ওদের দুজনকে দেখে ইংরেজ বন্দীরা এগিয়ে এল। দু’একজন হাসি মুখে বারবার বলতে লাগল–আপনাদের কী বলে ধন্যবাদ জানাবো। ক্রীতদাসত্বের দুঃসহ জীবন থেকে আমাদের বাঁচালেন। আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম। কথাগুলো বলে ওরা একে একে এসে ফ্রান্সিস ও হ্যারিকে জড়িয়ে ধরতে লাগল। ফ্রান্সিস হেসে বলল ঠিক আছে–ঠিক আছে। এখন বলো তোমরা কী করবে। একজন বলল–আমরা ঠিক করেছি এই জাহাজে চড়েই আমরা ইংল্যান্ডে ফিরে যাবো।
–ভালো কথা। তাই করো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারিকেনিয়ে সেই ভাইকিং লুঠেরার দলের কাছে এল। ওরা চুপ করে ডেকে বসেছিল। একজন এসে ফ্রান্সিসের সামনে দাঁড়াল বলল–আমরা আপনাদের সঙ্গে দেশে ফিরেযাবো।
-তোমার নাম কী? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–চাৰ্মান্ত। লোকটি বলল।
–না। তা হবে না। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা ইংল্যান্ডে গিয়ে লুঠপাট করেছে নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। ভাইকিং জাতির কলঙ্ক তোমরা।
–আমরা তো হ্যারল্ডের নির্দেশেই এইসব করতে বাধ্য হয়েছি। চাৰ্মান্ত বলল।
–এটা একটা যুক্তি হল? হ্যারি বলল–হ্যারল্ড তো একটা কুলাঙ্গার। সে বলল আর তোমরা নির্বিবাদেনরহত্যা করলে।
–আমরা তো আপনাদের স্বজাত, আপনাদের স্বদেশবাসী। চাৰ্মান্ত বলল।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না-না। তোমাদের মত ঘাতকদের কোন দায়িত্ব আমরা নেবনা। তোমাদের এই বন্দরেই নেমে যেতে হবে। তারপর বাঁচোমরো–তোমাদের ব্যাপার।
–হ্যারল্ডের ধনসম্পদ তো আপনারা নিয়ে গেছেন। সেখান থেকেই আমাদের খাওয়া পরা জাহাজের ভাড়ার জন্য–কথার শেষ করতে না দিয়েই ফ্রান্সিস বলল–ঐ সম্পদ তোমাদের না। ঐ সম্পদ ইংল্যান্ডবাসীদের। দিতে হলে ঐ ইংরেজ বন্দীদেরই দেব। তোমাদের নয়।
চাৰ্মান্ত ভালো করেই বুঝল স্বজাতি হলেও ফ্রান্সিসরা ওদের কোনরকম সাহায্য করবে না। ও চুপ করে রইল। মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল। দুজনে ইংরেজ বন্দীদের কাছে ফিরে এল। বলল–তাহলে তোমরা কখন দেশের দিকে জাহাজ চালাবে?
–কত দিনের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়েছি। অন্তত একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে ফিরবো ভাবছি। একজন বলল। অন্যজন বলল–
–কিন্তু আমাদের জামা কাপড়ের অবস্থা তো দেখছেন। আমরা কপর্দকশূন্য। পথে খাদ্যওতো লাগবে।
–ঠিক আছে। ভাই আমরাও ধনী নই। দু’একজন রাজা খুশি হয়ে আমাদের সোনার চাকতি কিছুকিছু দিয়েছে। আমি কিছু তোমাদের পাঠিয়ে দেব। এই বিদেশে পড়ে থেকো না। এখানে তোমাদের কে চেনে যে খাদ্য আশ্রয় দেবে। ফ্রান্সিস বলল।
না না। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যাবো। একজন বলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের জাহাজে ফিরে এল। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে শাঙ্কো দু’জনের কাছে এল। ফ্রান্সিস ওদের মুখ দেখেই বুঝল–ওরা কী বলতে চাইছে। হেসে বলল–দুপুরে খাওয়া শেষ করে আমরা এই বন্দর শহরে যাবো। ঠিক আছে। বন্ধুরা খুশিতে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। কেবিন ঘরে ঢুকলে মারিয়া বলল–বন্ধুরা খুশির ধ্বনি তুলল। কী ব্যাপার?
দুপুরে এইখানে নামবে। ঘরেটুরে আনন্দ করবে। ফ্রান্সিস বলল খুশি হয়ে মারিয়া বলল–সত্যি?
