ক্রেভান বলেছে, ও ইচ্ছে করে কম খেত। কারণ ও মরে যেতে চেয়েছিল।
বলেছিলাম না পাগল। আর কী বলেছে ও?
আপনারা ব্যবসায়ী সেজে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তারপর ওখানকার মঠ- গির্জার সঞ্চিত ধনৈশ্বর্য লুঠ করে এনেছেন। নরহত্যা, অত্যাচার
বদ্ধ পাগল। বলেছিলাম না। হ্যারল্ড চড়া গলায় বলে উঠল।
শুধু তাই নয়, আরবীয় ধনী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবেন বলে ক্রীতদাসের মতো ইংরেজদের বন্দী করে এনেছেন।
পাগলের প্রলাপ। হ্যারল্ড হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, আপনি ভালো করে দেখুন আমরা সশস্ত্র।
আমি আপনাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করছি। কথাটা বলে ফ্রান্সিস হাত বাড়াল, হ্যারি তরোয়ালটা দাও। দুজনের কথা চলতে চলতে ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে কেউ ভাবেনি এক ফ্রান্সিস ছাড়া।
ফ্রান্সিস, শান্ত হও, ভয়ার্ত গলায় মারিয়া বলে উঠল।
কাঁপা কাঁপা গলায় ক্রেভান বলল, ফ্রান্সিস, আমার জন্যে
শুধু আপনার জন্যে নয়। সমস্ত ভাইকিং জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে আমাকে লড়তেই হবে। হ্যারি ততক্ষণে ফ্রান্সিসের বিছানার নীচ থেকে ফ্রান্সিসের তরোয়ালটা নিয়ে এসেছে। হ্যারল্ড কেমন নিরীহের মতো বলল, দেখুন, এইসব লড়াই, রক্তপাত, আমি পছন্দ করি না। তার চেয়ে আপনি আমার জাহাজে আসুন, সব নিজের চোখে দেখবেন। ক্রেভান কতবড় মিথ্যেবাদী সেটাও বুঝতে পারবেন।
বেশ চলুন। কিন্তু আপনাকে নিরস্ত্র যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ভালো কথা। হ্যারল্ড কোমরবন্ধনী থেকে তরোয়াল খুলে একজন সঙ্গীর হাতে দিল। তারপর বলল, কিন্তু আপনাকৈ একা যেতে হবে। তরোয়াল রেখে দিন।
বেশ। তাই যাব। ফ্রান্সিস মাথা তুলে বলল। তারপর হ্যারিকে তরোয়ালটা দিয়ে দিল।
সবার আগে হ্যারল্ড চলল সিঁড়ির দিকে। শাঙ্কো বন্ধু কয়েকজনকে নিয়ে তার আগেই দ্রুত ডেকে উঠে এল। শাঙ্কোর মনে তখন আশঙ্কা। হাঙরের কামড়ে আহত ফ্রান্সিস এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। তরোয়ালের লড়াইয়ে আগের মতো বিদুৎগতিতে আক্রমণ করতে পারে না। দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামলে ফ্রান্সিস জয়ী হলেও অক্ষত থাকবে না। ও নিঃশব্দে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে অস্ত্রঘরে চলে এল। ডেকে উঠে এল সবাই। জাহাজ দুটো গায়ে গায়ে লাগানো রয়েছে। প্রথমে হ্যারল্ডের সঙ্গীরা লাফ দিয়ে ওদের জাহাজে গিয়ে উঠল। পেছনে হ্যারল্ড আর ফ্রান্সিস। হ্যারল্ড ডেকের চারদিক হাত ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলল, দেখুন, কোথায় ধনসম্পদ? কোথায় বন্দী ক্রীতদাস?
