–হ্যাঁ মা। কালকে তোমাকে জাহাজঘাটে নিয়ে গিয়ে দেখাবো।
মা মাথা নাড়লেন–ও দেখে কি হবে। তুই ফিরে এসেছিস্ এতেই আমি খুশি।
বাবার দিকে তাকিয়ে বলল–দেখেছো, ছেলেটা কেমন রোগা হয়ে গেছে।
বাবা একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে মুখে একটা শব্দ করলেন–হুম।
***
সন্ধ্যে হতে না হতেই মা ফ্রান্সিসকে বলতে লাগল রাজার বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে যাচ্ছিস, একটু সভ্য-ভব্য হবি তো?
ফ্রান্সিস হেসে বলল–আমি কি বুনো-ভাজিম্বাদের মত?
–ভাজিম্বা আবার কারা? মা তো অবাক।
–সে তুমি বুঝবে না। যাকগে–কি করতে হবে বলো।
–ভালো করে, স্নান-টান করে পরিপাটি মাথার চুল আঁচড়ে, সবচেয়ে ভালো পোষাকটি পরে, সুগন্ধি গায়ে ছড়িয়ে রাজবাড়িতে যেতে হবে?
ফ্রান্সিস কপালে ভুরু তুললো–এতো কিছু করতে হবে?
মা হাসল–হ্যাঁ, শুধু রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস না, নিমন্ত্রণ খেতেযাচ্ছিস–কাজেই–।
মা যেভাবে বললো, সে ভাবেই ফ্রান্সিসকে সাজগোজ করতে হ’ল। গাড়িতে উঠে দেখলো বাবাও বিশেষ সাজপোষাক পরেছেন। মা শরীর ভালো নেই বলে গেলেন না।
গাড়ি চললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি রাজপ্রাসাদের সিঁড়ির সামনে পৌঁছালো। চারদিকে নানারঙের নানারকমের ঘোড়ায় টানা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অতিথি অভ্যাগতের সংখ্যা বেশ হবে বলেই ফ্রান্সিসের মনে হল।
বিরাট হলঘরে একদিকে নাচ-বাজনার আসর। অন্যদিকে বিরাট টেবিলে নানা মুখরোচক খাবার সাজানো। টেবিলের ধারে ধারে চেয়ার পাতা। মাথার ওপরে ঝাড় লণ্ঠন। তাতে নানা আকারের রঙীন কঁচ বসানো। দেয়ালে বিরাট-বিরাট তেলরঙের ছবি। চারদিক আলোয়-আলোয় ঝম করছে।
ফ্রান্সিস যখন বাবার সঙ্গে ঢুকল, তখন ঢিমেতালে বাজনা বাজছে। অভ্যাগত স্ত্রী কে পুরুষ জোড়ায়-জোড়ায় নাচছে, সেই বাজনার তালে-তালে। প্রবেশের দরজার মুখোমুখি রাজা-রাণী আর রাজকুমারী মারিয়া বসে আছে। ফ্রান্সিসের বাবা রাজার কাছে গিয়ে একটু মাথা নিচু করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। রাণী ডানহাত বাড়িয়ে দিলেন। তিনি রাণীর হস্ত চুম্বন করলেন। বাবার দেখাদেখি ফ্রান্সিসও তাই করলো। ওর বাবা তারপর যেদিকে গণমান্য অমাত্যরা হাতের মদের গ্লাস নিয়ে এখানে-ওখানে জটলা বেঁধে কথাবার্তা বলছেন, সেখানে চলে গেলেন।
রাজা রাজকুমারী মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন–এই হচ্ছে ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে মারিয়ার হস্ত চুম্বন করল। কি অপরূপ সুন্দরী মারিয়া। ফ্রান্সিস সব ভুলে বেশ বোকার মতই রাজকুমারীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
মারিয়া হেসে বলল–আপনি খাবার সময় আমার পাশে বসবেন–আপনার সোনার ঘন্টা, হীরে দু’টো আনার গল্প শুনবো।
