রাজার কথা শেষ হতেই হাজার কণ্ঠে ফ্রান্সিস ও হ্যারির জয়ধ্বনি উঠল। রাজা দু’হাত তুলে আবার সবাইকে থামালেন। বলতে লাগলেন আমার প্রিয় দেশবাসীগণ। আজকে আমার কি আনন্দ হচ্ছে, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। যেদিন সোনার ঘন্টা নিয়ে এসেছিলাম, সেদিনও আমরা আনন্দোৎসব করেছিলাম। কিন্তু সেদিনের আনন্দোৎসবে দুই বীর ভাইকিং ফ্রান্সিস আর হ্যারি অনুপস্থিত ছিল। তাই আজকে আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ হচ্ছে।
আবার একটু থেমে রাজা বলতে লাগলেন–হীরে দু’টো আজকে এই জাহাজেই থাকবে। কালকে হীরে দুটো নিয়ে মিছিল বেরোবে এবং সারা রাজধানী ঘুরবে। তারপর হীরে দু’টোকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হবে।
রাজা থামলেন। আবার জনতা হর্ষধ্বনি করে উঠল। হ্যারি রাজার কাছে এগিয়ে এল। বললো–আপনি নিশ্চয়ই কুখ্যাত জলদস্যু লা ব্রুশের নাম শুনেছেন?
–হুঁ–ও জাতে ফরাসী।
–আজ্ঞে হ্যাঁ। ওর গুপ্ত ধনভান্ডারও আমরা উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি।
–বলো কি! রাজা অবাক হলেন।
–চলুন, আপনি দেখবেন আসুন।
রাজাকে মালখানাঘরে নিয়ে গেল ম্যারি আর ফ্রান্সিস। সেই পেতলের কাজকরা বাক্সগুলো খুলে রাজাকে দেখালো ওরা। রাজা এত দামী গয়নাগাঁটি, মোহর দেখে অবাক। রাজা কিছুক্ষণ ঐ গয়নাগাঁটি হীরে-জহরতের দিকে তাকিয়ে বললেন এসব পাপের ধন সব বিক্রী করে সেই অর্থ কোন সকাজে লাগাতে হবে।
রাজা ডেক-এ উঠে এলেন। তারপর কাঠের তক্তার উপর দিয়ে ডেকে এলেন। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকেও সঙ্গে আসতে বললেন। ওরা দু’জনে পরপর নেমে এল। রাজা বললেন–তোমরা আমাদের গাড়িতে চড়ে আমাদের সঙ্গে প্রাসাদে যাবে।
রাজা ও রাণীর সঙ্গে এক গাড়িতে চড়া! ফ্রান্সিস আর হ্যারি পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। রাজা গাড়িতে উঠে ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। ওরা দু’জনে রাজা-রাণীর সামনের দিকে লাল গদি মোড়া জায়গায় গিয়ে বসলো। আবার উপস্থিত জনতা হর্ষধ্বনি করে উঠল। সামনে সুসজ্জিত ঘোড়ায় চড়া দেহরক্ষীরা, পেছনে গণ্যমান্য অমাত্য ও মন্ত্রীর গাড়ী। যাত্রা শুরু হলো রাজপ্রাসাদের উদ্দেশ্যে।
পথেও শহরবাসীদের উপচে পড়া ভীড়, সেই ভীড়ের মধ্য দিয়ে যেতে বেশ দেরিও হ’ল। উপস্থিত সবাই রাজা-রাণী আর ফ্রান্সিস ও হ্যারির জয়ধ্বনি করল।
রাজপ্রাসাদের বিরাট চত্বরে পৌঁছে রাজা-রাণী গাড়ির থেকে নেমে এলেন। ফ্রান্সিস আর হ্যারিও নামল। রাজা-রাণীর সামনে ফ্রান্সিস এসে দাঁড়ালো। বললে–আমরা অনেকদিন বাড়ী ছাড়া। বুঝতেই পারছেন মানে–
–নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই। তোমরা এখন বাড়ি যাও। রাজা বললেন।
রাণী একটু হেসে বললেন–এখন ছাড়া পেলে। কিন্তু আজ রাতে প্রাসাদে তোমাদের নিমন্ত্রণ। রাতের খাবারটা আমাদের সঙ্গে খাবে।
