কী করবে?
–এই নরাধমের হাত থেকে ওদের বাঁচাতেই হবে। হ্যারি বলল–যে ভাবেই হোক।
ছক ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর কেউ আর কোন কথা বলল না।
আসতে আসতে সেই আরকের দোকানের সামনে এল। ভিড় কমে এসে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–ঐ দোকানে চলো। হ্যারি তো অবাক। বলল তুমি তো এসব খাওনা।
–আজও খাবো না। তবে খাওয়ার ভান করবো। ফ্রান্সিস বলল।
একটু ভেবে নিয়ে হ্যারি বলল–তাহলে তুমি সন্দেহ করছো যে তিব্রান্টের লোক আমাদের অনুসরণ করছে।
ঠিক তাই, তিমব্রান্টের লোককে দেখাতে হবে যে আমরা সাধারণ জাহাজীদের মত এসব খাই। বিদেশি ধনী ব্যবসায়ীদের জন্যে মালপত্র কিনতে এসে ফুর্তি টুর্তি করি। তিব্রান্টের সন্দেহ দূর হবে। ও নিশ্চিন্ত হবে। অত্যন্ত ধূর্ত ও ফ্রান্সিস বলল।
দোকানটায় ঢুকে দেখল প্রায় সবাই গা এলিয়ে বসে আছে। সবাই বিদেশি নাবিক। একজন আবার জড়ানো গলায় গান গাইছে। দু’ গ্লাস আরক চেয়ে ফ্রান্সিস ও হ্যারি টানা কাঠের আসনে বসল। একজন হাড় জিরজিরে লোক ওদের সামনে দু’গ্লাশ আরক রেখে গেল। দু’জনে চুপ করে বসে রইল। ফ্রান্সিস আড় চোখে রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখল। , একটু পরেই দোকানের ঝোলানো আলোয় দেখল একটা কালো মানুষ দোকানটার দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একনজর ভেতরে তাকিয়ে ফ্রান্সিসদের দেখেই দ্রুত সরে গেল।
কিছুপরে ফ্রান্সিস উঠেদাঁড়াল। বলল চলো রাস্তায় এবার মৃদুস্বরে বলল–তিব্রান্টের কাছে খবর চলে যাবে। ও নিশ্চিন্ত হবে। আর দেরি নয়। আজ রাতেই ওদের মুক্ত করতে হবে। জোরে হাঁটো।
দু’জনেই দ্রুত হেঁটে চলল জাহাজঘাটের দিকে।
দু’জনে জাহাজে উঠতেইশাঙ্কোরা কয়েকজন এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–সব পরে বলবো। শাঙ্কো বিনোলা যত তাড়াতাড়ি পারো খেয়ে নাও। তরোয়াল নিয়ে তৈরি হয়ে এসো। ফ্রান্সিস আর কেবিনঘরে ঢুকল না। খাবার জায়গায় চলে এল। রাঁধুনী বন্ধুরা বলল–সব তো রান্না হয়নি।
দরকার নেই। যা হয়েছে তাই খেতে দাও। হ্যারি আমার তরোয়ালটা নিয়ে এসো। জলদি।
কেবিনঘরে বিছানার একপাশে বসে মারিয়া ফ্রান্সিসের পোশাকের ছেঁড়া জায়গাগুলো সেলাই করতে করতে ক্রেভানের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল। হ্যারিকে ঢুকতে দেখে মারিয়া বলল–
–ফ্রান্সিস কোথায়?