ফ্রান্সিস তখনো দেখছে রাজকুমারীকে। হলুদ গাউন পরে রাজকুমারীকে মনে হচ্ছে যেন একটা ফুটন্ত ফুল। রাজকুমারী হাসলে গালে টোল পড়ে। রাজা একটু কাশলেন। ফ্রান্সিস ফের সম্বিত ফিরে পেল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
তারপর বেশ দ্রুতপায়ে ওখান থেকে সরে এল। দেখলো, একপাশে ওর সব বন্ধুরা দাঁড়িয়ে পরস্পর কথা বলছে। সবাই সেজেগুজে এসেছে। হ্যারিও রয়েছে। বন্ধুদের মধ্যে এসে ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এত জাঁক-জমক, আলো-বাজনা নাচ ও বিচিত্র দামী-দামী পোষাকে সজ্জিত নরনারীর ভীড়, এসব ভালো লাগছিল না ওর। কিন্তু এখান থেকে এখন চলেও যাওয়া যায় না। স্বয়ং রাণীর নিমন্ত্রিত অতিথি ওরা! ভালো না লাগলেও থাকতে হবে। ও হ্যারির সঙ্গে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে লাগল, আর অপেক্ষা করতে লাগল কতক্ষণে খাওয়ার ডাক পড়বে। খাওয়াটা হয়ে গেলেই এই জায়গা থেকে পালানো যাবে। কিন্তু খাওয়ার তখনও অনেক দেরি। তখন নাচের আসর জমে উঠেছে। সুবেশা সুন্দরী মেয়েরা এসে ফ্রান্সিসের বন্ধুদের নাচের আমন্ত্রণ জানাতে লাগল। ওরা বন্ধুরা প্রায় সকলে কিছুক্ষণ সময় নেচে এলো। ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে একটা থামের আড়ালে আত্মগোপন করলো, পাছে কোন মেয়ে ওদের নাচের আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মগোপন করা গেল না। রাজকুমারী মারিয়া খুঁজে খুঁজে থামের পেছনে ফ্রান্সিসকে আবিষ্কার করল। হাত বাড়িয়ে বলল–চলুন আমার সঙ্গে, নাচবেন আসুন।
হতাশার একটা ভঙ্গি করে ফ্রান্সিস মারিয়ার সঙ্গে নাচের জায়গায় এলো। দু’জনে বাজনার তালে-তালে নাচতে লাগল। যারা নাচতে নাচতে ওদের দুজনের কাছে যারা আসছে, তারাই মাথা নুইয়ে একবার করে রাজকুমারীকে অভিবাদন জানাচ্ছে। নাচতে নাচতে রাজকুমারী বললো এবার কি আনতে যাবেন?
যা অন্য কিছু জিজ্ঞেস করে নি। এমন একটা বিষয় জিজ্ঞেস করেছে, যা নিয়ে কথা বলতে ফ্রান্সিসের উৎসাহে কমতি নেই। ও নাচ থামিয়ে হাত দিয়ে দেখালো–জানেন, মুক্তোর সমুদ্রের মুক্তোগুলো এত বড়-বড়।
রাজকুমারী হাসল। তার চোখে বিস্ময়! বললো–বলেন কি?
–আমি নিজের চোখে দেখেছি।
–আমার জন্যে কিন্তু একটু বড় মুক্তো আনবেন, আমি লকেট তৈরি করবো। –আনবো বৈকি! ফ্রান্সিস বলল–ওসব তো বিক্রী করা যাবে না।
–কেন?–চাঁদের দ্বীপের অধিষ্ঠাতা দেবতার অভিশাপ লাগবে।
–চাঁদের দ্বীপ কোথায়?
–আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর।
–আপনি কবে যাবেন?
ফ্রান্সিস একটু চিন্তিতস্বরে বলল–দেখি।
নাচের বাজনা থেমে গেল। সকলেই করতালি দিল। ফ্রান্সিসও সঙ্গে-সঙ্গে রাজকুমারীকে অভিবাদন জানিয়ে থামের আড়ালের কাছে চলে এল। দেখলো, হ্যারি দাঁড়িয়ে আছে। এখনও কেউ ওকে পাকড়াও করতে পারে নি। হ্যারি মুচকি হেসে বলল
