কিন্তু বেশ ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে না? যদি সত্যি ওরা দস্যু হয়? হ্যারি আশঙ্কা প্রকাশ করল।
সবদিক ভেবেই কাজে নামব। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়তে পড়তে বলল।
পরের দিন সন্ধেবেলা ফ্রান্সিস ডেকে উঠে এল। শাঙ্কো মাস্তুলে ঠেসান দিয়ে বসেছিল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর কাছে এল। আস্তে আস্তে বলল, শাঙ্কো, একটা জরুরি কাজ আছে। শোনো। শাঙ্কো উঠে এল। ফ্রান্সিস বলল, ঐ জাহাজের দলপতির নাম হ্যারল্ড। আজ গভীর রাতে ঐ জাহাজে যাবে। লুকিয়ে জাহাজটা ঘুরে ভালোভাবে সবকিছু দেখবে। ওরা যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায়।
তরোয়াল নিয়ে যাব?
না। পরে দরকার পড়লে লড়াই করা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি গেলে ভালো হত না?
না। যদি ধরা পড়ে যাও তাহলে বলতে পারবে, আমাদের জাহাজে শুয়ে বড় অসুবিধে হচ্ছে তাই দেখতে এসেছিলাম আমাদের কয়েকজন এখানে এসে রাতটা থাকতে পারব কিনা। তোমাদের দলপতি হিসাবে আমার এই অনুরোধ করাটা ওরা সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। তুমি বললে ওদের কোনো সন্দেহ হবে না।
রাত হল। শাঙ্কো ডেকে এসে হালের কাছে শুয়ে পড়ল। দু’চারজন বন্ধু ওকে ওদের কাছে এসে শুতে বলল। শাঙ্কো গেল না।
আকাশে আধভাঙা চাঁদ অনেকটা উজ্জ্বল। জোর হাওয়া বইছে। রাত বাড়তে লাগল। চাঁদের আলোয় হ্যারল্ডের জাহাজের দিকে ও তাকিয়ে রইল। দেখল, মাস্তুলের ওপর কোনো নজরদার নেই। উঠে বসল। রেলিঙের ধারেও কেউ নেই। ওরা শুয়ে পড়েছে, নিশ্চয়ই। ঘুমুচ্ছে। শাঙ্কো আস্তে আস্তে গড়িয়ে হালের কাছে এল। উঠে দাঁড়াল। হালের এক দড়িদড়া ধরে আস্তে আস্তে সমুদ্রের জলে নামল। যেটুকু আওয়াজ হল বাতাসের শনশন শব্দে ঢাকা পড়ে গেল। ও ডুব সাঁতার দিয়ে হ্যারল্ডের জাহাজের কাছে গিয়ে ভেসে উঠল। হাঁ করে শ্বাস নিল। তারপর হ্যারল্ডের জাহাজের হালের কাছে গেল। দড়িদড়া ধরে নিঃশব্দে জাহাজের ডেকেউঠে এল। দেখল কেউপাহারা দিচ্ছেনা। ডেকেরএখানে-ওখানে দু’তিনজন ঘুমুচ্ছে। শাঙ্কো চারদিকে তাকাল। মাস্তুল-পাল-দড়িদড়া। নজরে পড়ার মতো কিছু নেই। আর পাঁচটা জাহাজে যেমন থাকে। ও নিঃশব্দেসিঁড়িঘরের কাছে এল। তারপর আস্তে আস্তে পা ফেলে নীচে নামল। এখানে-ওখানে বাতি ঝুলছে। দু’পাশের ছোট ছোট কেবিন পার হল। সামনেই একটা ঘর। বেশ বড়। অল্প আলোয় দেখল। সেই ঘরের দরজা লোহার গরাদের। ভিতরে কোনো আলো নেই। গরাদের গায়ে একটা বড় তালা ঝুলছে। শাঙ্কো হামাগুড়ি দিয়ে তালাটার কাছে গেল। উঁকি দিয়ে দেখল, অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বোধহয় ব্যবসার মালপত্র রাখা হয়। তখনই হঠাৎ নিঃশ্বাস ফেলার মৃদু শব্দ শুনল। শাঙ্কো চমকে উঠল। তাহলে ভেতরে মানুষ আছে। স্পষ্ট শুনল কেউ যেন পাশ ফিরল। ও আবার তাকাল। খুব অস্পষ্ট দেখল শুয়ে থাকা মানুষ। ক’জন বুঝল না। কোনায় একটা লম্বাটে সিন্দুকের আভাস। শাঙ্কো বুঝল এটা কয়েদঘর। ও দ্রুত পিছিয়ে এল। তারপর পা টিপে টিপে সিঁড়ির কাছে চলে এল। আস্তে আস্তে সিঁড়ির মাথায় আসতে ও ডেকে শুয়ে থাকা একজনের বিরক্তি ভরা কথা শুনল, অ্যাই, চাদরটা নিয়েছিস কেন?
