ক্রেভান, ঐ নিরুদ্দিষ্ট ধনভাণ্ডারের খোঁজ করতে গেলে আপনার সাহায্য ছাড়া এক পাও এগোনো যাবেনা। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে। কাজের শেষে আপনাকে আমরা বিরকায় পৌঁছে দেব।
কতদিন আগের কথা। কীভাবে কোথায় পড়ে আছে সেই ধনভাণ্ডার। এখন কি আর সেটার হদিস পাবে?
আগে তো এরকম গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করেছি। এবারও দেখি চেষ্টা করে। এখন আপনার শরীর কেমন? ফ্রান্সিস বলল।
প্রায় সুস্থ। একটু আগেই হেঁটে দেখলাম। শরীরটা একটু কাঁপছে বটে তবে মনে হয় দু’একদিনের মধ্যেই সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারব।
আমি সেটাই চাই। স্লাভিয়ায় গিয়ে আপনাকে তো আমার সঙ্গে একটু হাঁটাহাঁটি করতেই হবে। পারবেন তো?
মনে হয় পারব।
ঠিক আছে। শুয়ে পড়ুন। বিশ্রাম করুন। ভালো কথা, দোরস্তাদ বন্দরটা ঠিক কোনদিকে পড়বে?
উত্তর-পশ্চিম দিকে কোনাকুনি।
হ্যারি, ফ্লেজারকে ঐ দিকেই জাহাজ চালাতে বলো।
আচ্ছা। হ্যারি উঠে চলে গেল। তখনই মারিয়া ঢুকল। বলল, সোনা-রুপোর গয়না টয়নাও আছে দেখলাম।
হ্যাঁ। ভক্তরা মঠে, গির্জায় মূল্যবান জিনিস যীশুর নামে উৎসর্গ করে থাকে। এটা তো একদিনের ব্যাপার নয়। দীর্ঘদিন চলে আসছে। সঞ্চিত হয়েছে। আচ্ছা ক্রেভান, স্লাভিয়া তো একটা গ্রাম?
হ্যাঁ, খাঁড়ি থেকে উঠে যাওয়া ঢালের গায়ে। ক্রেভান বলল।
ভালো কথা। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল, আচ্ছা, রাজা ম্যাগনামের পাণ্ডুলিপিটা কি হ্যারল্ড নষ্ট করে ফেলেছিল?
বলতে পারব না। তবে আমার তো পড়ে, পড়ে মুখস্থ হয়ে গেছে।
উঁহু। ঐ পাণ্ডুলিপিটা খুঁজতে হবে। ওটা পেলে কিছু না কিছু সূত্র পাব। ফ্রান্সিস দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মারিয়া ক্রেভানকে ওষুধ খাওয়াতে বসল।
হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস হ্যারল্ডের জাহাজে এল। দেখল হ্যারল্ডের নিরস্ত্র সঙ্গীরা ও যারা বন্দী ছিল তারাও কয়েকজন ডেকের এখানে-ওখানে বসে আছে।
সিঁড়ি দিয়ে দুজনে নীচে নেমে এল। প্রথমেই হ্যারল্ডের কেবিনে গেল। খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় দেখল ঘরটা বেশ সাজানো-গোছানো। একপাশে দামি পোশাক-টোশাক গুছিয়ে রাখা। বিছানাটা দামি চাদরে ঢাকা। বোঝা গেল হ্যারল্ড একটু শৌখিন ছিল। একপাশে কয়েকটা মরক্কো চামড়ার ঝোলানো ব্যাগ। ফ্রান্সিস ব্যাগগুলো খুলতে লাগল। হ্যারিও হাত লাগাল। কাগজপত্র বিশেষ কিছু পেল না। কাপড় টাপড়, সোনার কাজ করা কোমরবন্ধনী, এসব পেল। সব কটা ঝোলাই দেখা হল। সেই ছেঁড়া পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল না।
ফ্রান্সিস, মনে হয় হ্যারল্ড সেটা বেছে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল। হ্যারি বলল।
