–হ্যারল্ড ইংল্যান্ড চলে গেল। বলে গিয়েছিল ফিরে এসেও জাহাজটা আমাকে দিয়ে অন্য জাহাজ কিনে নিয়ে নিজের দেশে চলে যাবে। ইয়ুসুফ বলল।
–কিন্তু একটা জাহাজ কেনার ক্ষমতা আয আছে সে তার জাহাজটা বিক্রি করবে কেন? ফ্রান্সিস প্রশ্ন তুলল।
ব্যবসা সেরে লাভের টাকা থেকে নতুন একটা ভালো জাহাজ কেনার ক্ষমতা হবে তখন। অকাট্য যুক্তি। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। লোকটার বেশ কূটবুদ্ধি আছে সন্দেহ নেই।
তখনই ইয়ুসুফ হাততালি দিয়ে বলল–তোমরা সবাই সার দিয়ে দাঁড়াও। কিছুঅগ্রিম দেব। বাঁহাতে তুড়ি দিয়ে চাৰ্মান্তকে ইশারায় ডাকল। আবার বাঁহাত পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে একটা সাটিন কাপড়ের নীল থলে বের করল। বাঁহাতে থলেটা ধরে চাৰ্মান্তকে দিয়ে বলল–সবাইকে দুটো করে স্বর্ণমুদ্রা দাও। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল ফিগোন সেই যে ডান হাতটা প্রায় কব্জি পর্যন্ত কোমরের রুপোর কাজ করা চামড়ার বেলটে ঢুকিয়ে রেখেছে একবারও সেই কোমরবন্ধনী থেকে তুলে আনল না। বোধহয় লোকটা বাঁহাতী। অনেকেরই বাঁহাতটা বেশি শক্তি ধরে। তারা বাঁহাতই বেশি ব্যবহার করে। এমনকি লেখেও। প্রত্যেককে যখন স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হচ্ছে তখন ইয়ুসুফ বলল–তাহলে চাৰ্মান্তর সঙ্গে তোমরা চলে এসো। তোমাদের জামা কাপড়ের যা অবস্থা যাক গে–যাবার সময় চার্মান্ত তোমাদের কাপড়ের দোকানে নিয়ে যাবে। কাল সকালেই তৈরি পোশাক পেয়ে যাবে। আজ রাতটা আমার বাড়িতেই থাকবে। তোমাদের জন্যে নৈশ ভোজের ব্যবস্থা রয়েছে। কাল সকালেই নতুন পোশাক পরে থলিপত্র এনে জাহাজে তুলবে। ঠিক আছে। ইংরেজরা ভাইকিংরা খুব খুশি হল স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে। ওরা দু’তিন জন মাথা ঝাঁকাল।
-তাহলে ওদের মাল বাহকের কাজে লাগালেন। হ্যারি বলল।
ইয়ুসুফ হ্যারির কথা গ্রাহ্যই করল না। একটু দ্রুত পাটাতনের দিকে হাঁটতে লাগল। আর একবারও পেছনদিকে না তাকিয়ে ঘাটে নেমে গেল।
জাহাজে ফিরে হ্যারি বলল–যাহোক ওরা এই বিদেশে কাজ পেয়ে গেল। এখানে ওদের খাওয়াপরা জুটে যাবে। ফ্রান্সিসকে একটু চিন্তিত করে বলল–হ্যারি–ব্যাপারটা বোধহয় এত সহজ সরল না। অবশ্য ফিগোন ব্যাপারটা খুবই সাধারণ–মানে জাহাজ কেনা লোককে অগ্রিম দিয়ে কাজে লাগানো এভাবেই দেখাবার চেষ্টা করেছে।
–কিন্তু লোকটা তো নিজের পরিচয় দিলই। সবাই তো ওর প্রস্তাবে রাজি হল। গণ্ডগোলটা কোথায়? হ্যারি বলল।
–আছে আছে। ওরা কাল সকালে মালপত্র নিয়ে জাহাজে উঠতে এলে তবেই এটা একটা মালিক মজুরের সম্পর্ক ব’লেই মেনে নেব। তার আগে নয়। দু’জনের মধ্যে আর কোন কথা হল না।
সেই রাতটা ফ্রান্সিস বেশ অস্বস্তির মধ্যে কাটাল।
পরদিন সকালে দেখল হ্যারল্ডের জাহাজ জনশূন্য। চাৰ্মান্তরা তখনও ফিরল না। দুপুর হল। সন্ধা হল। তখনও চাৰ্মান্তদের বা অন্যদের দেখা নেই। হ্যারি বিকেল থেকেই জাহাজের রেলিঙ ধরে ঘাটের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ওরা কোথায়?
