দু’তিন দিন পরে। সেদিন সকালের খাবার খেয়ে শাঙ্কো ডেকএ উঠে এল। আকাশ পরিষ্কার। রোদ উজ্জ্বল। শাঙ্কো পূর্বদিকে তাকাতেই সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় দূরে বেশ কয়েকটা জাহাজের মাস্তুল দেখল। মাস্তুলের মাথায় বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে। শাঙ্কো একটু গলা চড়িয়ে বিনোলাকে ডাকল। বিনোলা কাছে এলে বলল–ফ্রান্সিসকে গিয়ে বল–একটা বন্দর দেখা যাচ্ছে। বোধহয় ওটাই দোরস্তাদ বন্দর। খবর পেয়ে ফ্রান্সিস এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল। জাহাজ তখন সেই বন্দরের দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। কিছু পরে জাহাজে বাড়িঘর দেখা গেল। তখনই হ্যারি সেখানে এল। বলল এটাই দোরস্তাদ বন্দর। ক্রেভানের নির্দেশমতই তো ফ্লেজার জাহাজ চালিয়েছিল।
কাছে গেলেই বোঝা যাবে।
–তবু। নামবার আগে তো জানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ক্রেভানকে এখানে আনতে পারলে ভালো হত। হ্যারি বলল।
না-না। ক্রেভানকে এখন বেশি টানাটানি করা ঠিক হবে না। ও বিশ্রাম করুক। বরং তুমি ওকে জিজ্ঞেস করে এসো একটা বড় বন্দরের কাছে আমরা এসেছি। সেই বন্দরে বেশ কয়েকটা জাহাজ নঙর করে আছে। সেটা কোন বন্দর ঠিক বুঝতে পারছি না–ফ্রান্সিস বলল।
–ক্রেভানকে বলছি। হ্যারি চলে গেল। এতক্ষণে ফ্রান্সিসদের জাহাজ বন্দরের অনেক কাছে চলে এসেছে। লোকজন, বাড়িঘর, গাছপালা, নোঙরকরা জাহাজ সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই হ্যারি ফিরে এল। বলল– ক্রেভান বলছে বন্দর এলাকার ডানদিকে একটা বড় গাছের পাশে একটা গীর্জার উঁচু চুড়ো দেখা যাবে। মাথায় পেতলের ক্ৰশ।
–ঐ তো। ফ্রান্সিস আঙুল তুলে বলল।
–হ্যাঁ। গাদাগীর্জার ক্রশ বসানো চুড়ো। এটাই দোরস্তাদ বন্দর। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল হ্যারি কতদিন পর পরম নিশ্চিন্তে একটা বন্দরে নামতে পারবো। কত বন্দরে ঘাটে কত দুশ্চিন্তা নিয়ে হঠাৎ আক্রান্ত হবার আশঙ্কা নিয়ে জাহাজ ভেড়াতেহয়েছে। নামতে হয়েছে। পানীয় জল খাদ্য সংগ্রহের জন্যে। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস–সভ্য দেশেই নামছি সত্য কিন্তু এখানেও বিপদে পড়তে পারি। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ হ্যাঁ। বিপদ সব জায়গাতেইহতে পারে। তবে মানুষ ভাষা পরিবেশতো মোটামুটি পরিচিত। বিপদ আঁচ করা অনেক সহজ। কঙ্কাল দ্বীপ বা রেসিকের মত? ? ? ? ? ? ? দ্বীপ রাজ্য তো নয়। কথাটা বলে ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে গেল। বলল– ফ্লেজার জাহাজ ভেড়াও। ফ্লেজার জাহাজের হুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে বন্দরে জাহাজ ভেড়াল। শাঙ্কো আর বিনোলা গিয়ে পাটাতন পেতে দিল পাথুরে জাহাজ ঘাটে। একে তো দেশে ফেরার আনন্দ সেই সঙ্গে কতদিন পরে ইউরোপের ডাঙা। সুসজ্জিত ভদ্র মানুষদের ভিড়। রঙ বেরঙের পোশাকপরা মহিলারা পরিচিত ভদ্র মানুষদের মুখ। শহরের কত আনন্দ উচ্ছ্বাসের হাতছানি। কয়েকজন বন্ধু মিলে উৎসাহের সঙ্গে হ্যারির কাছে ছুটে এল। বলল চলো এখনই নামি। একটুঘুরেফিরে আসী হ্যারি হেসে বলল– তোমাদের মনে খুব আনন্দ উৎসাহ। স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্রান্সিস কী বলে দেখি। তারপর নামা। শহর দেখা। ঘুরে বেড়ানো।
