এটা তো স্পষ্ট হয়ে গেল যে হ্যারল্ডরা ব্যবসায়ী নয়। তবে এও হতে পারে শৃঙ্খলা ভাঙায় বা দলবিরোধী কিছু করেছিল বলে ওদের বন্দী করে রাখা হয়েছে।
উঁহু। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। হ্যারি, ব্যাপারটা অত সহজ সরল নয়। ভুলে যেও না ইংল্যান্ডে গিয়ে আমাদের দেশের কিছু দুরাচারী মানুষ লুঠপাট করে ধনসম্পদ নিয়ে এসেছে। আমরা দুর্নামের ভাগী হয়েছি। কাজেই খুব পরিষ্কার হ্যারল্ডরা ডাকাতের দল। যারা এসবের বিরোধিতা করেছে তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। এবার শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, সিন্দুকের মতো কিছু দেখেছ বলছিলে।
হ্যাঁ । অন্ধকারে তো স্পষ্ট দেখতে পাইনি, খুব আবছা দেখেছি।
লুঠের ধনসম্পদ ওটাতেই রাখা আছে, হ্যারি বলল।
হুঁ। এখন আমরা কী করব? ফ্রান্সিস একটু চিন্তিত স্বরে বলল।
চুপ করে থাকব। দোরস্তাদ বন্দরে নেমে ওদের রাজার সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দেব, হ্যারি বলল।
অত সহজে হবে না। ডাকাত লুঠেরার দল। বিপদ আঁচ করতে পারলে আমাদের মেরে ফেলতেও এদের হাত কাঁপবে না। এবার আমাদের সাবধান হবার সময় এসেছে।
উঁহু, বেশি সাবধান হতে গেলে আমাদের আচার-আচরণে, কথাবার্তায় অস্বাভাবিকতা এসে যাবে। জানলাম শুধু আমরা চারজন। তারপরমারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ঘটনাক্রমে তুমিও সব জানলে। সাবধান, এইসব নিয়ে কারো সঙ্গে কোনো কথা বলবে না।
হ্যারিরা চলে গেল।
দিন দুয়েক পরের কথা। সকালের দিকে হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, হ্যারল্ড তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। বলছে বিশেষ দরকার।
দুজনে ডেকে উঠে এল। দেখা গেল হ্যারল্ডের জাহাজটা ঘুরিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে লাগানো হয়েছে। ঐ জাহাজের রেলিং ধরে হ্যারল্ড দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস, হ্যারি এগিয়ে গিয়ে হ্যারল্ডের মুখোমুখি দাঁড়াল। হ্যারল্ড বলল, খুব সমস্যায় পড়েছি। আপনাদের জাহাজে কোনো বৈদ্য আছে?
হ্যাঁ। কেন বলুন তো?
আমাদের একজন সঙ্গী বৃদ্ধ। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। যদি আপনাদের বৈদ্য তাকে দেখে ওষুধ-টষুধের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে খুবই উপকার হয়। হ্যারল্ড বলল।
মুশকিল হয়েছে আমাদের বৈদ্য ভেনও প্রৌঢ়। রোগী দেখতে হবে, ওষুধ দিতে হবে, ওষুধে কাজ হচ্ছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে। ভেন তো বারবার আপনাদের জাহাজে যাওয়া-আসা করতে পারবে না। তাও এই মাঝ সমুদ্রে। তার চেয়ে ভালো হয় আপনার রোগী আমাদের জাহাজে এসে থাকুক। চিকিৎসা সেবা-শুশ্রূষার কোনো গাফিলতি হবে না, কথা দিচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারল্ড কিছুক্ষণ কী ভাবল। তারপর বলল, হুঁ। এছাড়া তো উপায় দেখছি না। তবে একটা কথা বলছি, বৃদ্ধটি মানে ক্রেভান বেশ ছিটগ্রস্ত। প্রায় পাগলই। আজেবাজে বকে। ওর কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না। যত আজগুবি কথাবার্তা।
