দুপুরের চড়া রোদ পড়েছে দ্বীপে। সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাঁড় রেখে দিল। তীরের পাথরে পা রেখে সাবধানে নামল। কিছুআগে আগুন জ্বলেছিল। কাজেই পাথরটা বেশ গরম। তারপর শরীরের ভারসাম্য রেখে পরের পাথরে পা রাখল। মাটিতে পা রাখার উপায় নেই। পাথরে পা না পড়ে তাও হিসেবে রাখতে হচ্ছে। গুনে গুনে আটটা পাথরের ধাপ পার হতেই উজ্জ্বল রোদে দেখল একটা হাতলওয়ালা কালো কাঠের বাক্স একটা বড় পাথরের ওপর রাখা। ফ্রান্সিস শরীরের ভারসাম্য রেখে আস্তে আস্তে বাক্সটার হাতল ধরল। খুব সাবধানে বাক্সটা তুলে নিল। ওটা বেশ ভারী। ও বাক্স খোলার ঝুঁকি নিল না। আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। একটা ভারী জিনিস নিয়ে শরীরের ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। কাজেই খুব সাবধানে পাথরে পা রেখে রেখে নৌকোর কাছে ফিরে এল। বাক্সের ভারে শরীরের ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হচ্ছে। ও তখন বেশ হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই বাক্সটা এগিয়ে ধরে বলল, শাঙ্কো, এটা নৌকোয় রাখো। দুজনেই ধরো।
লার্দো হতবাক–এই সাংঘাতিক দ্বীপে বাক্স রেখে গেছে কে? সে কি মানুষ না দৈত্য?
দুজনে ধরাধরি করে বাক্সটা নিয়ে নৌকোয় রাখল। ফ্রান্সিস সাবধানে নৌকোয় উঠে এল। তারপর দাঁড় তুলে নিল। নৌকো চালাল তীরেরভূমির দিকে।
এই বাক্সেই কি আছে রাজা মিলিন্দার গুপ্তধন? শাঙ্কোর মনে তখনও সংশয়।
খুলে দেখো। ফ্রান্সিস দাঁড় বাইতে বাইতে বলল।
শাঙ্কো বাক্সের গায়ে হাতড়ে তালার গর্তে হাত দিয়ে দেখল একটা ছোট্ট চাবি আটকানো। ও চাবিটা ডানদিকে মোচড় দিল। কট করে একটা শব্দ হল। ও হাতল ধরে টানল। বাক্সের ওপরের ডালা খুলে গেল। বাক্সভর্তি সোনার অলঙ্কার, হীরে-মুক্তো, মণিমাণিক্য। উজ্জ্বল রোদে সব ঝকঝক করতে লাগল। লার্দো এসব দেখে চিৎকার করে উঠল, ওঁওঁওঁ। এরকম দৃশ্য ফ্রান্সিস, শাঙ্কো অতীতেও দেখেছে। তবু…শাঙ্কো চেঁচিয়ে উঠল, ও হো হো। তীরে গাছের তলায় বসে-থাকা হ্যারি লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তাহলে ফ্রান্সিস গুপ্তধন উদ্ধার করতে পেরেছে। হ্যারিও ধ্বনি তুলল, ও হো হো।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। তারপর আস্তে আস্তে নৌকো তীরে ভেড়াল। শাঙ্কো বাক্সটা কাঁধে তুলে নিল। তিনজনে চলল নগরের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো বলল, আচ্ছা ফ্রান্সিস, এই গুপ্তধনের বাক্স তো কারো না কারো নজরে পড়তে পারত।
না, পারত না। প্রথম ঐ অভিশপ্ত দ্বীপের ধারেকাছে কেউ যেত না। তার গাছের আড়ালে ছিল ঐ বাক্স।
রাজা মিলিন্দা কীভাবে ওখানে বাক্সটা রেখেছিলেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
রাজা মিলিন্দা একজন বা দুজন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীকে সকলের অগোচরে ওখানে নৌকোয় করে বাক্স সহ পাঠিয়েছিলেন। রাজার নির্দেশ ছিল সাত আটটা পাথরের ধাপও নিয়ে যাবার। কয়েক দফায় ওরা নৌকোয় করে পাথরের ধাপগুলো নিয়ে গিয়েছিল। দ্বীপের মাটিতে সেগুলো গেঁথে ধাপের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে বাক্স রেখেছিল। কিন্তু তার গাছের ছোঁয়া ওরা এড়াতে পারেনি। ওখানেই বিষাক্ত মাটিতে মিশে গেছে ওদের দেহ।
তাহলে রাজা মিলিন্দা কি পরে গুপ্তধনের বাক্সটা আনবেন ভেবেছিলেন? শাঙ্কো বলল।
হ্যাঁ। কিন্তু তার আগেই তার মৃত্যু হয়।
তাহলে জীবিত অবস্থায় কীভাবে আনতেন?
