দরকার নেই। ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল, উনিই সব করবেন।
এতক্ষণ হ্যারল্ড মারিয়াকে বারবার দেখছিল। কৌতূহল চেপে ছিল। এবার বলল, মানে ইনি কে?
রাজকুমারী মারিয়া, হ্যারি বলল।
কিন্তু উনি রাজকুমারী হয়ে মানে
ও প্রসঙ্গ থাক। ফ্রান্সিস বলে উঠল।
হ্যারল্ড ক্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, বুড়ো, চুপ করে শুয়ে থাকবে। এক্কেবারে আজেবাজে বকবে না। তারপর ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল, মাথায় ছিট আছে, পাগলের মতো বকে। ওর কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না।
হ্যাঁ, আপনি বলেছেন আগে। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারল্ড চলে গেল।
দু’দিন কাটল। এর মধ্যে হ্যারল্ড এসেছে। বারবার একই কথা বলে গেছে, পাগল, ক্ষ্যাপা।
ওষুধ, সেবা-শুশ্রূষায় ক্রেভান অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠল। এর মধ্যে ক্রেভান কখনও পথ্য খাবার সময়, কখনও ঘুমের ঘোরে নানা অসংলগ্ন কথা বলেছে কত দেশ ঘুরলাম… বাড়িছাড়া দেশছাড়া… রাজা ম্যাগনাম…কী সংঘাতিকঝড়… ডুবে গেল…সব ডুবে গেল।
ফ্রান্সিস ভেনকে এসব কথা বলেছে। তারপর জিগ্যেস করেছে, তোমার কি মনে হয় লোকটা পাগল?
ভেন মাথা নেড়ে বলেছে, জ্বরের ঘোরে অনেকে আবোল-তাবোল বকে। ঘুমের মধ্যে কথা বলাও অনেকের অভ্যেস। তবে রোগীর সঙ্গে আমার যা কিছু কথাবার্তা হয়েছে তাতে বুঝেছি, কোনো কারণেই হোক ও খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারছে না। তাই বলে ওকে পাগল বলা যায় না। মনে হয় ওর সঙ্গে নির্দয় আচরণ করা হয়েছে। ভেন ক্রেভানকে দেখে টেখে কিছু জিগ্যেস-টিগ্যেস করে মারিয়াকে নির্দেশ দিয়ে চলে যাবার আগে বলল, রোগী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে।
ভেন বেরিয়ে যেতেই হঠাৎ ক্রেভান বলে উঠল, উঠে বসি।
ফ্রান্সিস দ্রুত এগিয়ে এল। বলল, না না, শুয়ে থাকুন।
ক্রেভান মৃদু হেসে বলল, বদ্ধ ঘরে মেঝেয় শুয়েই তো থাকতাম সবসময়। ইচ্ছে করে খেতাম না। মরতেই চেয়েছিলাম… কিন্তু… ক্রেন থেমে গেল।
ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল, এ তো পাগলের কথা নয়। ও ক্রেভানকে ধরে আস্তে আস্তে বসাল। ক্রেভানের মুখের দিকে তাকাল। বৃদ্ধের চোখে-মুখে বেশ উজ্জ্বলতা। ক্রেভান অল্পক্ষণ বসে থেকে বলল, দাঁড়াব।
না-না, একদিনে এতটা পারবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
পারব। শুধু একটা শর্ত, হ্যারল্ডের হাতে আমাকে ছেড়ে দেবেন না। ক্রেভান কাতর দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল।
কেন বলুন তো?
