–হ্যাঁ। হ্যারি বলল। সবার মাপটাপ নিন। আর হ্যারিমারিয়াকে দেখিয়ে বলল– এই ভদ্রমহিলারও পোশাকের জন্যে যে কোন দামের যে কাপড় এর পছন্দমত হবে সেই মতো দেবেন।
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। ওপাশেই আমার সেলাইয়ের দোকান। সব পোশাক আমি তৈরি করে দেব ঠিক যেমনটি আপনারা চাইবেন।
–তাহলে তো ভালোই। কিন্তু সব পোশাক তৈরি করিয়ে দিতে হবে কাল দুপুরের মধ্যে। আমরা কাল সন্ধ্যের আগেই জাহাজ ছাড়বো।
–নিশ্চয়ই পাবেন। তবে কিছু অগ্রিম দেবেন। রাত জাগতে হতে পারে। মারিয়া কোমরবন্ধনী থেকে পাঁচটা সোনার চাকতি বের করল। হাত বাড়িয়ে দিল।
আসুন কাপড় পছন্দ করুন। দোকানদার নিজেই গাঠরির মুখ খুলে কাপড় দেখাতে লাগল। ভাইকিংরাও আগ্রহের সঙ্গে পছন্দমত কাপড় দেখতে লাগল।
–সবাই একরকম কাপড় পছন্দ কর ফ্রান্সিস বলল। সবাই কাপড় দেখেশুনে বাছতে লাগল। এবার দোকানদার মারিয়ার জন্যে কাপড়ের একটা ছোট গাঁটরি খুলে মারিয়াকে দেখাতে লাগল। সবাইমিলে একরকম কাপড় পছন্দ করল। দোকানদার মাথা চুলকে বলল–অতজনের কাপড় তো হবে না। এবার বাকি কাপড় অন্যরকম পছন্দ করা হল। মারিয়াও একটা দামি কাপড় পছন্দ করল। ফ্রান্সিসের দিকে হেসে তাকিয়ে বলল–এটা তোমার পছন্দ হচ্ছে? ফ্রান্সিস বলল–ভালোই তো এসব পছন্দ ছন্দের বালাই আমার নেই। বরং হ্যারিকে বলো। কিন্তু যা করবে তাড়াতাড়ি কর। পছন্দের পাট চুকল। সবাই রাস্তায় নেমে এল। হ্যারি বলল–এবার নিজেদের মত ঘুরে বেড়াও। খেতে চাইলে খেতেও পারো। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই যেমন বলা হয়েছে গীর্জার সামনে এসে জড়ো হবে। দুজন তিনজন একসঙ্গে কেউ একা ছড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস মারিয়া আর হ্যারি ঘোরাঘুরি শুরু করল।
কিছুক্ষণ পরেই একজন দুজন করে গীর্জাটার সামনে এসে জড়ো হল। ফ্রান্সিসরাও এল। শাঙ্কোর হাতে একটা গোল চামড়ার ঢাকনাওয়ালা বাজনা। যন্ত্রটার গায়ে ঘুঙ্গুরমত আটকানো। হাত দিয়ে চাপড় দিয়ে বাজিয়ে শাঙ্কো ওটা বাজাতে বাজাতে হাসতে লাগল। বাজবার সঙ্গে ঘুঙুরের শব্দও তালে তালে বাজছিল।
–ওটা এখানকার জীপসিদের বাজনা। মারিয়া দেখে বলল।
সবাই শেষ বিকেলে জাহাজে ফিরে এল। ওরা যখন পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠছে তখন হ্যারি দেখল পাশে নোঙর করা হ্যারল্ডের জাহাজের পাটাতন দিয়ে এক অভিজাত পোশাকপরা মধ্যবয়স্ক লোকও উঠছে। আর চাৰ্মান্ত তাকে সাদরে তুলে আনছে। হ্যারি ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–ভদ্রলোক কে?
