জাহাজ চলার পথে বেশ কয়েকটা ছোট-বড় বন্দর পেল ওরা। কিন্তু জাহাজ ভেড়ানো হল না। শুধু পাল দড়ি মেরামতের জন্যে একটা বন্দরে থামতে হয়েছিল। অন্য একটা বড় বন্দরে খাবার আর জলসংগ্রহের জন্যে জাহাজ ভেড়াতে হয়েছিল। নজরদার পেড্রোর কাজও হালকা হয়ে গেছে। শুধু রাত পর্যন্ত মাস্তুলের ওপরে উঠে নজরদারি করে সে।
সেদিন সকালে ফ্রান্সিস-মারিয়া সবে সকালের খাওয়া শেষ করেছে, হ্যারি ছুটে এল। বলল, ফ্রান্সিস, একটা জাহাজ আসছে দেখলাম। মাস্তুলের মথায় স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ার পতাকা উড়ছে। মনে হচ্ছে আমরা দেশের কাছে চলে এসেছি।
তাহলে তো ওদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, ফ্রান্সিস উঠেপঁড়াল। মারিয়া উঠল। তিনজনে ডেকে উঠে এল। উজ্জ্বল রোদে আকাশ ঝলমল করছে দেখা গেল। জাহাজটা অনেক কাছাকাছি এসে গেছে। ফ্রান্সিস পতাকাটা দেখল। হ্যারিকে বলল, যাও। ফ্লেজারকে বলো ঐ জাহাজটার কাছে যেতে। হ্যারি চলে গেল। শাঙ্কোরা কয়েকজন এগিয়ে এল। ওদের জাহাজটা আস্তে আস্তে স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ার জাহাজের গায়ের কাছে এল। ঐ জাহাজের লোকেরাও ততক্ষণে ওদের জাহাজের রেলিঙের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিসদের দেখছে।
কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল।
ওদের জাহাজে যাব।
একাই যাবে? দূর থেকে কথা বলা যাবে না?
না।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ আস্তে আস্তে ঐ জাহাজের গায়ে এসে লাগল। জোর ঝাঁকুনি খেল ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ঝাঁকুনি সামলে ফ্রান্সিস লাফিয়ে ঐ জাহাজের ডেকে উঠে। এল।
জাহাজে উঠে বুঝল যাত্রী জাহাজ নয়। জাহাজের লোকেদের পরনে যোদ্ধার পোশাক। ফ্রান্সিস বুঝল, ওরা কোথাও যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। যোদ্ধাদের কয়েকজন ফ্রান্সিসের কাছে এসে দাঁড়াল। ভাইকিংদের দেশীয় ভাষায় জিগ্যেস করল, তোমাদের দেখে তো মনে হচ্ছে ভাইকিং।
হ্যাঁ, আমরা ভাইকিং। তোমাদের দলপতির সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।
দুজন গিয়ে দলপতিকে ডেকে আনল। দলপতির পরনে বেশ দামি পোশাক। কোমরে তরোয়াল ঝুলছে। ফ্রান্সিসদের সেলাই করা ময়লা পোশাক দেখে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে দলপতি বলল, শুনলাম তোমরা আমাদের দেশের মানুষ।
হ্যাঁ । আমরা ভাইকিং।
কিন্তু আসছ কোত্থেকে? চেহারা পোশাকে তো দেখছি একেবারে ভিখিরি।
মন্তব্য শুনে ফ্রান্সিস মনে মনে ক্ষুণ্ণ হলেও নিজেকে সংযত করল। ও তখন জনতে ব্যস্ত কোথায় ওরা এসেছে। তাই বলল, আমরা অনেকদিন আগে দেশ থেকে বেরিয়েছি। অতলান্তিক সাগরে, ভূমধ্য মহাসাগরে ভেসে বেড়িয়ে অনেক দ্বীপ দেশ ঘুরে দেখেছি।
এমনি এমনি এত দেশ ভ্রমণ করেছ?
