এই যে বুড়ো, শুনলাম ভালো আছ। কাষ্ঠহাসি হেসে বলল হ্যারল্ড। ক্রেভান কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস তখন ভাবছে ক্রেভান এতটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল কেন? নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর ব্যাপার আছে।
ফ্রান্সিস বলল, তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। আমাদের বৈদ্য বলছিল, দু’চার দিন না গেলে ঠিক বোঝা যাবে না।
না-না। আর এখানে ফেলে রাখা যায় না।
ঠিক আছে। বৈদ্য ভেন কী বলে দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
বসতে পারছে? দাঁড়াতে পারছে? হ্যারল্ড জানতে চাইল।
না, এসে অব্দি তো শুয়েই থাকেন। ফ্রান্সিস বলল।
ও। কাল সকালে খবর নিতে আসব। দেখি কেমন থাকে।
হঠাৎই ক্রেভান বলতে লাগল, কালো অন্ধকার আকাশ… পাথরের মতো জমাট মেঘ… বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে… ঝড় ধেয়ে এল… প্রচণ্ড ঝড়… হাল ভেঙে গেল।
ঐ শুনুন। একে পাগল ছাড়া কী বলবেন? যত আজগুবি প্রলাপ। বিশ্বাস করবেন না ওর কথা। হ্যারল্ড হাত নেড়ে বলল।
বিকেল হল। ক্রেভানকে ওষুধ খাইয়ে মারিয়া সূৰ্য্যাস্ত দেখতে চলে গেল। হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বলল, খুব সময়ে এসেছ। এবার চোখ বুজে থাকা ক্রেভানের মুখের ওপর ঝুঁকে ফ্রান্সিস ডাল, ক্রেভান শুনছেন? ক্রেভান চোখ খুলে তাকাল।
আপনার যদি কষ্ট না হয় তাহলে আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেবেন?
বলো।
হ্যারল্ডের সঙ্গে আপনার কীভাবে পরিচয় হল? হ্যারল্ডকে আপনি এত ভয় পান কেন? মরে যেতে চান কেন?
ক্রেভান একটুচুপ করে থেকে বলল, সব বলছি সংক্ষেপে, তাই থেকে বুঝেনাও। তারপর বলতেলাগল, অনেক বছর এদেশও-দেশ ঘুরে বয়েসের ভারেআর পারছিলাম না। জাহাজ থেকে নামলাম ঐ দোরস্তাদ বন্দরে। মনে পড়ে গেল সেইইতিহাসবিদের বইয়ের কথা। লোভ হল, ধনসম্পত্তিরতৃষ্ণা। দেখিইনা রাজাম্যাগনামেরডুবে যাওয়া জাহাজেরহদিসপাইকিনা। স্লাভিয়া গেলাম। খোঁজ–খোঁজ। কয়েক বছর ধরে খুঁজছি। একটা কৃষকের বাড়িতে গেলাম, যত্ন করে রেখেছিল একপাটিজুতো। দেখেই বুঝেছিলাম। সোনার কাজছিল, দামি পাথরটাথর বসানোছিল। রাজাদের জুতোই। বুঝলাম, রাজা ম্যাগনামের জাহাজ পাশের খাঁড়ি এইস্লাভিয়া পর্যন্ত এসেছিল। খাঁড়ি, খাঁড়ির আশপাশ, দু’পাশের এলাকা চষে বেড়ালাম। কাটল বেশকিছুদিন। মনে পড়ল, বইয়ের লেখা…ইংল্যান্ডের রউয়েন বন্দর থেকেলয়েরউপত্যকারমঠ গির্জার ধন সম্পদ… লুঠ…হত্যা। এন্টু থামল ক্রেভান।
আপনি লয়ের উপত্যকায় গিয়েছিলেন?