বেশ করেছি। অন্যজনের ঘুমজড়িত কণ্ঠস্বর। শাঙ্কো মাথাতুলতে গিয়েইনামিয়ে ফেলল। তবু যে লোক্টা ঘুম ভেঙে উঠে বসেছিল সে ওর মাথাটা দেখে ফেলেছে। সতর্ক কণ্ঠে বেশ জোর গলায় বলে উঠল–কে রে ওখানে? অ্যাই?
শাঙ্কো বুঝল ধরা পড়ে গেছে। ও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ডেকে উঠেই দ্রুত ছুটে গিয়ে রেলিং ডিঙিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওরা দু’একজন কিছু বুঝে ওঠার আগে ঘটে গেল ঘটনাটা। ওরা অবাক। শাঙ্কো ডুব সাঁতার দিয়ে ওদের জাহাজের কাছে এসে আস্তে মাথা তুলল। হাঁপাতে হাঁপাতে দু’হাতে জল ঠেলে হালের কাছে চলে এল। হাল ধরে চুপ করে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
ওরা ততক্ষণে ডেকে ছুটোছুটি করে চারদিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু শাঙ্কোকে দেখতে পেল না। শাঙ্কোর মাথা তখন হালের আড়ালে। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা হতাশ হয়ে ডেকে গিয়ে শুয়ে পড়ল। একজন ছুটে গেল হ্যারল্ডের কাছে, খবরটা দলপতিকে জানাতে। দলপতি কিছু পরে ডেকে উঠে এল। চারদিকে সমুদ্রের জল দেখল। সব শুনল। তারপর ফিরে গেল। শাঙ্কো অপেক্ষা করতে লাগল। ওদিক আকাশে চাঁদ ম্লান হয়ে আসছে। পুব আকাশ সাদাটে হয়ে গেছে। সূর্য উঠতে বেশি দেরি নেই। শাঙ্কো আর অপেক্ষা করল না। ডেকে উঠে এসে ভেজা পোশাকেই শুয়ে পড়ল। আর ওদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
সকাল হল। ডেক থেকে শাঙ্কো নেমে এল নিজেদের কেবিনে। বন্ধুরা ওর ভেজা পোশাক দেখে বলল, কী রে–জলে নেমেছিলি কেন?
গরম লাগছিল। স্নান করলাম। শাঙ্কো ভেজা পোশাক ছাড়তে ছাড়তে বলল।
সকালের খাবার খেয়ে শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস ওর জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল। তখনই হ্যারিও এল। হ্যারি এ সময় প্রায় নিয়মিত ফ্রান্সিসের কাছে আসে কথা বলতে। জাহাজের কাজকর্ম ঠিক চলছে কিনা, কারও অসুখ-বিসুখ হল কিনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা–এসব নিয়ে কথা হয় দুজনের।
শাঙ্কো কী দেখলে বলো, ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল। শাঙ্কো আস্তে আস্তে সব বলে গেল। দুই বন্ধু শুনল সব।
যাক নির্বিঘ্নে পালাতে পেরেছ। এখন কথা হল, কেন কয়েদঘর আছে ঐ জাহাজে। কেন কিছু মানুষকে বন্দী করে রাখা হয়েছে? হ্যারি, কী বলে?