–খাচ্ছে। হ্যারি বলল।
–এত তাড়াতাড়ি মারিয়া অবাক। হ্যারি বিছানার তলা থেকে তরোয়ালটা বের করে বলল–রাজকুমারী আমি এসে সব বলছি। হ্যারি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল। শাঙ্কো আর বিনোলা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে তরোয়াল কোমরে গুঁজে ডেকএ উঠে এল। ফ্রান্সিস আগেই অপেক্ষা করছিল। তিনজনে পাটাতন দিয়ে হেঁটে পাথুরেঘাটে নেমে এল।
রাস্তা দিয়ে তিনজনে চলল। লোকজনের ভিড় কমে গেছে। দু’পাশের বাড়িঘরে কোন বাড়ির জানালায় আলোর আভাস। বেশির ভাগ বাড়িই অন্ধকারে ডুবে আছে। চাঁদের আলোও অনুজ্জ্বল। ওরা নিঃশব্দে হেঁটে চলল।
ইয়ুসুফের বাড়ির সামনে এসে দেখল গুদাম ঘরের দরজা বন্ধ। বাইরে কোন রক্ষী নেই। ফ্রান্সিস একটু দাঁড়াল। বাঁদিকে খাবার সময়ে কিছু দূরে গলিপথের শেষে যে বন্ধ দরজা আর তার সামনে প্রহরী মোতায়েন দেখেছিল সেই দিকটা হিসবে করে নিয়ে মৃদুস্বরে বলল–চলো। বাড়িটার ডানদিকের চিতে গলিটা দিয়ে ঢুকে আবছা অন্ধকারে কিছুটা এগোতেই বাঁদিকে একটা দরজা দেখল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিসফিস্ করে বলল–এই দরজা দিয়েই ভেতরে ঢুকতে হবে। দরজার ওপারেই প্রহরী আছে। বড় ছোরা কোমরে গোঁজা। ওকে কবজা করতে হবে। একটু থেমে বলল–নিশ্চয়ই দরজায় কোন সাঙ্ঘাতিক শব্দ করতে হয়। তিমন্ত্রাটের সব ব্যবস্থা পাকা। ফ্রান্সিস দরজাটায় আঙুল দিয়ে দুটো টোকা দিল। দরজা খুলল না। আন্দাজে আর একটা টোকা দিল। দরজার, একপাট খুলে প্রহরীটি মুখ বাড়াল আর ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই শাঙ্কো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলশালী কালো প্রহরীটি সেই হঠাৎ ধাক্কায় মেঝেয় পড়ে গেল না, দ্রুত কোমরে হাত বাড়িয়ে ছোরা বের করতে গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে খোলা তরোয়ালে ডগাটা ওর গলায় চেপে ধরে চাপাস্বরে বলল–চেঁচিয়েছো কিমরেছো। পেছোও। প্রহরীটি বিপদ বুঝতে পারল। এক পা এক পা করে পিছিয়ে গেল। তিনজনেই দ্রুত ঢুকে পড়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বিনোলা তখনই তরোয়ালের ডগাটা প্রহরীর বুকে চেপে ধরল।
কাল যাদের আনা হয়েছিল তারা কোথায়? ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল।
–ভীতমুখে প্রহরীটি ভেতরদিকে ইঙ্গিত করল।
–চলো। ওদের নিশ্চয়ই বন্দী করে রাখা হয়েছে? ফ্রান্সিস বলল।
প্রহরীটি মাথা ওঠানামা করল।
–আমাদের নিয়ে চলো। জলদি। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল।
দরজার মাথায় একটা সুদৃশ্য কাঁচের আলোবদানে আলো ঝুলছিল। প্রহরীটি নিঃশব্দে সেই আলোয় গলিপথটা দিয়ে চলল। বুকে পিঠেতবোয়াল চেপে ধরে ফ্রান্সিস …নিঃশব্দে চলল। গলিপথ শেষ হতেই দেখা গেল পাথর বাঁধানো চত্বর। তারপরেই ডানদিকে লোহার গরাদ দেওয়া একটা ঘর। ঘরটার লোহার দরজার মাথায় আলো জ্বলছে। একজন প্রহরী খোলা তরোয়াল হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কালো। বেশ বলশালী। ফ্রান্সিস হাত তুলে পাথুরে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ফিস্ ফিস্ করে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে সেই অবছা অন্ধকারে খোলা তরোয়াল হাতে প্রহরীটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল। এই হঠাৎ আক্রমণে প্রহরীটি প্রায় ছিটকে লোহার গরাদের ওপর পড়ল। মাথাটা লোহার গরাদে জোর ধাক্কা খেল। গরাদে ঠন শব্দ হল। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলে উঠল শাঙ্কো শব্দ নয়। মাথায় প্রচণ্ড ঘা খেয়ে প্রহরীটি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস একলাফে প্রহরীটির বুকে তরোয়াল চেপে ধরে চাপাস্বরে বলল-দরজা খোল। নইলে মরবে। এরকমভাবে হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে দুই প্রহরীই তখন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। তখনই বাঁদিকের ঘর থেকে একটা শব্দ উঠল–শব্দ কীসের? ফ্রান্সিস তরোয়ালের ডগাটা প্রহরীটির বুকে জোরে চেপে ধরে দাঁত চাপাস্বরে বলল–বল–দরজা খুলছি। প্রহরীটি তখনও অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্রান্সিস জোরে তরোয়াল চাপল। বুকে কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। প্রহরীটির পোশাকের ঐ জায়গাটা রক্তে ভিজে গেল। ফ্রান্সিস আবার চাপাস্বরে বলল-বলো। প্রহরীটি তাড়াতাড়ি বলে উঠল–দরজা খোলার শব্দ।