কথাটা বলে রাণী ডানহাতের দস্তানাটা খুলে হাতটা এগিয়ে দিলেন। ওরা দুজন সসম্ভ্রমে রাণীর হাত চুম্বন করল। রাজা-রাণী প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করলেন।
–বাড়ি চলো। পেছনে বাবার কণ্ঠস্বর শুনে ফ্রান্সিস ফিরে তাকালো। ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে বাবার গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল। আর একজন অমত্য হ্যারিকে তাঁর গাড়িতে ডেকে নিলেন। গাড়ি চললো। মন্ত্রীমশাই কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাস্তার জড়ো হওয়া লোকজন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কেউ-কেউ ফ্রান্সিসকে চিনতে পেরে হাত বাড়িয়ে দিলো। গাড়ি খুব দ্রুত চলছে না। ফ্রান্সিস হেসে সকলের সঙ্গেই করমর্দন করল। ওর বাবা এবার কোচম্যানকে লক্ষ্য করে বললেন–গাড়ি জোরসে চালাও। এবার দ্রুত ছুটল। রাস্তার লোকেরা কেউ-কেউ ফ্রান্সিসকে দেখে হাত নাড়ল। ফ্রান্সিসও হাত নাড়ল। এবার ওর বাবা বললেন–আবার কবে পালাবে?
ফ্রান্সিস উৎসাহের সঙ্গে বলতে লাগল বাবা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না, কি বড়-বড় মুক্তো।
তোমাকে পাহারা দেবার জন্যে দু’ডজন সৈন্য বাড়িতে মোতায়েন করবো। ফ্রান্সিস কোন কথা বললো না। চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ কেমন একটু ধরা গলায় বাবা বললেন–হারে, তুই তোর কি মা’র কথাও ভাবিস না?
ফ্রান্সিস মাথা নীচু করলো।
–তোর মা তোর জন্যে ভেবে-ভেবে অকালে মরে যাক্, এটাই কি চাস তুই? ফ্রান্সিস কোন কথা বলতে পারলো না। মার কথা ওর বেশি করে মনে পড়তে লাগল। আস্তে-আস্তে বলল–মা কেমন আছেন?
–মনে শান্তি থাকলে তো ভালো থাকবে? বাবা চড়া গলায় বললেন।
গাড়িতে আর কোন কথা হ’ল না। বাড়ির কাছে আসতে ফ্রান্সিস দেখলো দেয়ালে কি দেয়ালে জড়ানো সেই লতাগাছটা আরো বেড়েছে। সমস্ত দেওয়ালটাতেই ছড়িয়ে পড়েছে আর অজস্র নীলফুল ফুটে আছে সমস্ত দেওয়াল জুড়ে। ও দেখলো গেট-এর কাছে মা দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে একজন পরিচারিকা। মা’র মুখ-শরীর আরো শীর্ণ হয়েছে। মুখে সুস্পষ্ট বলিরেখা। এক বুক শূন্যভরা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর। একসঙ্গে আনন্দের, আবার দুঃখেরও।
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা ওর কপালে চুমু খেল। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, চিরকালের পাগল তুই–কবে তোর এ পাগলামি যাবে, এ্যা? বুড়ি মা’র কথা একবারও পড়ে না তোর?
ফ্রান্সিস অরুদ্ধস্বরে বলল–আমার মা বুড়ি না।
মা হাসল। কিছু বলল না। বাবা এর মধ্যে কাছে এলেন। বললেন—চলো।
বাড়ির দিকে যেতে যেতে মা বললো, হারে–সবাই বলছে তুইনাকি বিরাট দুটো হীরে এনেছিস্?
