ওদিকে হ্যারল্ডের সঙ্গীদের বেশ কয়েকজন মারা গেছে। আহতের সংখ্যাও কম না। ফ্রান্সিসের বন্ধুরাও দু’তিনজন আহত হল। একজন মারাও গেল। ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, ভাইসব, লড়াই নয়। হ্যারল্ডের সঙ্গীরা শোনো। হ্যারল্ড মারা গেছে। তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো। আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। হ্যারল্ডের সঙ্গীরাও ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে লড়াই করে জেতা যাবে না। ওরা আস্তে আস্তে তরোয়াল ডেকের ওপর ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগল। ভাইকিং বন্ধুরা তরোয়াল উঁচিয়ে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস ডাকল, হ্যারি–শাঙ্কো। হ্যারি আর শাঙ্কো এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস ওদের নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। দু’পাশের কয়েকটা কেবিন পার হয়ে সেই তালাবন্ধ কয়েদঘরের কাছে এল। বড় তালা ঝুলছে। ফ্রান্সিস ডাকল, শাঙ্কো।
শাঙ্কো এদিক ওদিক খুঁজে একটা বড় হাতুড়ি নিয়ে এল। তারপর প্রচণ্ড জোরে তালাটায় ঘা মারল। তিন-চারটে ঘা পড়তেই তালা ভেঙে ঝুলে পড়ল। ততক্ষণে বন্দীরা এসে গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। শাঙ্কো দু’হাতে ঠেলে দরজা খুলে ফেলল। কাঁচকেঁচ ধাতব শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। প্রায় অন্ধকার ঘর থেকে বন্দীরা বেরিয়ে এল। শাঙ্কো দেখল, বন্দীরা সকলেই বেশ সুস্থ-সবল। তবে পরনের পোশাক শতচ্ছিন্ন। একটু অবাক হয়েই শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, এরা তো ভালোই আছে দেখছি।
সেটাই তো স্বাভাবিক। অসুস্থ ক্রীতদাসকে কে কিনবে? ফ্রান্সিস বলল।
একজন বন্দী বলে উঠল, আমরা খেতে না চাইলে জোর করে খাইয়েছে।
ভাই, তোমরা মুক্ত। যেখানে খুশি যেতে পারো। ফ্রান্সিস বলল।
আমরা ইংল্যান্ডে–আমদের দেশে ফিরে যেতে চাই। কয়েকজন বলল।
বেশ। আমরা দোরস্তাদ বন্দরে যাচ্ছি। ওখানে নেমে তোমাদের দেশে যাওয়ার জাহাজে উঠে চলে যেও। তোমরা ডেকে উঠে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
এবার ফ্রান্সিস ঘরটার চারদিকে তাকাতে লাগল। অন্ধকার ভাবটা অনেকটা সয়ে এসেছে। দেখল, এককোণে কালো কাঠের লম্বাটে সিন্দুকের মতো রয়েছে। তাহলে শাঙ্কো ঠিকই দেখেছিল। সিন্দুকের ডালায় দুটো বড় বড় তালা ঝুলছে। ওটা তো খুলতে হবে। ফ্রান্সিস ডাকল, শাঙ্কো। শাঙ্কো বাইরে থেকে হাতুড়িটা নিয়ে এল। একটা তালায় দমাদম হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল। তালা ভেঙে ছিটকে গেল। অন্যটাও একইভাবে ঘা মেরে ভাঙল। হ্যারি আর ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। হাতুড়ি রেখে শাঙ্কো ডালা ধরে চার পাঁচবার হ্যাঁচকা টান দিল। ডালা নড়ল। ফ্রান্সিসও হাত লাগাল। টেনে দুজনে ডালা খুলল। অন্ধকারেও দেখা গেল অনেক স্বর্ণমুদ্রা ও গয়নাগাটিও রয়েছে। তবে দামি পাথর নেই। একপাশে বেশ কিছু আরবীয় স্বর্ণমুদ্রা, রুপোর বাট।
হ্যারল্ডের লুঠ করা ধনসম্পদ। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
হ্যারল্ড । ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপরশাঙ্কোকে বলল, বিনোলা আর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এসো। এই সিন্দুক আমাদের জাহাজে নিয়ে চলো। শাঙ্কো চলে গেল। বিনোলারা কয়েকজন এল। সিন্দুকটা কাঁধে নিয়ে ওপরে ডেকে উঠে এল। ওপরে এসে ফ্রান্সিস দেখল, ভেন আহতদের ওষুধ দিচ্ছে। ক্ষতস্থান বেঁধে দিচ্ছে মারিয়া। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। কাজ সেরে মারিয়া ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, শাঙ্কোরা কী নিয়ে গেল?
