কী দেখলে?
ঐ দেখ খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথরের ধাপ।
ফ্রান্সিস দেখল সেটা। একটু চমকাল। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, নৌকোয় ওঠার ব্যবস্থা, আগে লক্ষ করিনি। তার মানে এখান দিয়ে অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে যাওয়া হয় তাহলে জীবন বিপন্ন না করেও ঐ দ্বীপের মাটিতে ওঠা যায়। কথা শেষে দ্বীপের কী কী দেখেছে সব বলল হ্যারিকে।
জেলেপাড়ায় ডোঙা নৌকো ফিরিয়ে দিয়ে ওরা অস্ত্রঘরে ফিরে এল। ঘরে ঢোকার আগে ফ্রান্সিস বলল, লার্দো, আজকে আমরা আর টিলার নীচের জঙ্গলে যাব না। কাজেই আমাদের পাহারা দেবার জন্যে তোমাকে আর আসতে হবে না। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ? লার্দো জানতে চাইল।
কাল সকালে ভালো করে তেলে-ভেজানো দুটো মশাল আনতে হবে।
মশাল? দিনের বেলা? লার্দো তো অবাক।
হ্যাঁ। তুমি নিয়ে আসবে। ফ্রান্সিস বলল।
ঘরে ঢুকতে মারিয়া, বন্ধুরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো তখন অভিশপ্ত দ্বীপের কথা, তার গাছের কথা, গা জ্বলুনির কথা সব বলতে লাগল। ওরা শুনে অবাক হয়ে গেল। মারিয়া বলে উঠল, ফ্রান্সিস, ঐ সাংঘাতিক দ্বীপে আবার যাবে নাকি?
হ্যাঁ, ঐ অভিশপ্ত দ্বীপ হচ্ছে ধনরত্ন লুকিয়ে রাখার উপযুক্ত জায়গা।
কী বলছ তুমি? সমস্ত দীপটাই তো বিষাক্ত? মারিয়া বলল।
দেখি, দ্বীপের বিষ এড়ানো যায় কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া জানে কৃতসংকল্প ফ্রান্সিসকে নিরস্ত করা যাবে না। কাজেই ও আর কোনো কথা বলল না।
রাতে ফ্রান্সিসের ঘুম হল না। একে অসহ্য গরমে গাদাগাদি করে থাকা, তার ওপর যে ছক করেছে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে সে নিয়েও চিন্তা। ছটফট করতে করতে ভোর হয়ে গেল।
বেলা বাড়তে রাঁধুনিরা সকালের খাবার নিয়ে এল। প্রহরীরা পাহারায় রইল। খাবার খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, শাঙ্কো, চেয়ে নিয়ে পেট পুরে খাও। ওখানে কতক্ষণ থাকতে হয় কে জানে! তিনজনেই চেয়ে চেয়ে খাবার খেল।
খাওয়া শেষ। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, সিনাত্রার কাছ থেকে চকমকি পাথর আর লোহার টুকরো নাও। শাঙ্কো সিনাত্রার কাছ থেকে সেসব নিল। তারপর কোমরে গুঁজল।
কিছু পরে লার্দো দুটো মশাল নিয়ে এল। সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সিস চলল খাঁড়ির দিকে। লার্দো ডোঙা নৌকো নিয়ে এল। খাটের মতো পাতা পাথরের ওপর দিয়েই তিনজন নৌকোয় উঠল। হ্যারি গিয়ে গাছের নীচে বসল।
নৌকোয় ওঠার আগে ফ্রান্সিস একমুঠো বালি নিয়ে শূন্যে ওড়াল। বুঝল হাওয়ার গতি উত্তরমুখো। বলল, আমাদের দ্বীপের দক্ষিণ দিকে মানে ওপাশে যেতে হবে। হাওয়ার গতির উল্টেদিকে যাব আমরা।
ফ্রান্সিস দাঁড় হাতে নিয়ে নৌকো ছাড়ল। প্রায় শান্ত সমুদ্রের খাঁড়ি দিয়ে নৌকো চলল। অভিশপ্ত দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে দ্বীপঘুরে দক্ষিণ দিকে এল। দ্বীপের কাছাকাছি নিয়ে এল নৌকোটা। নৌকো থামাল। হাওয়া উল্টোদিকে বইছে। কাজেই গা জ্বালা করল না। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, মশাল জ্বালো। শাঙ্কো চকমকি পাথরে লোহা ঠুকে ঠুকে দুটো মশালই জ্বালাল। ফ্রান্সিস বলল, উঠে দাঁড়াও। দুজনে নৌকোয় উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল, যত জোরে পারো মশাল ছোঁড়ো ঐ তার গাছগুলোর মধ্যে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে তার গাছের ওপর ছুঁড়ে দিল। শাঙ্কোও জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল, সাবাস ফ্রান্সিস।
মুহূর্তে তার গাছের জঙ্গলে আগুন লেগে গেল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। ফ্রান্সিস দ্রুত বসে পড়তে পড়তে বলল, এই তল্লাট ছেড়ে সরে যেতে হবে। ধোঁয়া উঠবে। যদিও বাতাস আমাদের উল্টোদিকে বইছে তবু সাবধানের মার নেই। ধোঁয়াও বিষাক্ত। জ্বলন্ত তার গাছ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠল। ধোঁয়া উড়ে যেতে লাগল উত্তর দিকে। উল্টোদিকে ফ্রান্সিস দ্রুত নৌকো চালিয়ে বেশ কিছু দূরে চলে এল।
আগুন জ্বলতে লাগল। কালো ধোঁয়াও উঠতে লাগল ওপরের দিকে। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে আগুন নিভে এল। ধোঁয়া ওঠাও বন্ধ হয়ে গেল। এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দ্বীপের কালো কুচকুচে মাটি।
কী করবে এখন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
দ্বীপে নামব। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো ভীষণবাবে চমকে উঠল। বলল, মাথা খারাপ! বিষাক্ত গাছ না হয় নেই। কিন্তু ওখানকার ঐ কালচে মাটিও তো বিষাক্ত।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল, শাঙ্কো, খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথর পোঁতা আছে দেখে এসেছ?
হ্যাঁ, নৌকোয় ওঠার জন্যে। শাঙ্কো বলল।
যদি আমার অনুমান সত্যি হয় তাহলে ঐ দ্বীপেও এরকম পাথরে ধাপ আছে। যদি পাথরের ধাপ থাকে তাহলে রাজা মিলিন্দার গুপ্ত ধনভাণ্ডার পোঁতা আছে ওখানেই। যে বা যারা ওখানে গুপ্তধন রেখে এসেছে, সে বা তারা ঐ ধাপের ওপর দিয়েই হেঁটে গিয়েছিল। বিষাক্ত মাটি স্পর্শও করেনি।
শাঙ্কো কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আবার সাবাস, ফ্রান্সিস। কিন্তু তোমার অনুমান সত্যি হবে যদি
ওকে থামিয়ে দিয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠল, হা, যদি ওখানে পাথরের ধাপ পাওয়া যায়। সেটাই দেখতে যেতে হবে।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। নৌকো চালাল অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে।
আস্তে আস্তে নৌকো তীরের একেবারে কাছে আসতে দেখা গেল সত্যিই কালো মাটির ওপরে পর পর কয়েকটা পাথরের ধাপ গাঁথা, যেমন আছে খাঁড়ির তীরের ভূমিতেও।
