সঙ্গীরা নিজেদের মধ্যে মৃদুস্বরে কথা বলতে লাগল।
তারপর একজন বলল–ঠিক আছে। এ ছাড়া তো বেঁচে থাকার কোন উপায় দেখছি না। কিন্তু আমাদের সমান স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে।
–অবশ্যই। তবে আমার বুদ্ধিতেই তো এসব হবে। কাজেই আমি বেশিরভাগটা নেব। কী? তোরা রাজী।
–তোমার খুব কূটবুদ্ধি চার্মান্ত। একজন বলল।
–আগে বল্ তোরা আমাকে সাহায্য করবি কিনা। চাৰ্মান্ত বলল।
–উপায় কি। নইলে এই বিদেশে না খেয়েই মরতে হবে একজন বলল। চাৰ্মান্ত দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বলল আমি সব ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। তোদের জাহাজ থেকে নামিয়ে দিতে এলে বলবি আমার এক বন্ধু গেছে আমাদের আস্তানা খুঁজতে। ও এলেই আমরা নেমে যাবো। ঠিক আছে? ওরা আর কী বলবে। চুপ করে রইল। চাৰ্মান্ত একটু সতর্কভাবে চারদিক দেখেটেখে পাটাতন দিয়ে জাহাজঘাটে নেমে পড়ল। তারপর দ্রুত ভিড়ের রাস্তার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ছোট মোড় পার হয়ে দুটো গাছের মাঝখানে একটা বড় পাথর গাঁথা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল! বাড়িটার নিচে রাস্তায় দুটো ঘোড়ায়টানা মালবাহী গাড়ি দেখল। গাড়ি দুটোর পেছনে একটা বেশ বড় লোহার দরজা খোলা। বিরাট ঘর। মালপত্র বোঝাই! একপাশে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে বসে আছে। খাটের আসনে একজন বসে একটা লম্বা কাগজে বোধহয় হিসেবটিশেব লিখছে। চাৰ্মান্ত নিঃশব্দে ওদের দৃষ্টি ছাড়িয়ে বাড়িটার পাশের চিলতে গলিটায় ঢুকে পড়ল। কিছুটা এগিয়েই বাঁদিকে পেল একটা কাঠের দরজা। চাৰ্মান্ত চিনতো। গলিটার এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে দরজাটায় দুটো টোকা দিল। একটু পরেই দরজাটা খুলে গেল। এক দশাসই চেহারার কালো মানুষ মুখ বাড়াল। তার চামড়ার কোমর বন্ধনীতে ঝুলছে একটা বড় ছোরা। ছোরাটার কোন খাপ নেই। প্রহরীর খালি গা। একটা চামড়ার ফিতে বুকেপিঠে আড়াআড়ি বাঁধা। চাৰ্মান্তকে দেখে মৃদু হেসে বলল হ্যারল্ড।
সাহিব?
–পরে আসবে। লোকটা সরে দাঁড়াল। চাৰ্মান্ত একটু দ্রুত ঢুকে পড়ল। দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বেশ অন্ধকার সামনে। চার্মান্তের পরিচিত জায়গা। তবু ও অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল। কিছুটা এগোতে ডানদিকে একটা বেশ কাজ করা দরজা। চাৰ্মান্ত দরজাটা আস্তে ঠেলল। দরজাটা খুলে গেল। একটা বড় ঘরে ঢুকল ও। ঘরটায় বেশ আলো দু’ধারে কয়েকটা কাঁচে ঢাকা আলো জ্বলছে। মেঝেয় কার্পেট পাতা। সামনে একটা ঝলমল কাপড় পাতা বিছানায় একটা ফুলপাতা বোনা কাপড়ে ঢাকা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে মধ্যবয়স্ক ইউসুফ বসে আছে। পরনে এই অঞ্চলের অভিজাত মানুষদের জাঁকালো পোশাক। মুখ পরিষ্কার কামানো। ইয়ুসুফ একটু হেসে স্পেনীয় ভাষায় বলল–কী ব্যাপার? হ্যারল্ড সাহিব কই?
–উনি এখন ইংল্যান্ডে। একদফা পাঠিয়েছে আমার সঙ্গে। মোট এগারোজন উনি নতুন জাহাজ নিয়ে পরে আবার একদফা আসবেন।
— কখন পাঠাবে? ইসুয়ুফ বলল।
–গভীর রাতে। যেমন পাঠানো হয়। চার্মান্ত বলল।
–পাহারা দিয়ে আসবে। চাঁচামেচি যেন না হয়। ইয়ুসুফ বলল।
না-না। চাৰ্মান্ত জোরে মাথা নাড়ল।
–পৌঁছে দিলে দাম পাবে। সব সাহেব তো? ইয়ুসুফ বলল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। চাৰ্মান্ত মাথা কাত করল। তারপর হ্যারল্ডের সম্পত্তির কথা ফ্রান্সিসদের কথা–সিন্দুক নিয়ে যাওয়ার কথা বলল। বেশ মন দিয়ে শুনে ইয়ুসুফ বলল–ঐ ধনসম্পত্তির সিন্দুকের কথা পরে ভাবা যাবে। কী নাম ওদের দলনেতার?
