–কে হারল্ডং নামই শুনিনি কখনো। ফিগোনা বললেন।
–আপনি হ্যারল্ডের জাহাজ কেনেন নি? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–না না। একটু থেমে বললেন–সত্যি কথাটাই বলি। বেশ কিছুদিন আমার ব্যবসায় খুব মন্দা চলছে। জাহাজ কেনার সাধ্য নেই। তবে ডন তিমব্রান্টের এখন খুব সুদিন আছে। একটা কেন দুতিনটে জাহাজ কেনার ক্ষমতা ওঁর আছে। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল–আচ্ছা–ডন তিব্রান্ট কি বাঁহাতি। মানে–। ফিগোনা মৃদু হেসে বললেন–
–ওর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা নেই। উনি বলেন–জন্ম থেকেই নাকি নেই। লোকে অবশ্য অন্য কথা বলে। থাকগে–লোকে তো কত কিছুই ভাবে।
-আপনাকে বিরক্ত করলাম। কিছু মনে করবেন না। হ্যারি বলল।
–না না। দ্বাররক্ষী দরজা খুলে দিল।
–আচ্ছা ডন তিমব্রান্টের বাড়িটা কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
আঙুল তুলে ডানদিকের রাস্তাটা দেখিয়ে বললেন ভদ্রলোক ঐ রাস্তা ধরে সোজা চলে যান। দশ বারোটা বাড়ির পর বাঁদিকে দুটো চেস্টনাট গাছের মাঝখানে যে বাড়িটা দেখবেন সেটাই ডন তিব্রান্টের বাড়ি।
অনেক ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস বলল।
দু’জনে একটু এগিয়ে ডানদিকের রাস্তাটা ধরল। দু পাশের বাড়িঘরের জানালায় আলোর আভাস। প্রায় অন্ধকার পথ ধরেই দু’জনে চলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাঁদিকে দুটো গাছ দেখল। বাঁদিকে একটা লোহার নানা কাজ করা বড় কাঠের দরজা বন্ধ। কিন্তু সামনে কোন দ্বাররক্ষী নেই। মাঝখানে বেশ বড় একটা বাড়ি। নিচে বিরাট গুদাম। বিরাট দরজার একপাট বন্ধ। অন্যপাট আধখোলা। ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে সেখান দিয়ে গুদামে ঢুকল। পেছনে হ্যারি। দেখা গেল একটা কাঠের বড় চৌকোনো আসনে একজন লোক মাথা নিচু করে কী লিখছে। অন্য একটি লোক দাঁড়িয়ে থেকে কিছু বলছে। বোঝা গেল কর্মচারি। মাথার ওপর একটা বড় কাঁচে থেকে আলো জ্বলছে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনের কাছে কাছে এসে দাঁড়াল। যে দাঁড়িয়ে ছিল সে দু’জনকে দেখতে পেয়ে বলে উঠল–কী চাই? যে লিখছিল সেও মুখ তুলে তাকাল।
-বাইরে দরজায় কোন দ্বাররক্ষী নেই দেখে আপনাদের কাছে এলাম। হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে। কী চাই বলুন। বসে থাকা লোকটি জিজ্ঞেস করল।
–আমরা ব্যবসা সূত্রে এসেছি। জাহাজঘাটে আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা কোন দেশের ব্যবসায়ী লোকটা জানতে চাইল।
–পোর্তুগালের। প্রায় পঞ্চাশ ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রার মালপত্র কিনতে এসেছি।
–বেশ তো। কী কী চাই লিখে দিন। লোকটি বেশ খুশি হয়ে বলল।
–কিন্তু এই ব্যাপারে ডন তিমব্রান্টের সঙ্গে আগে কথা বলতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–অসুবিধে আছে। সন্ধ্যের পর ডন তিমব্রোন্ট কারোর সঙ্গে দেখা করেন না। লোকটি গম্ভীর হয়ে বলল।
