শাঙ্কো বলল, বেলা অনেক হয়েছে। এখানে খেয়ে গেলে হত না?
না, ফ্রান্সিস বলল, এই অন্ধকূপে আর এক মূহুর্তও থাকব না। আমাদের জাহাজেই রান্না সেরে খাব। এখন চলল। মারিয়া হাসতে হাসতে এসে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। সবাই দল বেঁধে চলল জাহাজঘাটের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, ফ্রান্সিস, খাবার জল আর খাদ্য নিতে হবে যে।
সে সব কাল সকালে শাঙ্কোরা এসে নিয়ে যাবে। গত কয়েক রাত ঘুমোতেই পারিনি। আজ রাতে মড়ার মতো ঘুমোব। ফ্রান্সিস বলল।
শুধু তোমার নয়, আমাদেরও এক হাল। হ্যারি বলল।
রাজা ম্যাগনামের পাণ্ডুলিপি
কতদিন হয়ে গেল ফ্রান্সিস মারিয়া আর ভাইকিং বন্ধুরা দেশছাড়া। কত দ্বীপ, দেশ ঘোরা হল। কত মানুষ, কত বিচিত্র তাদের ভাষা, জীবনযাত্রা। কতবার বন্দী হল ওরা। কখনও লড়াই করে, কখনও বুদ্ধি খাটিয়ে পালাতে হল। মৃত্যু হল কয়েকজন বন্ধুর। বিস্কো তো আর ফিরেই এল না। ওদের মাঝে মাঝেই মন খারাপ হয়। দেশের কথা মনে পড়ে। বিশেস করে সিনেত্রা যখন দেশের গান গায়। কত বীর ওরা। কত শক্ত মন ওদের। তবু সেই সব গান শুনে ওদের অনেকের চোখেই জল আসে। ফ্রান্সিসেরও মন খারাপ হয়। প্রয়াত মার কথা মনে পড়ে। বাবার কথা, দেশের বাড়ির কথা মনে পড়ে। সবচেয়ে ব্যাকুল হয় মারিয়ার মন। তখন ও একেবারে গুম হয়ে থাকে। ফ্রান্সিস বোঝে সেটা। বেশ কষ্ট করে মারিয়ার মনকে শান্ত করে।
সেদিন ফ্রান্সিসদের জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এসেছে। তখন পশ্চিম দিকের আকাশ অস্তগামী সূর্যের শেষ গাঢ় কমলা রঙে স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে। বরাবরের মতো মারিয়া সূর্যাস্ত দেখছে–জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। হঠাৎকী এক গভীর দুঃখে মারিয়ার মন। ভরে উঠল। চোখে উপচে এল জল। লম্বা হাতা জামায় চোখ মুঝতে গিয়ে দেখল হাতার কাপড়টা ছেঁড়া। সেলাই করা হয়নি। এবার ভালো করে নিজের ময়লা পোশাকটার দিকে তাকাল। এ কী শ্রী হয়েছে ওর! কোথায় সেই রাজবাড়ির আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে সুবেশা নরনারীর মাঝে সম্রাজ্ঞীর মতো সে ঘুরবে ফিরবে তা নয় ভিখারিনির বেশে জাহাজে চড়ে অকূল সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে! মারিয়া রেলিঙে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ঠিক তখনই হ্যারি যাচ্ছিল জাহাজচালক ফ্লেজারের সঙ্গে কথা বলতে। মারিয়াকে কাঁদতে দেখে ও তাড়াতাড়ি ওর কাছে এল। বলে উঠল, রাজকুমারী, কী হয়েছে? আপনার শরীর ভালো তো?
মারিয়া মাথা নাড়তে নাড়তে আরও জোরে কেঁদে উঠল।
ডেকের একপাশেশাঙ্কোরা কয়েকজন বসেছিল। মারিয়াকে কাঁদতে দেখে ছুটে এল। হ্যারি বুঝল এক্ষুনি ফ্রান্সিসকে নিয়ে আসতে হবে। নইলে রাজকুমারীকে কেউ শান্ত করতে পারবে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে ফ্রান্সিসকে নিয়ে এল। মারিয়া তখনও কেঁদে চলেছে। ফ্রান্সিস এসে মারিয়ার মাথায় হাত রাখল। মৃদুস্বরে বলল, মারিয়া শান্ত হওঁ। তুমি অস্থির হয়ে পড়লে আমরাই বা স্থির থাকব কী করে? বলল, কী হয়েছে? কেন মন খারাপ করছ?
মারিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, দেশের কথা মনে পড়ছে, বাবা-মাকে ভীষণ দেখতে.. মারিয়া কথাটা শেষ না করে আবার কাঁদতে শুরু করল।
ওদিকে ভাইকিং বন্ধুরা মারিয়ার দুঃখ দেখে দেশ বিচলিত হল। প্রায় সবাই সেখানে। এসে জড়ো হয়েছে। রাজকুমারী হলেও মারিয়ার ব্যবহারে, আচার-আচরণে এতটুকু আভিজাত্যের গর্ব কেউ কোনোদিন দেখেনি। আপন বোনের মতো ওরা সবাই মারিয়াকে ভালোবাসে। ওদের অসুখ-বিসুখে মারিয়া কখনও কখনও রাত জেগেও সেবা শুশ্রূষা করেছে। বৈদ্য ভেন বলে, আমার ওষুধে কাজ হয় অর্ধেক। বাকিটা রাজকুমারীর সেবা শুশ্রষা।
এবার ফ্রান্সিস বন্ধুদের মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ডাকল, হ্যারি!
বলো? হ্যারি এগিয়ে এল।
আমরা দেশে ফিরব।
হ্যারি একটু চুপ করে থেকে বলল, ফ্রান্সিস তোমার কথাই তো আমাদের কাছে শেষ কথা। তাহলে ফ্লেজারকে ডাকি?
ডাকো।
হ্যারি জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে চলে গেল।
ফ্রান্সিসের কথায় গভীর নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছিল জাহাজে। শুধু কানে আসছিল সমুদ্রের দুরন্ত হাওয়ার শন্ শন্ শব্দ আচমকা শাঙ্কো ধ্বনি তুলল–ও হো হো। সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত ধ্বনি উঠল। হো হো হো দেশে ফেরার আনন্দে ওরা তখন মারোয়া। মারিয়া মৃদুস্বরে বলল, আমার ওপরে নিশ্চয়ই তোমার রাগ হয়েছে।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল, না। আমিই সবসময়ই চাই, তুমি সুখী হও। আনন্দে থাক। তখনই হ্যারি ফ্লেজারকে নিয়ে এল।
ফ্লেজার, ফ্রান্সিস বলল, মোটামুটি উত্তর দিকটা ঠিক রেখে জাহাজ চালাও। এবার দেশে ফিরব আমরা।
ঠিক আছে। ধ্রুব নক্ষত্রই আমার ভরসা। মনে হয় দিকভুল হবে না। তবে কতদিনে য়ুরোপে পৌঁছব জানি না।
ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, যাও বিশ্রাম করো গে।
মারিয়া আর কোনো কথা বলল না। চলে গেল ওর কেবিনের দিকে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে পূর্ণ গতিতে। দিন যায়। রাত যায়। রাতে বন্ধুরা জাহাজের ডেকে নাচগানের আসর বসায়। সিনাত্রা গান গায়। বন্ধুরা ছোট ছোট দল বেঁধে নাচে। সিনাত্রা কখনও গায় ওদের দেশের বিয়ের গান, কখনও মেষপালকদের গান, কখনও বা রাজসভার গান।
নাচ গানের আসরে ফ্রান্সিস মারিয়াও যোগ দেয়।
দু’দুবার ঝড়-বৃষ্টির পাল্লায় পড়তে হল। সেই আকাশ অন্ধকার করে মেঘজমা, বিদ্যুতের ঝলকানি যেন ফালা ফালা করে দিচ্ছে আকাশ। সেই সঙ্গে বজ্রনির্ঘোষ আর মুষলধারায় বৃষ্টি। পালের কাঠামোর দড়িদড়া ধরে ভাইকিংদের লড়াই চলে ঝড়ের বিরুদ্ধে।