–ফ্রান্সিস। চাৰ্মান্ত বলল–আমাদের মতই ভাইকিং।
–ওরা এখানে কতদিন জাহাজ নোঙর করে থাকবে? ইয়ুসুফ জানতে চাইল।
–বোধহয় দু-তিন দিন। চাৰ্মান্ত বলল।
–হুঁ। মুখে শব্দ করল ইয়ুসুফ। তারপর বলল–তোমরা যেভাবে বরাবর আনো সেভাবে আনা যাবে না। ফ্রান্সিসরা পাশের জাহাজে থাকবে। কিছু কথাবার্তা তোমাদের মধ্যে হবেই। কারণ তোমাদের জোর খাটাতে হবে। ফ্রান্সিসরা টের পাবে। ধরা পড়ে যাবে। কাজেই কৌশলে কাজ সারতে হবে। আমি বিকেলে তোমাদের জাহাজে যাবো। যা ব্যবস্থা করার করবো।
–চাৰ্মান্ত ঠিক বুঝল না। বলল–ওরা খুব দুর্ধর্ষ।
-এক ফোঁটাও রক্ত পড়বে না। যাও। আমি সময়মত যাবো। তারপর মুখে একটা বা হাতে তুড়ি দিল। ওপাশের দরজা খুলে দু’জন বলশালী কালো যোদ্ধা দ্রুত ঢুকল। ওদেরও কোমরে খোলা বড় ছোরা ঝুলছে। ইয়ুসুফ আঙ্গুল তুলল। একজন প্রহরী ছুটে গিয়ে একটু অন্ধকারে কাজ করা লোহার টেবিল থেকে একটা ছোট লাল রঙের থলে নিয়ে এলো। ইয়ুসুফের হাতে দিল। ইয়ুসুফ থলি থেকে বাঁহাতে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করে চাৰ্মান্তকে দিল। বলল–পরেআরো পাবে। চাৰ্মান্ত ইয়ুসুফের ডান হাতটা কোমর বন্ধনীতে ঢোকানো দেখল। আগেও তাই দেখেছে।
চাৰ্মান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বুঝে উঠতে পারল না ইয়ুসুফ নিজেই যাবে কেন। তবে কি ইয়ুসুফ ওকে বিশ্বাস করছেনা? এসব ভাবতে ভাবতেই চাৰ্মান্ত জাহাজে ফিরে এল। জাহাজের সঙ্গীদের কাছে এসে মৃদুস্বরে বলল ইউসুফ বিকেলে আসবে। কীসব ব্যবস্থা করবে বলল। সবাই চুপ করে রইল। এখন শুধু অপেক্ষা করা।
ওদিকে ফ্রান্সিস মারিয়ারা জাহাজ ঘাটে নেমেছে। ঘরবাড়ি লোকজন দেখতে দেখতে ওরা চলল। সবাই বেশ খুশি। প্রথমেই শাঙ্কোকে পাঠানো হল একটা ভালো কাপড় জামার দোকানের খোঁজে। শাঙ্কো একটু পরেই ফিরে এসে একটু দূরে ডানদিকে একটা বড় দোকান দেখাল। সবাই এগিয়ে এসে দোকানে ঢুকল। দোকানের একপাশে কাপড়ের গাঠরি সাজিয়ে রাখা। টাকমাথা দোকানদার হাসিমুখে এগিয়ে এল। স্পেনীয় ভাষায় বলল–আসুন আসুন। এত খদ্দের। ভালো বিক্রি হবে। ওরা অভ্যস্ত চোখেই বুঝল এরা বিদেশি। এদের জামা, পোশাকই বলছে অনেকদিন এরা সমুদ্রে জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়িয়েছে। এরা কী কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেসব জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহও দোকানদার দেখাল না। ও জানে জলদস্যুরাও পোশাক পাল্টে নতুন পোশাক কিনতে আসে। কিন্তু মারিয়াকে দেখে বেশ কৌতূহলী চোখে মারিয়ার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই চোখ ঘুরিয়ে বলে উঠল আপনারা নিশ্চয়ই নতুন পোশাক তৈরি করাবেন?