সে অনেক কথা। অত কথা এক নাগাড়ে বলতে পারব না। আর একটু সুস্থ হলে
ফ্রান্সিস দ্রুত মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়াও ক্রেভানের কথাবার্তা শুনে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
শীগগির হ্যারিকে ডাকো। মারিয়া চমক ভেঙে দ্রুত উঠে গেল। একটু পরেই হ্যারি ছুটে এল।
ক্রেভান বলল, কথা দিন।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার কোনো ক্ষতি আমি হতে দেব না। আমি ফ্রান্সিস। সঙ্গে আমার বীর বন্ধুরা। কোনো অন্যায় অবিচার অত্যাচার আমরা সহ্য করি না।
ক্রেভান একটু থেমে থেমে বলতে শুরু করল
তবে শুনুন। সংক্ষেপে বলি। চিরকাল বাউণ্ডুলে আমি। কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করেছি এদেশ-ওদেশে-নরওয়ে থেকে রাশিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত। একটু থামল ক্রেভান। বলল, জল। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের গ্লাসে জল নিয়ে এল। জল খেয়ে যেন একটু ধাতস্থ হল। তারপর ফের শুরু করল, নরওয়ের রাজবাড়ির গ্রন্থাগারে একটা সূত্র পেয়েছিলাম। পুরোনোকালের এক ইতিহাসবিদের লেখা বই, কাগজের মতো পাতলা চামড়ায়। প্রায় জরাজীর্ণ অবস্থা তার। বইতে ছিল অতীতের এক রাজা ম্যাগনামের কথা। সাতটা জাহাজে দুর্ধর্ষ সব সৈন্যদের নিয়ে সাধারণ পোশাক পরে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। ওদের কাছে এ নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী বলে। ক্রেন থামল। একটু জিরিয়ে বলতে লাগল, তীরের কাছাকাছি বড় বড় মঠ-গির্জা লুঠ করেছিলেন। নরহত্যা থেকে শুরু করে সব রকম অত্যাচার করেছিলেন। যা হোক ফিরে এলেন জাহাজঘাটায়। নৌযুদ্ধে ইংল্যান্ডের লোকেরা অত্যন্ত দক্ষ। রাজা ম্যাগনামের একটা মাত্র জাহাজ ডুবে গেলনা। সেই জাহাজেই প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে আসছে যে বন্দরে, হ্যারল্ডের জাহাজও যাবে সেই দোরস্তাদ বন্দরে, নোঙর করবে বলে–উঠল প্রচণ্ড ঝড়। জাহাজডুবি হয়ে রাজা ম্যাগনাম মারা গেলেন।
আর সেই ধনসম্পদ? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
সলিল সমাধি।
কোথায়?
উত্তরের খাঁড়িতে। কিন্তু সেই ইতিহাসবিদ সবশেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন রাজা ম্যাগনাম মারা যাননি, যদিও সবাই জানত যে রাজা বেঁচে ফেরেননি।
সেই ইতিহাসবিদ জানলেন কী করে?
তিনি ফুটনোটে এই কথাগুলি খুব অস্পষ্ট অক্ষরে লিখেছিলেন, ঠিক এই কথা– সেই খাঁড়ির ধারে, স্লাভিয়া গিয়েছিলাম, একপাটি জুতো পেয়েছিলাম, দামি, অভিজাত–। ব্যস–পরের পাতা নেই। হয়তো কিছু লেখা ছিল। ক্রেন থামল। একটু হাঁপাতে লাগল। দম নিয়ে বলল, একটু ধরো তো উঠে দাঁড়াব। পায়ের জোর দেখি, পালাতে হলে–1 ফ্রান্সিস আর হ্যারি এসে দু’দিক থেকে ক্রেভানকে ধরল। আস্তে আস্তে উঠিয়ে দাঁড় করাল। ক্রেভানের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। সে পা ফেলে দু’তিন পা হাঁটল। হেসে বলল, একটু জোর পাচ্ছি। তখনই দরজার বাইরে শাঙ্কোর গলা শোনা গেল, হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু ভালো আছেন।
হুঁ। তাহলে তো নিয়ে যেতে হয়। হ্যারল্ডের গলা। হ্যারল্ডের গলা শোনামাত্র আতঙ্কে ক্রেভানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ফ্রান্সিসদের হাত ছাড়িয়ে এক ছুটে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। দ্রুত হাতে কম্বলটা টেনে নিল। হ্যারল্ড ঢুকল।