বেশ, ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে ক্রেভানকে পৌঁছে দিচ্ছি আপনাদের জাহাজে।
ঠিক আছে। ফ্রান্সিস, শাঙ্কো, সিনাত্রা আর দু’একজন বন্ধুকে ডাকল। হ্যারল্ডের জাহাজের কয়েকজন বৃদ্ধ ক্রেভানকে কাঁধে করে রেলিঙের ধারে নিয়ে এল। শাঙ্কোরা এগিয়ে গেল। ওরা ক্রেভানকে শোয়া অবস্থাতেই আস্তে আস্তে এগিয়ে দিল শাঙ্কোদের দিকে। শাঙ্কোরা ক্রেভানকে ধরে ধরে নিয়ে এল।
শাঙ্কো, ক্রেভানকে আমার কেবিনে নিয়ে যাও আর ভেনকে আসতে বলল। শাঙ্কোদের কাঁধে ক্রেন দু’চোখ বুজে শুয়ে আছে। রোগজীর্ণ চোখমুখ। সারা মুখে পাকা দাড়ি গোঁফ। মাথার ঝাঁকড়া চুলও সাদা ধবধবে। শাঙ্কোরা ক্রেভানকে নিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে নিজের কেবিনে এল। ক্রেভানকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সিস ক্রেভানের কাছে এল। দু’চোখ বোজা। শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস ওর মুখে কাছে মুখ নিয়ে ডাকল, ক্রেভান। ক্রেন চুপ। ফ্রান্সিস আবার ডাল, ক্রেভান, শুনছেন? ক্রেভান এবার আস্তে আস্তে চোখ খুলল।
কী কষ্ট আপনার?
বড্ড–দুর্বল। ক্রেভান মৃদুস্বরে টেনে টেনে বলল।
আমাদের বৈদ্য ভেন ওষুধ দেবে। ও খুব ভালো বৈদ্য। ওষুধ খাবেন। মারিয়া আপনার সেবা-শুশ্রুষর করবে। কয়েকদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাবেন।
তখনই ভেন ওর ওষুধের বোয়াম নিয়ে এল। ক্রেভানের পাশে বসল। চোখের নীচে টেনে, কপালে গলায় হাত দিয়ে যেমন করে রোগী পরীক্ষা করে তেমনি করে পরীক্ষা করল। ভেন জিগ্যেস করল, দেখছি জ্বর আছে। কদিন জ্বর হয়েছে আপনার?
জানি না, তবে সাত-আট দিন–বেশিও–
হুঁ। আর কী কষ্ট?
মাথায়–অসহ্য-ব্য–আথা। বলতে বলতে ক্রেভানের শরীর খুব জোরে কেঁপে উঠল। বুকেও ককষ্ট। ক্রেভান খুব আস্তে আস্তে বলল।
ভেন ওর ঝোলা থেকে বোয়ামগুলো বের করে পাথরের বাটিতে কীসের শেকড়ের টুকরো নিয়ে ঘষতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেনের ওষুধ তৈরি হয়ে গেল। ভেন এবার মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনিই তো সেবা-শুশ্রূষা করবেন। ওষুধ-পথ্যি বুঝে নিন। ভেন মারিয়াকে সব বুঝিয়ে দিল।
কেমন দেখলে ভেন? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জানতে চাইল।
রোগীর শরীরের ওপর দিয়ে খুব ধকল গেছে। ভালো খাওয়া জোটেনি, ঠাণ্ডা লেগে বুকে সাংঘাতিক কফ জমেছে। বলতে গেলে কোনো চিকিৎসাই হয়নি। সুস্থ হতে সময় লাগবে। ভেন বলল।
কিছুক্ষণ পরে হ্যারল্ড ফ্রান্সিসের কেবিনে এল। বৈদ্য কেমন দেখল, ওষুধ দিয়েছে। কিনা, কবে নাগাদ সুস্থ হবে এসব কথা জিগ্যেস করল। তারপর বলল, সেবা-শুশ্রূষার জন্যে লোক পাঠাব?