তাহলে রাজকুমারীকে বলি গিয়ে। ওরা বলল।
–কোন লাভ নেই। ফ্রান্সিস না বলা পর্যন্ত কেউ রাজকুমারীকে গিয়ে বিরক্ত করবে না। ডাঙায় নামবে না। হ্যারির কথায় ওদের উৎসাহে ভাটা পড়ল। দেখা যাক–ফ্রান্সিস কী বলে।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। মারিয়াও যেন বিছানার একপাশে এসে ছেঁড়া পোশাক সেলাই করছিল। দেখে হ্যারি বেশ দুঃখ পেল। বলল–রাজকুমারী–আমরা একটা বড় বন্দর শহরে এসেছি। ছেঁড়া পোশাক টোশাক আর সেলাই করবেন না। নতুন পোশাক কিনতে নামবো আমরা। মারিয়া হেসে বলল–হ্যারি–পুরোনো পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক স্মৃতি। কোন পোশাক পরে জাহাজে রাতের নাচগানের আসরে গেছি। কোন পোশাক পরে কোন বিদেশি রাজার অন্দরমহলে থেকেছি বা কয়েদগারে থেকেছি। এইসব স্মৃতি কি ভোলা যায়? ফ্রান্সিস সপ্রশংস দৃষ্টিতে মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মৃদু হাসল। কিছু বলল না। একপাশে সে চোখ বন্ধ করে বসেছিল। এবার মাথা নেড়ে পাকা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে হেসে বলল–বড় সুন্দর কথা বলেছেন।
–ক্রেভান–এই আমাদের রাজকুমারী। আমাদের এই ছন্নছাড়া জীবনের একমাত্র সান্ত্বনা মা বোনেদের স্নেহ সাহচর্য পাই ওঁর কাছেই। হ্যারি বলল ফ্রান্সিস অমনি উঠে দাঁড়াল। বলল–হ্যারি চলো হ্যারল্ডের জাহাজে যাবো। কিছু কাজ বাকি আছে।
কিন্তু বন্ধুরা তো এখনই এখানে নামতে চাইছে। শহরটা ঘুরেফিরে–হ্যাঁ কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ফ্রান্সিস বলল”উঁহু, এখন না। বাকি কাজগুলো সেরে তারপর।
দু’জনে ডেক উঠে এল। দেখল–শাঙ্কোরা অনেকে দল বেঁধে রেলিং ধরে দোরস্তাদ শহরের দিকে আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
–শাঙ্কো শোনো। ফ্রান্সিস ডাকল। শাঙ্কো এগিয়ে এল।
-যাও। হ্যারল্ডের জাহাজের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা কেটে দাও। আর ওদের জাহাজ চালককে বলো ওদের জাহাজটাকেবন্দরে ভেড়ায়। পাটাতন ফেলো আমরা ওদের জাহাজে যাবো। ফ্রান্সিস চলল। শাঙ্কো চলে গেল। জামার তলা থেকে ওর ছোরাটা বের করে বাঁধা দড়িটা কেটে দিল। হ্যারল্ডের জাহাজ চালককে ডেকে–ওদের জাহাজের পাশেই জাহাজ ভেড়াতে বলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজ থেকে নেমে পাতা পাটাতন দিয়ে হ্যারল্ডের জাহাজে গিয়ে উঠল। দেখল ইংরেজ বন্দীরা খুব উৎসাহ নিয়ে জাহাজের রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের কাছে তো এটা নতুন দেশ। কিন্তু হ্যারল্ডের লুঠেরা সঙ্গীরা চুপ করে ডেকে বসে আছে। ওদের কাছে এটা নতুন জায়গা নয়। এর আগেও এখানে এসেছে ওরা। মাস কয়েক আগেও ওরা এই বন্দর থেকেই ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিল। একজনের হাতে কাঁধে কাপড়ের পট্টি বাঁধা দেখা গেল। তরোয়ালের লড়াইয়ের সময় কেটে ছড়ে যাওয়া ওরা গায়ে মাখে না। সমুদ্রের লবণাক্ত জলই এসবের ভালো ওষুধ। বেশি কেটে গেলে বেশি রক্তপাত হলে তবেই সঙ্গী বৈদ্যরা চিকিৎসা করে ওষুধ দেয়। ভাইকিংদের ক্ষেত্রেও এই রীতিই চলে আসছে।