সব বলছি। চলো।
ওরা নিজেদের জাহাজে ফিরে এল। নিজের কেবিনে ঢুকে ফ্রান্সিস মারিয়াকে সব কথা বলল। হ্যারল্ডের লুঠ করা ধনসম্পদের লম্বা সিন্দুকটা শাঙ্কোরা রেখেছিল কোনার দিকে কাঠ, পাল আর যন্ত্রপাতি রাখার জায়গাটাতে। মারিয়া সাগ্রহে সেসব দেখতে ছুটল।
ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া হল। হাতের কাটা জায়গাটায় তখনও রক্ত জমে আছে। শরীরের নানা জায়গায় বিশেষ করে বুকে তরোয়ালের খোঁচা লেগে কেটে গেছে। হ্যারি পাশে বসল। বলল, ভেনকে ডাকব?
না-না। যারা বেশি আহত হয়েছে ভেন তাদের দেখুক। আমি তেমন কিছু আহত হইনি।
এখন কী করবে?
কোন ব্যাপারে?
ঐ সব ধনসম্পদ। ও সবই তো ইংরেজদের নিজেদের দেশের। ওদেরই দিয়ে দাও। ওদের দেশের সম্পদ ওরা নিয়ে যাক। হ্যারি বলল।
হ্যারি, ফ্রান্সিস হেসে বলল, কথাটা কি খুব ভেবে বললে?
কেন বলো তো?
বিনা পরিশ্রমে পাওয়া ধনসম্পদের লোভ বড় সাংঘাতিক। ঐ ধনসম্পদ নিয়ে যে জাহাজে চড়ে ওরা দেশে ফিরবে সেই জাহাজে মাঝসমুদ্রেই ওদের মধ্যে খুনোখুনি শুরু হয়ে যাবে। তাতে অন্য যাত্রীরাও জড়িয়ে পড়বে। তা ছাড়া সত্যিকারের দাবিদার কোন মঠ বা গির্জা তা কে খুঁজে বের করবে?
হ্যারি একটু চুপ করে থেকে বলল, তোমার যুক্তি অকাট্য, আমি অত ভেবে বলিনি। পাশে শুয়ে থাকা ক্রেভান এবার আস্তে আস্তে উঠে বসল। বলল, তোমার বন্ধুদের মুখে সব শুনলাম। দোরস্তাদ বন্দরে আমাকে নামিয়ে দিও। ওখান থেকেই হেঁটে বিরকা চলে যাব।
কিন্তু স্লাভিয়ার রাজা ম্যাগনামের নিরুদ্দিষ্ট ধনভাণ্ডার–তার কী হবে? ফ্রান্সিস বলল।
ওটার ওপর আমার আর বিন্দুমাত্র লোভ নেই। তুমি কি ঐ ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে যাবে?
অবশ্যই যাব।
অনেক ধনসম্পদ তো পেলে। আর কেন? ক্রেভান একটু বিরক্তির সুরেই বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, এই ধনসম্পদ সব আমাদের রাজাকে দিয়ে দেব। উনি প্রজাদের কল্যাণের কাজে লাগাবেন। ক্রেভান একটু অবাক হল। ফ্রান্সিসকে সে আর পাঁচজন মানুষের মতোই অর্থলোভী ভেবেছিল।