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস তখন বিছানায় চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে আছে। হ্যারি বলল–ওরা তো এখনও ফিরল না।
জানতাম। মৃদুস্বরে কথাটা বলে ফ্রান্সিস চোখ খুলে উঠে বসল। বলল–চলো। ওদের খোঁজ করতে হবে।
–তাহলে তো ফিগোনের বাড়ি যেতে হবে। হ্যারি বলল।
তাই যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–ওরা হয়তো কাল সকালে মালপত্র নিয়ে আসতে পারে। হ্যারি বলল।
–হ্যারি–মনে হয় ওরা আর ফিরবেনা। ফ্রান্সিস কথাটা বলে দরজার দিকে এগোল।
–কী ব্যাপার? এভান জানতে চাইল।
এসে বলবো। হ্যারি কথাটা বলে ঘরের বাইরে চলে এল।
দু’জনে ডেক-এ উঠে এল। জাহাজঘাটের দুপাশে দু’টো মশাল জ্বলছে। অন্ধকার মত জাহাজঘাটে নামল। বড় রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে বাঁদিকে দেখল একটা দোকানে বেশ ভিড়। কিছু কিছু বিদেশি জাহাজের নাবিক গ্লাসে চুমুক দিয়ে কী খাচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল ওরা অবাকজাতীয় কিছু নেশার পানীয় খাচ্ছে। ওদের জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই। ওরা বিদেশি। একটা বুনো মধু বিক্রির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল–ভাই ফিগোনার বাড়িটা কোথায় জানো? দোকানদার আঙুল তুলে বেশ দূরে দেখিয়ে বলল–ঐ যে ডানদিকে লাল বাড়িটা ওটাই ফিগোনার বাড়ি। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ঐ লাল বাড়িটার সামনে এল। বড় পাথর দিয়ে গাঁথা বাড়ি। কাঠের বড় দরজাটায় ফুল, লতাপাতার কাজ করা। একজন দ্বাররক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সশস্ত্র নয়। আঁটোসাঁটো হলদে পোশাক পরা। হ্যারি জানালায় আলোর আভাস। দরজার মাথায় একটা কাঁচে ঢাকা আলো ঝুলছে। হ্যারি দ্বাররক্ষীর কাছে গেল। বলল–ফিগোন আছেন?
না। উনি এক বন্ধুর বাড়ি গেছেন। দ্বাররক্ষী বলল।
–ফিরতে দেরি হবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–একাই গেছেন। এখনই ফেরার কথা বলতে বলতেই দ্বাররক্ষী রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল –ঐ তো। উনি আসছেন। দেখা গেল একজন বেশ মোটামত মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন। দরজার আলোয় ভদ্রলোককে দেখে ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–
–হ্যারি-লোকটা ডাহা মিথ্যে কথা বলেছে। ভদ্রলোক কাছাকাছি এসে বলল আপনারা? —
–আমরা ভাইকিং। জাহাজে চড়ে এসেছি। আপনিই কি ফিগোনা?
হ্যাঁ। ভদ্রলোক একটু মাথা ওঠানামা করলেন।
–আপনিই কি আজ বিকেলে জাহাজঘাটে গিয়েছিলেন? হ্যারল্ডের জাহাজে? ফ্রান্সিস। বলল।
