রাজা জোস্তাকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। গুপ্তধন সম্পর্কে সে কতটা জানে তা জানতে হবে। সেই গুপ্তধন কোথায় থাকতে পারে বলে তার ধারণা। রাজাও তো এই ব্যাপারে অনেক খোঁজখবর করেছে, ভেবেছে। দেখা যাক সে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য পাই কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
হবে। রাজার কী অনুমান সেটা জানতে হবে।
তাহলে তো কালকে রাজসভায় যেতে হবে। হ্যারি বলল।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে বলল, রাজবাড়িতে চল।
মারিয়া বলে উঠল, আমিও যাব।
বেশ চলো। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো উঠে গিয়ে দরজায় জোরে ধাক্কা মারল। দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। প্রহরী মুখ বাড়িয়ে বলল, দরজা ধাকাচ্ছ কেন?
সেনাপতিকে ডেকে দাও। কথা আছে। শাঙ্কো বলল।
হুঁ। প্রহরী পাল্লা বন্ধ করে চলে গেল।
কিছু পরে সেনাপতি এল। দরজার দুটো পাল্লা খুলে বলল, কী ব্যাপার?
ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল, রাজা জোস্তাকের সঙ্গে আমার কী কী কথাবার্তা হয়েছে। তা আপনি শুনেছেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ। সেনাপতি মাথা কাত করল।
আমরা রাজবাড়িতে খোঁজটোজ করতে যাব।
বেশ, সেনাপতি বলল। তারপর পেছন ফিরে দাঁড়ি গোঁফওয়ালা সেই সৈন্যটিকে বলল, এরা তিনজন রাজবাড়িতে খোঁজাখুঁজি করতে যাবে। এদের কড়া পাহারায় রাখতে হবে। যেন পালাতে না পারে।
কে কে আসবে এস। দাড়ি গোঁফওয়ালা বলল।
মারিয়া, হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে ফ্রান্সিস অস্ত্রঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর দাড়ি-গোঁফওয়ালার পাহারায় রাজবাড়ির দিকে চলল। যেতে যেতে ফ্রান্সিস বলল, আমরা খোঁজটোজ করব। আর তুমি আমাদের পাহারায় থাকবে। কাজেই তোমার নামটা তো জানা দরকার।
সৈন্যটি দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, আমার নাম লার্দো।
বাঃ সুন্দর নাম, হ্যারি হাসি চেপে বলল। লার্দো দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে হাসল। বলল, লার্দো মানে হল মোটা।
নামটা কে দিয়েছিল? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।
দিদিমা। ছোটবেলায় খুম মোটা ছিলাম তো, লার্দো বলল।
এখনও কিছু কম যাও না। হ্যারি মুখ টিপে বলল। এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও ফ্রান্সিস হো হো করে হেসে উঠল।
চোপ! কোনো বাজে কথা না। লার্দো বলল, বেশ ধমকের সুরে।
তরোয়ালটা খাপে ভরে ফেললো। শাঙ্কো নিরীহ ভঙ্গিতে বলল।
না-না। সেনাপতির হুকুম, কোনো রকম বেচাল দেখলে তরোয়াল চালাবে, লার্দো বলল।
ফ্রান্সিসরা আর কিছু বলল না। সবাই সদর দেউড়ি পার হয়ে রাজ বাড়িতে ঢুকল। অন্দরমহলের দরজায় দুজন প্রহরী বর্শাহাতে পাহারা দিচ্ছে। লার্দো এগিয়ে গিয়ে বলল, এই বিদেশিদের রাজা অনুমতি দিয়েছেন। এরা অন্দরমহল ঘুরে দেখবে। মাননীয়া রানিকে বলো গে। একজন প্রহরী চলে গেল। কিছু পরে ফিরে এল। বলল, যাও,। তবে মাননীয়া রানি হুকুম দিয়েছেন তোমরা বেশিক্ষণ থাকবে না।
ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই অন্দরমহলে ঢুকল। পাথরের ঘর-দোর খুব সুসজ্জিত। দামি কাঠের আসবাবপত্র। বিছানায় দামি কাপড়ের সজ্জা। ফ্রান্সিস অবশ্য সে সব দেখছিল না। দেখছিল পাথরের দেয়াল, ছাদ। দেয়ালে রঙিন ছবি আঁকা। পাথরের দেয়াল নিরেট। দেয়ালের মধ্যে কোন গোপন কুঠুরি থাকার সম্ভাবনা নেই।
ফ্রান্সিসরা ঘুরে ঘুরে সব ঘর দেখল। কোথাও কোন সাংকেতিক চিহ্ন পেল না। ঘরগুলো, দেয়ালগুলো খুব পরিচ্ছন্ন। ফ্রান্সিসের কেমন মনে হল রাজবাড়িটা খুব বেশিদিন তৈরি হয়নি। তবুলার্দোকে জিজ্ঞেস করল, এই রাজবাড়িতে কোনো পুরোন পরিত্যক্ত ঘর বা পাথরের মেঝের নীচে ঘর আছে?