ও সব ডেকে কেউ সাজিয়ে রাখে না। ফ্রান্সিস ক্রুদ্ধ হলেও মৃদু হাসল। বলল, সিঁড়ি দিয়ে নীচে চলুন। সিঁড়ির ধারে এসে হ্যারল্ড ফিরে দাঁড়াল। ওর সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল, আগে তোরা নেমে যা। যে সঙ্গীটি হ্যারল্ডের তরোয়ালটার হাতল ধরে ঝুলিয়ে আসছিল সে এগিয়ে এল।
ফ্রান্সিস বলে উঠল, সবাই তরোয়াল ডেকে রেখে যাবে। ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে না হতেই হ্যারল্ড দ্রুত হাতে সঙ্গীর হাত থেকে তরোয়ালটা ছিনিয়ে নিল। সতর্ক ফ্রান্সিস শরীরের এক ঝটকায় কয়েক পা পিছিয়ে এল। কিন্তু একটু কমজোরি বাঁ পাটার জন্যে ভারসাম্য রাখতে পারল না। ডেকের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। মুখে ক্রুর হাসি হত্যাকারীর জ্বলন্ত চোখ নিয়ে হ্যারল্ড একলাফে উদ্যত তরোয়াল হাতে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস গড়িয়ে গেল। বিদুৎবেগে পাক খেয়ে ছুটে এল শাঙ্কোর ছোঁড়া ছোরাটা। হ্যারল্ডের বুকে লাগল না। ওর ডান কাঁধ ছুঁয়ে গেল। এইটুকু বাধাতেই হ্যারল্ড আর ফ্রান্সিসের শরীর লক্ষ্য করে তরোয়াল চালাতে পারল না। ও একটু থমকাল।
ততক্ষণ হ্যারিও জোরগলায় ‘ফ্রান্সিস’ ডাক দিয়ে তার দিকে তরোয়াল ছুঁড়ে দিয়েছে। ফ্রান্সিস দ্রুত মুখ তুলে তরোয়ালের ফলাটা ধরে ফেলল। ওর হাতের তালু ও আঙুল কিছুটা কেটে গেল। রক্ত বেরিয়ে এল। তরোয়ালের হাতলটা ধরে ও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। কাঁধে ছোরার ক্ষত নিয়ে হ্যারল্ড তরোয়াল উঁচিয়ে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তরোয়ালের প্রথম মারটা ঠেকিয়ে ফ্রান্সিস একটু পিছিয়ে এল। তারপর রুখে দাঁড়াল। শুরু হল দুজনের লড়াই। হ্যারল্ড তরোয়াল চালাতে চালাতে চড়া গলায় বলে উঠল, সবাইকে ডাকো। খতম করো এগুলোকে। ওদিকে শাঙ্কো, বিনোলারা খোলা তরোয়াল হাতে উঠে এসেছে হ্যারল্ডের জাহাজে। হ্যারল্ডের বাকি সঙ্গীরাও কেবিন থেকে ডেকে উঠে এসেছে।
লড়াই শুরু হয়ে গেল। অল্পক্ষশলড়াইচালিয়েইহ্যারল্ডেরদলের যোদ্ধারা বুঝল, ফ্রান্সিসের বন্ধুরা তরোয়ালের লড়াইয়ে কতটা নিপুণ, কত অভিজ্ঞ। ওরা আহত হতে লাগল। কমজোরি পাটা নিয়ে ফ্রান্সিসের লড়াই চালাতে অসুবিধেই হচ্ছিল। তবু ফ্রান্সিস হ্যারল্ডের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে তরোয়াল চালাতে লাগল। ও এটা বুঝতে পারল হ্যারল্ডের উদ্দেশ্য দলপতি হিসেবে ফ্রান্সিসকে মারাত্মক আহত করে জাহাজে চড়ে পালানো। স্লাভিয়া গিয়ে রাজা ম্যাগনামের নিরুদ্দিষ্ট ধনভাণ্ডারের উদ্ধারের চেষ্টা করবে–এটা ও ভেবেছিল। কিন্তু যার সাহায্য ছাড়া সেটা সম্ভব নয় সেই ক্রেভানকে তো পাওয়া যাবে না। ফ্রান্সিস ততক্ষণে ভেবে নিয়েছে হ্যারল্ডকে হত্যা করতে হবে। ওকে বাঁচিয়ে রাখা চলবে না। ও মারা গেলে ওরসঙ্গীরা সহজেই পরাজয় স্বীকার করবে। বেশি রক্তপাত এড়ানো যাবে। কাজেইফ্রান্সিস হ্যারল্ডের তরোয়ালের মার ঠেকাতে লাগল। হ্যারল্ডকে ক্লান্ত করতে লাগল। একসময় হ্যারল্ড বেশ ক্লান্ত হল। জোরে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস সেই সুযোগ কাজে লাগাল। হঠাই দ্রুত দু’পা এগিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে তরোয়াল চালাল। হ্যারল্ড সেই মার ঠেকাল বটে কিন্তু ওর হাতের তরোয়াল নেমে এল। ফ্রান্সিস এই সুযোগ ছাড়ল না। হ্যারাল্ডের বুকেতরোয়াল বিঁধিয়ে দিল। হ্যারাল্ডের মুখ থেকে কাতরধ্বনি ছিটকে গেল। ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দু’হাতে বুকে বেঁধা তরোয়াল খুলে আনতে চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। কাত হয়ে ডেকের ওপর গড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। আস্তে আস্তে ওর দেহ স্থিব হয়ে গেল।