-কিন্তু আমরা তো দেরি করতে পারবো না। তাছাড়া ব্যবসা সংক্রান্ত জরুরী কথা আছে। কাল দুপুরের মধ্যেই জাহাজে মালপত্র নিয়ে চলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–মুস্কিল হ’ল। ঠিক আছে। কথা বলে আসছি। অপেক্ষা করুন। লোকটি পেছনের একটা ছোট দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। কিছু পরে এসে বলল–আসুন। পেছনের দরজা দিয়ে ফ্রান্সিসরা ঢুকতেই দেখল এক বলশালী কালো দ্বাররক্ষী অল্প আলোয় পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। কোমর বন্ধনীতে খোলা বড় ছোরা গোঁজা। আর কোন অস্ত্র নেই। ওদের হাত বাড়িয়ে এগোতে ইঙ্গিত করে সামনের দিকে চলল। কিছুটা যাওয়ার পর পাথুরে দেয়ালে সুদৃশ্য কঁচে-ঢাকা আলো দেয়ালে ঝুলছে দেখল। আবার দুটো বাঁক। ফ্রান্সিস সর্বক্ষণ চারদিকেতীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে চলল। এইবার ডানদিকে একটা টানাপথ পড়ল। পথের শেষে আলোয় দেখল বলশালী চেহারার এক দ্বাররক্ষী পাথরের মতদাঁড়িয়ে আছে। তারমানে ওদিক দিয়ে ঢোকার দরজাআছে। এবার ডানদিকের ঘরের সামনে এসে দ্বাররক্ষী দাঁড়াল। একটা সেই লোহার কারুকাজকরা দরজা দেখিয়ে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস হ্যারি দরজা খুলে ঢুকল। চাৰ্মান্ত এই ঘরেই আগে ঢুকেছিল। দেখল সেই লোকটি বসে আছে। গায়ে পাতলা হলদে রঙের দামি কাপড়ের পোশাক। সেই মোটা চামড়ার কোমরবন্ধনী। তবে অন্যরকম। ফ্রান্সিসদের দেখেই ইয়ুসুফ একটু চমকাল সঙ্গে সঙ্গে স্থির দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু চুপ করে থেকে বলল-ব্যবসার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন।
কীসের ব্যবসা আপনাদের?
ফ্রান্সিস সে কথার জবাব না দিয়ে বলল–কাল বিকেলে আপনি জাহাজঘাটে গিয়েছিলেন। নিজেকে ব্যবসায়ী ফিগোনা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। আর–ফ্রান্সিসকে থামিয়ে দিয়ে ইয়ুসুফ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল–থামুন। ওসব বাজে কথা রেখে ব্যবসার কথা বলুন।
–তাহলে আপনি কালকে বিকেলে–আবার ফ্রান্সিসকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল স্টপ। তারপর বাঁহাতে তুড়ি দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাঁপাশের দরজা দিয়ে দুই দশাসই কালো প্রহরী ছুটে এল।
–এই দুটোকে বাইরে বের করে দে। ইয়ুসুফ বলল। দ্বাররক্ষী দু’জন দ্রুত এসে। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে ধরতে এল। ফ্রান্সিস হাত তুলে বলল–থাক। আমরা যাচ্ছি। দু’জনে ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল দরজার দিকে।
সেই গুদামের মধ্যে দিয়েই ফ্রান্সিসরা বাইরে এসে রাস্তায় নামল। চলল জাহাজ ঘাটের দিকে।
–কী সাংঘাতিক লোক। হ্যারি গলা নামিয়ে বলল।
–আর সন্দেহ নেই। ঐ লোকটা তিমব্রান্ট–শ্বেতকায় ক্রীতদাস কেনাবেচার ব্যবসা করে। তাই এই দোরস্তাদ বন্দরের সবচেয়ে বড় ধনী ব্যবসায়ী। ব্যবসা রমরমিয়ে চলছে। ফ্রান্সিস বলল।