এবার ফ্রান্সিসও তাকিয়েই ইয়ুসুফকে দেখল। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঐ দিকে তাকিয়ে দেখল ইয়ুসুফকে চাৰ্মান্তরা আর ইংরেজরা ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইয়ুসুফ সবাইর দিকে তাকিয়ে কিছু বলছে।
–তাহলে চাৰ্মান্তরা এখনও জাহাজ থেকে নেমে যায়নি। হ্যারি বলল।
তাইতো দেখছি। কিন্তু এরকম অভিজাত চেহারা পোশাকেরমানুষ। ওদের জাহাজে এল কেন। ওদের বলছেই বা কী? ফ্রান্সিস একটু চিন্তিত স্বরে বলল।
-বোধহয় জাহাজটা কিনতে এসেছে। হ্যারি বলল।
হতে পারে। তবু মনে একটা খটকা লাগছে। চলো তো দেখি। ফ্রান্সিস বলল। বলে ফ্রান্সিস পাটাতনের দিকে এগোল। হ্যারিও পেছনে পেছনে এল।
দু’জনে হ্যারল্ডের জাহাজের ডেক উঠে এল। ভিড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে চাৰ্মান্ত বেশ সতর্ক ভঙ্গীতে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ও কিছু বলার আগেই ইয়ুসুফ ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–আপনারা–মানে এখানে এসেছেন কেন?
–আমরা ঐ চার্মান্তের দেশের লোক। ভাইকিং। আপনার পরিচয়? ফ্রান্সিস বলল।
চর্মান্ত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–ইনি এই শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী। এর নাম–। কিন্তু ইয়ুসুফ সঙ্গে সঙ্গে চাৰ্মান্তকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল–শুনলেন তো আমি ব্যবসায়ী। এই জাহাজটার মালিক আমি–ফিগান আমার নাম।
-ঠিক বুঝলাম না। এই জাহাজ তো হ্যারল্ডের। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। হ্যারল্ড মাস ছয়েক আগে আমাকে বিক্রি করেছে। ইয়ুসুফ সাদা মাটা গলায় বলল।
কিন্তু হ্যারল্ড তো মারা গেছে। ইয়ুসুফ একটু চমকে উঠেও বেশ নির্বিকার গলায় বলল–এ্যাচাৰ্মান্ত আমাকে বলেছে সেকথা।
-কিন্তু আপনিই যে এই জাহাজ কিনেছেন তার প্রমান কিছু আছে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল। ইয়ুসুফ মৃদু হেসে বাঁহাত দিয়ে ডানদিকের পোশাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা এক ভাঁজ করা লম্বাটে ছাইরঙা পাৰ্চসমেন্ট কাগজ বের করে বাঁ হাতেই হ্যারির হাতে দিল। হ্যারি পড়ল স্পেনীয় ভাষায় লেখা একটা জাহাজ বিক্রির দলিল। হ্যারি পড়ল– ফিগোন নামে দোরস্তাদের ব্যবসায়ীকে এই জাহাজ পঁচিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি করলাম। নিচে হ্যারল্ডের স্বাক্ষর। তারিখ ছ’ মাস আগেকার।
হ্যারি পড়ে কাগজটা ফিগোনকে ফেরৎ দিল। ফিগোন ওটা নিয়ে আবার বাঁহাতে পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। মাথা ওঠানামা করে হ্যারি বলল–হ্যাঁ। হ্যারল্ড ছ’মাস আগে এই জাহাজটা পাঁচিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রায় এঁর কাছে বিক্রি করেছে। ফ্রান্সিস এতক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে ইয়ুসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করছিল–লোকটার চোখেমুখে কোন ভাবান্তর নেই। কেমন একটা অদ্ভুত নির্বিকার ভঙ্গী। এমনকি হ্যারল্ড মারা গেছে শুনেও একটু চমকে উঠলেও পরক্ষণেই নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়েছে। এসব লোকের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই মনে মনে কী ফন্দী আঁটছে। একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফ্রান্সিস বলল– কিন্তু এতদিন দখল নেননি কেন?