-হ্যাঁ। বড় শহর। অনেক কিছু পাওয়া যাবে। দু’দুবার জাহাজ লুঠ হয়েছে। অন্তত কাপড় জামা তো কটা বানাতে হবে। ফ্রান্সিস হাসতে হাসতে বলল। মারিয়া খুশিতে লাফিয়ে উঠে হাততালি দিল। মারিয়াকে এত খুশি দেখে ফ্রান্সিস নিজেও খুশি হল। মারিয়ার বিমর্ষ ভাবনা অনেকটা কেটে গেছে।
দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরেই সবাই পোশাক পাল্টাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নতুন পোশাকগুলো তো সব ডাকাতরা নিয়ে গেছে। বাকি পোশাক যেগুলো একটু ভালো অবস্থায় আছে সেসব পরে ওরা একে একে ডেকে এসে জড়োহ’ল। ক্রেভানের দেখাশুনার জন্যে বৈদ্য ভেনকে রেখে ফ্রান্সিস আর মারিয়া ডেকে উঠে এল। দু’জনের গায়েই ভালো পোশাক। মারিয়া একটা হালকা নীল রঙের পোশাক পরেছে। গলার নেকলেসটা ডাকাতরা নিয়ে নিয়েছে। সবচেয়ে দামি নেকলেসটা পরেছে। মাথার চুল বেঁধেছে টান টান করে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে রাজকুমারীকে। সবাই পরস্পর দৃষ্টিতে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যারিও নতুন পোশাক পরে ততক্ষণে এসে গেছে।
সবাই পাটাতন দিয়ে হেঁটে হেঁটে পাথুরে তীরে নামল। সবাই একত্র হলে হ্যারি বলল–শোন–আমাদের জামা কাপড় তো ডাকাতি হয়ে গেছে। সবার আগে আমরা। কোন দর্জির দোকানে যাবো। কাপড় বেছে মাপটাপ দেব। তারপর তোমাদের হাতে সোনার চাকতি দেওয়া হবে। সবাই ঘুরে ঘুরে শহর দেখবে। শহরের বাইরে দূরে যাবে না। আনন্দ করবে। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। আঙুল তুলে উঁচু গীর্জাটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–সবাই ঐ গীর্জাটার নিচে এসে জড়ো হবে। বেশি দেরি করবে না। সবাই বড় রাস্তাটায় এল। দু’দিকে বাড়িঘর লোকজন দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল। দু’চারটে বেশ শৌখিন ঘোড়ার গাড়ি দেখল। সুবেশ পুরুষ মহিলাদের দেখল।
হ্যারল্ডের জাহাজের ডেক-এ বসেছিল লুটেরা ভাইকিংরা। চাৰ্মান্তই ওদের দলনেতা। হ্যারল্ডের ডান হাত। ফ্রান্সিসরা ওদের লুঠ করা ধনসম্পদ নিজেদের জাহাজে নিয়ে গেল এটা ওদের সহ্য হচ্ছিল না। ওরা একই সঙ্গে নিষ্ঠুর আর মিথ্যেবাদী। চাৰ্মান্ত এবার বন্ধুদের বলল–শোন–স্বজাতি স্বদেশের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সিস আমাদের জন্যে কিছুই করতে চাইল না। বরং এই জাহাজের আশ্রয় থেকেও আমাদের বিতাড়িত করতে চাইল। একটু থেমে বলল–থাক সেসব্যারল্ডের সঙ্গে এই বন্দরে ঐ শহরে বেশ ঘুরেছি। কয়েকটা আস্তানা জানা আছে আমার। এই দারস্তানে আছে ইউসুফ। লোকে ওকে অন্য নামে চেনে। ইউসুফ আসলে আরবদেশের মানুষ। বাইরে ব্যবসায়ী। আসলে ক্রীতদাস কেনাবেচার ব্যবসা। বেশ ধনী। ওর বাড়িতেও আমি গেছি। বাইরে থেকে সাদামাটা বড় বাড়ি। ভেতরে আছে গরাদ দেওয়া কয়েদ ঘর। আমরা য়ুরোপের ইংলন্ডের সাদা মানুষ ধরে আমাদের জাহাজে আটকে রেখে এখানে আসি। গভীর রাতে তাদের ইয়ুসুফের বাড়িতে নিয়ে যাই। ইয়ুসুফের কয়েদঘরে ওদের বন্দী করে রাখা হয়। হ্যারল্ড তাদের বিক্রি করে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে চলে আসে। ইয়ুসুফ আরো বেশি কুফি মানে আরবীয় স্বর্ণমুদ্রায় তাদের বিক্রি করে। চার্মান্তের সঙ্গীরা এতসব খবর জানতো না। হেরন্ডের নির্দেশমত নরহত্যা লুঠপাট করতো। একজন দলের লোক বলে উঠল– এসব ভেতরের খবর শুনে আমাদের কী হবে। আমরা দেশেও ফিরে যেতে পারবো না। ফ্রান্সিস আমাদের রাজার খুব প্রিয়পাত্র। কোনভাবে আমাদের কথা জানতে পারলে আমাদের হয় মেরে ফাঁসি দেবেন নয়তো দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে। না খেয়ে মরবো আমরা সেইজন্যেই সবদিক ভেবে বলছি–হ্যারল্ড তো মারা গেছে। ও যা করে স্বর্ণমুদ্রা পেতো আমরা তাই করবো। চাৰ্মান্ত বলল। সঙ্গী লুঠেরারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। চার্মান্তের মতলব বুঝতে পারল না। চাৰ্মান্ত এবার চারদিকে তাকাল। দেখল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীরা একটু দূরে গল্পগুজব করছে। চাৰ্মান্ত গলা নামিয়ে বলল–শোন–আমি নেমে শুক– যাচ্ছি। ইয়ুসুফের আস্তানায় যাবো। হ্যারল্ড মারা গেছে এটা বলবো না। বলবো আমরাই এগারোটা ইংরেজ ক্রীতদাস এনেছি। শ্বেতকায় মানে আরবীয়র। যাদের সাহিব বলে সেইসব ক্রীতদাসের দাম অনেক। অর্ধেক দাম পেলেও আমাদের হাতে যথেষ্ট কুফি আসবে। তখন যে যার মত নিজের রাস্তা দেখবো। বুঝলি বোকার দল?