কতকটা তাই। তবে কিছু গুপ্ত ধনভাণ্ডারও বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্ধার করেছি।
তাহলে তোমাদের এই দুর্দশা কেন? দলপতি হেসে বলল।
ওসব কথা থাক। আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন?
ব্রিটেনে। রৌয়েন বন্দর থেকে ফিরছি।
ব্রিটেনে কেন গিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
ব্যবসা করতে। সীলমাছের চর্বি, পশুর লোমের পোশাক–এসব।
ফ্রান্সিস একটু চমকাল। দলপতি মিথ্যে কথা বলছে। এবারও ভালো করে দলপতির মুখের দিকে তাকাল। ধৃত দৃষ্টি। কিন্তু মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই মিথ্যে কথা বলছে। দলপতির দেখেই বোঝা যাচ্ছে মোটেই ব্যবসায়ীদের মতো নিরীহ চেহারার মানুষ নয় ওরা।
দেশের কোন বন্দরে যাবেন?
দোরস্তাদ। ওখানে কিছুদিন থেকে কিন্তু এত কথা জিগ্যেস করছ কেন?
অনেকদিন পরে দেশের মানুষদের দেখছি, কথা বলছি–দেশের বন্দরের নাম শুনছি, কত কাছে চলে এসেছি ভালো লাগছে বন্ধুর মতো কথা বলতে। চলুন না একসঙ্গে ফিরি।
ঠিক আছে। চলো। কিন্তু তার আগে জানতে হয় তুমিই কি দলপতি?
হ্যাঁ।
নামটা?
ফ্রান্সিস।
অ্যাঁ। দলপতি বেশ চমকে উঠল। বলল, মানে–আপনিই কি সেই ফ্রান্সিস যে সোনার ঘণ্টা, হাঁসের ডিমের মতো মুক্তো–
হ্যাঁ, আমিই সেই ফ্রান্সিস। সঙ্গে আমার বীর বন্ধুরা।
ও। তা–এ তো আনন্দের কথা। চলুন। একসঙ্গেই যাওয়া যাক।
চলুন। ফ্রান্সিস রেলিং ধরে লাফিয়ে নিজেদের জাহাজে চলে এল। হ্যারিরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস ওদের সব কথা বলল। সবাই চলে গেল। হ্যারি আর মারিয়ার সঙ্গে ফিরে আসতে আসতে ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল, হ্যারি!
হ্যারি ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস একইভাবে বলল, ওদের দলপতি বলল বটে ওরা ব্যবসায়ী কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ওরা ব্রিটেনে এমন কিছু করতে গিয়েছিল যা করতে বলপ্রয়োগ প্রয়োজন। নিছক ব্যবসার ব্যাপার নয়। স্পষ্ট বুঝতে পারছি ওরা কিছু গোপন করছে। ওদের কাউকে জিগ্যেস করে দলপতির নামটা জেনো তো। লোকটা মোটেই সুবিধের নয়। জানি তো আমাদের দেশের কিছু বিপথগামী মানুষের দল আছে। জাহাজে চড়ে এদিকে ব্রিটেন ওদিকে স্থলপথে রাশিয়া পর্যন্ত গিয়ে ব্যবসার নামে দস্যুতা করে। ধনসম্পদ লুঠ করে আনে। বিক্রির জন্য ধনী ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে তাদের। এরা তেমনি একদল বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে। ফ্রান্সি আর কিছু বলল না। কিন্তু স্থির করল ওদের জাহাজটা ভালো করে দেখবে।
হ্যারি চলে গেল। ঘরে ঢুকে মারিয়া বলল, হ্যারিকে চুপিচুপি কী বলছিলে?
তোমাকে পরে বলব। এখনও বলার মতো কিছু ঘটেনি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হ্যারি এল। বলল, ওদের দলপতির নাম হ্যারল্ড।
হুঁ। হ্যারল্ডের জাহাজটা যেভাবে হোক ভালো করে দেখতে হবে। হ্যারল্ড অনেক কিছু গোপন করছে।