যে ভাবে আমি এনেছি, ফ্রান্সিস বলল, বিষাক্ত তার গাছ পুড়িয়ে ফেলে। খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথর দেখেই আমার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ঐ দুটো পাথর ছিল ঠিক দ্বীপের পাথরের উল্টেদিকে। তাই দিক ঠিক রাখতে পেরেছিলাম।
রাজবাড়ির সামনে এসে পৌঁছল ওরা। ফ্রান্সিস লার্দোকে বলল, যাও, রাজার সঙ্গে আমাদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দাও। লার্দোর হতভম্ব ভাব তখনও সবটা কাটেনি। ফ্রান্সিস বলল, বলবে যে গুপ্তধন উদ্ধার হয়েছে। উনি যেন সেটা বুঝে নেন।
লার্দো চলে গেল। একটু পরেই প্রায় ছুটতে ছুটতে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, রাজসভায় চলো। ওখানেই রাজা আসবেন।
ফ্রান্সিসরা রাজসভায় এসে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু পরে রাজা জোস্তাক এসে সিংহাসনে বসল। শাঙ্কো কাঁধ থেকে বাক্স নামিয়ে রাজার পায়ের কাছে রাখল। তারপর হাতল টেনে ওপরের ডালা খুলল। অত স্বর্ণলঙ্কার হীরে, মণি, মুক্তো দেখে রাজা জোস্তাকের মুখে আর কথা নেই। কিছু পরে অভিভূতের মতো বলল, কী করে উদ্ধার করলে? ফ্রান্সিস সংক্ষেপে সব বলল। তারাপর রাজাকে অনুরোধ করল, এবার আপনার শর্ত রাখুন। ঐ বদ্ধ ঘর থেকে আমাদের মুক্তি দিন। আমরা জাহাজে ফিরে যাব।
বেশ। কিন্তু এত দামি অলঙ্কার, মণি, মুক্তো, তোমরা কিন্তু কিছু দাবি করবে না। রাজা বলল।
আমরা একটা রুপোর টাকাও নেব না। আপনার প্রহরীদের হুকুম দিন। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই সেনাপতি এসে হাজির হল। লার্দো শুধু সেনাপতিকেই খবরটা দেয়নি, রাস্তায় যাকে দেখেছে তাকেই এই গুপ্তধন উদ্ধারের কথা বলেছে। দলে দলে লোক ছুটে আসতে শুরু করল রাজবাড়ির দিকে। রাজা সেনাপতিকে হুকুম দিল ওদের ছেড়ে দিতে। সেনাপতি বলল, চলো তোমরা।
অস্ত্রঘরের সামনে এল সবাই। সেনাপতি প্রহরীদের বলল, এদের ছেড়ে দাও। রাজার হুকুম। প্রহরী দরজা খুলে দিল।
হ্যারি গলা চড়িয়ে বলে উঠল, বাইরে বেরিয়ে এসো। ফ্রান্সিস গুপ্তধন উদ্ধার করেছে। এবার জাহাজে চলো। সব ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুলল, ও হো হো। তারা বাইরে বেরিয়ে এল।