উঁহু। হ্যারল্ডের লক্ষ্য ছিল দোরস্তাদ বন্দরের পাশের খাঁড়ি দিয়ে স্লাভিয়া যাওয়া। ঐ পাণ্ডুলিপি আর ক্রেনের সাহায্যে রাজা ম্যাগনামের নিরুদ্দিষ্ট ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে। আরো সম্পদ চাই, আরো ঐশ্বর্য। এ বড় সাংঘাতিক তৃষ্ণা। ফ্রান্সিস আবছা আলোয় চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল। হঠাৎ ও খুব অস্পষ্ট দেখল, একেবারে নীচে কাঠের কিছুটা চৌকোনো কাঠ উঁচু হয়ে আছে। চামড়ার ঝোলাগুলো সরিয়ে আনতে ওটা দেখা গেল। ফ্রান্সিস দ্রুত এগিয়ে এসে উবু হয়ে বসল। উঁচু হওয়া কাঠটা টানতেই খুলে এল। দেখা গেল কারুকাজ করা একটা চৌকো চামড়ার থলিমতো। ফ্রান্সিস থলিটা নিয়ে হ্যারির কাছে এল। হ্যারিও থলিটা দেখে অবাক হল। ফ্রান্সিস থলিটা খুলল। কাগজের মতো পাতলা ভাঁজ করা দুটো চামড়া। একটা খুব পুরোনো। বিবর্ণ। অন্যটা পরিষ্কার। ফ্রান্সিস দুটোই হ্যারিকে দিয়ে বলল, দ্যাখো তো? হ্যারি প্রথমে পরিষ্কার চামড়াটার ভাঁজ খুলে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ বলে উঠল, ফ্রান্সিস, এটা একটা হাতে আঁকা মানচিত্র।
কোন দেশের?
দেখছি… লন্ডন। তার মানে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের?
কোনো চিহ্ন দেখছ?
হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ছোট ফুটকি আর ত্রিভুজ মতো।
ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে ভাবল। মাথা তুলে বলে উঠল, গুনে দেখো ফুটকির সংখ্যা কম, ত্রিভুজের সংখ্যা বেশি। একটু দেখেই হ্যারি বলল, ঠিক বলেছ।
সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ত্রিভুজগুলো হল মাঠের চিহ্ন, ফুটকিগুলো গির্জার চিহ্ন। সংখ্যায় গির্জা কমই হবে। হ্যারল্ড আটঘাট বেঁধেই লুঠ করার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল।
হ্যাঁ হ্যাঁ। রউয়েন বন্দরের নাম রয়েছে। যারল্ড ঐ বন্দর থেকেই জাহাজ চালিয়ে ফিরছিল।
এবার অন্যটা দেখো। ভাজ খুলে ঐ বিবর্ণ চামড়াটা দেখতে দেখতে হ্যারি বলল, খুব অস্পষ্ট। আঁকাবাঁকা পুরোনো স্ক্যান্ডিনেভীয় দ্বীপ এটা বুঝতে পারছি কিন্তু পড়তে সময় নি লাগবে। তবে অসম্পূর্ণ। এই দেখো নীচের দিকে ছেঁড়া।
চলো। সব ভালো করে দেখতে হবে।
দুজনে নিজেদের জাহাজে ফিরে এল। ফ্রান্সিস ক্রেভানকে পাণ্ডুলিপিটা দিয়ে বলল, দেখুন তো এটাই সেই রাজা ম্যাগনামের পাণ্ডুলিপি কিনা?
ওটা দেখেই ক্রেভান বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই। কিন্তু আরও কিছু পাতা ছিল। আলো জ্বালোদেখি।
অন্ধকার হয়ে এসেছিল। মারিয়া সূর্যাস্ত দেখতে গেছে। হ্যারিই চকমকি পাথর ঘষে মোমবাতিটা জ্বালল। সেই আলোয় চোখ কুঁচকে দু’এক লাইন পড়ে ক্রেভান বলে উঠল, হ্যাঁ, এটাই শেষ পাতা। বাকি পাতাগুলো হ্যারল্ড ছিঁড়ে ফেলেছে। ঠিক বুঝেছিল এই পাতাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