ঠিক ধরেছ। দোরস্তাদ বন্দরে হ্যারল্ডের দলের সঙ্গে পরিচয়। ব্যবসায়ী, কিন্তু লয়ের উপত্যকায় পৌঁছে স্বমূর্তি। লুঠ, হত্যা। দস্যুর দল, পালাতে পারলাম না। হ্যারল্ডকে রাজা ম্যাগনামের জাহাজডুবি, খাঁড়িতে লুণ্ঠিত ধনসম্পদের কথা সব বলেছিলাম। ওরা আমাকে বন্দী করল। কী অত্যাচার! মরতে চাইলাম, মরতে দিল না। ক্রেভান দম নেবার জন্যে থামল।
মনে হয় আরো কিছু লোক বন্দী।
হ্যাঁ, ক্রীতদাস ওরা। ধনী মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবে। লুণ্ঠিত সম্পদ, বিক্রির দাম কত কত রিকা, আরবীয় স্বর্ণমুদ্রা–
এবার ফ্রান্সিস চমকে উঠল-ক্রীতদাস।
ফ্রান্সিস, হ্যারল্ড কী জঘন্য মানুষ! হ্যারি বলে উঠল।
ক্রেভান বলতে লাগল, স্লাভিয়ার সেই বাড়িতে বহু পুরোনো পাণ্ডুলিপি–রাজা ম্যাগনামের লেখা পেয়েছিলাম। হ্যারল্ডকে দেখিয়েছিলাম। সেটাই কাল হল। ছিনিয়ে নিল। অনেক কষ্টে পড়ে পড়ে মুখস্থ করল। কিন্তু অসম্পূর্ণ। হঠাৎ ছিঁড়ে গেছে।
সেই পাণ্ডুলিপির সবটা মনে আছে আপনার? ফ্রান্সিস তখন উত্তেজিত। সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
হ্যাঁ ।
বলুন।
প্রথমে লুঠপাটের কথা। সেসব থাক, দরকারি জায়গাটা বলছি। একটু থেমে বলতে লাগল, ইংল্যান্ডবাসীরা জাহাজ ডোবাল। একটা জাহাজেই ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসতে লাগলাম। লক্ষ্য দোরস্তাদ বন্দর। ব্যবসায়ীর পোশাক ছেড়ে লুকোনো রাজপরিচ্ছদ পরলাম। জাহাজ চলল তীরবেগে। দু’রাত জেগে আনন্দ হৈ-হল্লা নাচগান চলল। দোরস্তাদ বন্দরের কাছে এলাম। আবার একটু থামল ক্রেভান। তারপর বলল, ঝড় শুরু হল। প্রচণ্ড ঝড়। ফের বিরতি। তারপর বলল, এখান থেকে অক্ষর-গুলো আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে পাঠোদ্ধার করেছি, আমি লিখে চলেছি, কী দেখছিলিখছি। বুঝলাম খাঁড়িতে ঢুকে পড়েছি। মুষলধারে বৃষ্টি। দু’পাশেটাল খেতে খেতে… আর লিখতে পারছি না, প্রচণ্ড ধাক্কা। কে ঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে বলল, সামনে, সাদাটে–ক্রেভান বলল, এখানেই পাণ্ডুলিপির শেষ, তার পরই ছেঁড়া। জানি না আরও কিছু লেখা ছিল কিনা।
ফ্রান্সিস এতক্ষণ গভীর মনোযোগের সঙ্গে ক্রেভানের কথা শুনছিল। এবার বলল, বোঝা গেল রাজা ম্যাগনামের জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। আপনার কি মনে হয় রাজা ম্যাগনামের ডুবে-যাওয়া জাহাজে ধনৈশ্বর্য ছিল?
অবশ্যই। শুধু খুঁজে উদ্ধার করা। ক্রেভান বলল।
আমাকে আরও কিছু জানতে হবে। তার জন্য স্লাভিয়ার গ্রামে যেতে হবে। তার আগে আপনাকে আর হ্যারল্ডের জাহাজে বন্দী ক্রীতদাসের মুক্ত করতে হবে।
ক্রেভান ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল, হ্যারল্ড সাংঘাতিক লোক নিষ্ঠুর, নৃশংস। তোমাদের হত্যা—
ফ্রান্সিস তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, দেখা যাক।
হ্যারল্ড পরদিন সকালেই এসে হাজির। সেঁতো হাসি হেসে বলল, অ্যাই বুড়ো খুব আয়েস করেছিস, চল্ এবার।
ফ্রান্সিস দেখল হ্যারল্ড তিন-চারজন সঙ্গী নিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে সোজা হ্যারল্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরস্বরে বলল, ক্রেভান যাবেনা। হ্যারি চমকে উঠে চাপাস্বরে বলে উঠল, ফ্রান্সিস! হ্যারল্ড এরকম কথা বোধহয় আশা করেনি। চোখ কুঁচকে বলল, কেন বলুন তো? ক্রেভান আমাদের সঙ্গেইংল্যান্ডে এসেছে, আমাদের সঙ্গেই ফিরবে।