না, এই রাজবাড়ি বেশিদিনের নয়। রাজা জোস্তাকের পিতার আমলের তৈরি। লার্দো বলল।
এটা আমারও মনে হয়েছে। আচ্ছা রাজা মিলিন্দার আমলে রাজবাড়ি কোথায় ছিল, ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
–সে তো উত্তর দিকের টিলার নিচে। এখন ধ্বংসাব শেষ। লার্দো বলল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–ওটাই দেখবো। চলো।
রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ওরা উত্তরমুখো চলল। দূর থেকেই একটা ঝোঁপ জঙ্গল ঢাকা টিলা দেখল। কাছাকাছি আসতে দেখল টিলার নিচেই পুরনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ওরা পাথরের ভাঙা পাটা ছড়ানো জায়গাটায় এল। এখন আর ঐ ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝার উপায় নেই কোথায় ছিল সদর দেউড়ি কোথায় ছিল রাজসভা অন্দরমহল বা বারান্দা জানালা দরজা। স্থূপাকার পাথরের পাটা দেখে কিছুই। বোঝার উপায় নেই। কিছুক্ষণ সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থেকে ফ্রান্সিস বলল– সব কিছু ভালোভাবে দেখতে হবে। চলো ধ্বংসস্তূপের ওপরে ওঠা যাক।
–এখানে দেখার কী আছে? সবই তো ভেঙে শেষ। লার্দো বলল।
রাজসভা দরজা অন্দরমহল দেখে দেখে এসব বুঝে নিতে হবে। তুমি বরং নিচে থাকো। তুমি তো একটু মোটা মানুষ। তুমি পারবে না।
-না-না। রাজার হুকুম। তোমাদের চোখে চোখে রাখতে হবে। লার্দো মাথা নেড়ে বলল।
তাহলে এসো। শাঙ্কো বলল।
সবাই সাবধানে ভাঙা পাথরের ওপর পা রেখে ধ্বংসস্তূপের একেবারে ওপরে উঠে এল। ভাঙা পাথরের মধ্যে বুনো গাছগাছালি গজিয়েছে। অনেক জায়গায় জংলা ঝোঁপঝাড়। পাথরে শ্যাওলার মোটা ছোপ। ফার্ণ গাছ।
এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতে একটা ধ্বসে যাওয়া অংশের কাছে এল। ধ্বসের পাশেই একটা গহ্বর মত। ফ্রান্সিস গহুরটার মাথায় হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মুখ নিচু করে তাকাল। গহ্বরের উত্তর দিকে ধ্বসে গেছে বলে গহ্বরটায় রোদ পড়েছে। , তবু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আবছা দেখল একটা ভাঙা ঘরের অংশ। ওর মনে প্রশ্ন– এই অংশটাতেই কি রাজবাড়ির অন্দর মহল ছিল। এই ভাঙা অংশ দিয়ে নেমে দেখতে হবে। এমনি ধ্বসে যাওয়া আরো ঘর হয়তো পাওয়া যাবে। ঠিক তখনই ভাঙা পাথরে পিছনে হ্যারি পড়ে যেতে যেতে একটা বুনো ঝোপে আটকে গেল। ফ্রান্সিস ভাঙা পাথরে ভারসাম্য রেখে যতটা দ্রুত সম্ভব হ্যারির কাছে। হ্যারিকে টেনে তুলে দাঁড় করালো। তেমন কিছু আঘাত নয়। হ্যারি হেসে বলল–আমি ঠিক আছি। তোমরা যা দেখার দেখ। হ্যারির হাঁটু কনুই ছেড়ে গেছে। অল্প রক্ত বেরিয়ে এসেছে।
