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো।
–ওসব পরে হবে। এখনও আমাদের বিপদ কাটেনি। তোমরা তাড়াতাড়ি তোমাদের জাহাজে উঠে পড়ো। জাহাজ ভাসিয়ে দাও। কিছুদূরের কোন বন্দরে জাহাজ নিয়ে যাও। শিগগির দেরি করো না। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–কিছু স্বর্ণমুদ্রা তোমরা পেয়েছে। আমরা তো ধনী নই। কিছু সোনার চাকতি পাঠাচ্ছি। তোমরা খাদ্য জল সংগ্রহ করে দেশে ফিরে যেও। তখনই চাৰ্মান্ত এগিয়ে এল। বলল–ফ্রান্সিস আমরা কী করবো?
–তোমরা ইয়ুসুফের হাত থেকে রেহাই পাবে না। ওদের জাহাজে উঠে পালাও। তারপর লুঠেরাদের দলে ঢুকবেনা–স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে সেটা তোমাদের বিবেচনা। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা আর লুঠপাট করবো না। আমাদের দেশে নিয়ে চলো চাৰ্মান্ত বলল।
–না। তোমরা অনেক নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। তোমাদের সেই নৃশংসতার শাস্তি পেতেই হবে। আমি তোমাদের দায়িত্ব নেব না। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস জাহাজে উঠতেই মারিয়া এগিয়ে এল। বলল–
–তোমাদের কোন বিপদ হয়নি তো।
না-না যাও–শিগগির কিছু সোনার চাকতি নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস তাগাদা দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই মারিয়া সোনার চাকতি নিয়ে ফিরে এল। একটা রুমালে বেঁধে। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে শাঙ্কোকে হালের কাছে দেখল। কয়েকজন বন্ধুকে রাতের অভিযানের কথা বলছে। ফ্রান্সিস ভাবলশাঙ্কো এসো। শাঙ্কো তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল। রুমালে বাঁধা সোনার চাকতিগুলো শাঙ্কোকে দিয়ে বলল–তাড়াতাড়ি যাও। ইংরেজদের সোনার চাকতিগুলো দিয়ে এসো। দেরি করবে না। এক্ষুনি জাহাজ ছাড়া হবে। শাঙ্কো ছুটে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ ছাড়া হ’ল। কিছুদূর জাহাজ চলে আসতেই পূব আকাশে কমলা রঙের বন্যা বইয়ে সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে এসে বলল–ক্রেভান যে খাঁড়িটা দেখিয়েছে সেই খাঁড়িতে যত তাড়াতাড়ি পারো জাহাজ ঢুকিয়ে দাও। মনে হয় খাড়িটা বড়। জলও গভীর। কারণ প্রচণ্ড ঝড়ের ধাক্কা, রাজা ম্যাগনামের জাহাজ খাঁড়িতে নির্বিঘ্নে ঢুকতে পেরেছিল। জাহাজ চলল খাড়ির দিকে।
