তখনই লার্দো এসে হাজির। বন্ধ দরজার একটা পাল্লা খুলে ও মুখ বাড়াল। বলল কী? তোমরা বেরোবে নাকি?
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো আর হ্যারি তৈরিই ছিল।
লার্দোর পাহারায় ওরা রাজবাড়ি চলল।
রাজসভায় আজ বিচার চলছিল। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
একসময় বিচার শেষ হল। রাজা ডান হাত তুলে অপরাধীকে দেখিয়ে বলে উঠল –একে অভিশপ্ত দ্বীপে রেখে আয়। বিচারের শাস্তির কথা শুনে অপরাধী লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল
–আমাকে এই শাস্তি দেবেন না মহামান্য রাজা। আমাকে অন্য শাস্তি দিন। অপরাধী বার বার বলতে লাগল।
–না। অভিশপ্ত দ্বীপে নির্বাসন যা। রাজা মাথা নেড়ে বলল। দুজন সৈন্য এগিয়ে এসে অপরাধীকে টেনে ধরে নিয়ে চলল। অপরাধী চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। সৈন দুজন ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। লোকটা তখনও তারস্বরে কেঁদে চলেছে।
ফ্রান্সিস এই প্রথম অভিশপ্ত দ্বীপের কথাটা বলল। ও বুঝল না এরকম নাম, একটা দ্বীপের? কেন? ফ্রান্সিস কথাটা ভাবছে তখনই সেনাপতি বলল তোমরা এগিয়ে এসো। কী বলতে চাও বলো। ফ্রান্সিস কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ধ্বংপ্রাপ্ত পুরনো রাজাপ্রাসাদে কী ঘটল সব বলল। সবশেষে বলল–যতদূর বুঝতে পারছি রাজা মিলিন্দার রাজকোষ ঐ প্রাসাদেই ছিল। উনি পরে মন পরিবর্তন করে অন্য কোন গোপন স্থানে রেখেছেন।
–হ্যাঁ তা এখন কী করতে চাও? রাজা জোস্তাক বলল।
–অন্য জায়গায় খুঁজতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখ খুঁজে। রাজা বলল।
একটা কথা বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। রাজা বলল।
–অভিশপ্ত দ্বীপ কি একটা দ্বীপ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ ছোট দ্বীপ একটা। রাজা বলল।
অভিশপ্ত বলা হচ্ছে কেন? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–ঐ দ্বীপে নামলে কেউ জীবিত ফিরে আসতে পারে না। রাজা বলল
–কেন? ফ্রান্সিস বেশ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
–ঐ দ্বীপে তর্নার নামে এক রকমের বিষাক্ত গাছ আছে। সেই গাছের পাতার রং সবসময়ই হলদু। বসন্তকালে সেই গাছে টকটকে লাল রঙের ফুল হয়। গাছ-ফুল সবই বিষাক্ত। ঐ দ্বীপে নামলেই অবধারিত মৃত্যু। ঐ অভিশপ্ত দীপের ধারে কাছেও কেউ যায় না। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীকে ঐ দ্বীপে নামিয়ে দেওয়া হয়। দু’হাত-পা বেঁধে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কারণ ঐ দ্বীপের মাটিও বিষাক্ত।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আমরা ঐ দ্বীপ দেখতে যাব।
ঐ দ্বীপের ধারেকাছেও যেও না। মরবে। রাজা বলল।
দূর থেকেই দেখব। একটা নৌকো দেবেন? ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। একটা ভোঙা নৌকো পাবে। রাজা বলল।
আর একটা কথা–গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারলে আমাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে।
এমনভাবে বলছ যেন গুপ্তধন উদ্ধার করে ফেলেছ। রাজা বাঁকা হাসি হাসল।
আমি ওভাবেই কথা বলি। ফ্রান্সিস বলল। ঠিক আছে। তোমাদের তারপরে মুক্তি দেওয়া হবে।
আর খাবার জল আর খাদ্য দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
দেখা যাক, আগে উদ্ধারকাজ সারো।
সেনাপতি আসন থেকে উঠে এগিয়ে এল। বলল, চলো।
সেনাপতির সঙ্গে ওরা রাজবাড়ির বাইরে এল। পেছনে লার্দো।
কখন যাবে? সেনাপতি জানতে চাইল।
এক্ষুনি যাব। ফ্রান্সিস বলল।
অত তাড়া কীসের? সেনাপতি বলল।
আপনি বুঝবেন না।
সেনাপতি লার্দোকে বলল, যাও, ওদের একটা ডোঙা নৌকা, দাঁড় দাও। জেলেপাড়ায় পাবে। সেনাপতি চলে গেল।
লার্দোর সঙ্গে ওরা দক্ষিণমুখো চলল। কিছু পরে একটা খাঁড়ির কাছে এল। খাঁড়ির তীরে কিছু বাড়িঘর। বোঝা গেল জেলেপাড়া। তীরভূমির কাছে কিছু গাছের গুঁড়ি কেটে তৈরি নৌকো ভাসছে। লার্দো একটা ডোঙা নৌকো নিয়ে এল। দূরে অভিশপ্ত দ্বীপটা দেখাল সে। তীরভূমি থেকে খুব একটা দূরে নয়।
ফ্রান্সিস ডোঙা নৌকো দেখে বলল, হ্যারি, তুমি থাকো। ড্ডাঙা নৌকো বেশি লোক নিয়ে যেতে পারবে না। লার্দো তো পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।
শাঙ্কো আর লার্দোকে নিয়ে ফ্রান্সিস ডোঙা নৌকোয় উঠল। দাঁড় তুলে নিয়ে নৌকো চালাল অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে।
খাঁড়ির জল শান্ত। নৌকো বেশ জোরেই চলল। দ্বীপের কাছাকাছি এসে লার্দো বলে উঠল, বেশি কাছে যাওয়া বিপজ্জনক। নৌকো এখানেই থামাও। ফ্রান্সিস নৌকো থামাল। দুপুরের উজ্জ্বল রোদে স্পষ্ট দেখা গেল অভিশপ্ত দ্বীপ। পাঁচ-ছ’সাত উঁচু তার গাছ। হলুদ লম্বা লম্বা পাতা। লাল টকটকে ফুল ফুটে আছে। সমুদ্রের হাওয়ায় গাছগুলো মাথা দোলাচ্ছে। এত সুন্দর গাছগুলো অথচ বিষাক্ত।
কিছুটা এগোতেই দ্বীপের দিক থেকে হাওয়া ছুটে এল। ওদের গা জ্বালা করে উঠল। তাহলে গাছ-ছোঁয়া হাওয়াও বিষাক্ত। শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। ফিরে চলল।
তার গাছগুলোর জন্যে দ্বীপের মাটি ভালো দেখা যাচ্ছেনা। ভালো ভাবে দেখতে গেলে অন্য উপায় নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
কী সেটা? শাঙ্কো বলল।
আমার ছক কষা হয়ে গেছে। আজ ফিরে চলল। কাল দুপুরে তৈরি হয়ে আসব।
আবার কালকে আসবে? লার্দো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
হ্যাঁ, ভালোভাবে সব দেখতে হবে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
ফ্রান্সিস নৌকোর মুখ ঘোরাল। চলল তীরভূমির দিকে।
তীরে ভিড়ল নৌকো। ফ্রান্সিসরা নেমে এল। একটা বড় গাছের তলায় হ্যারি বসেছিল। ফ্রান্সিসের দেখে বলল, ফ্রান্সিস, একটা জিনিস দেখলাম।
