দু’পাশে রাজধানীর বাড়ি-ঘর-দোর দেখা গেল। লোকজন সাগ্রহে ফ্লেজারদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বিশেষ করে মারিয়াকে দেখেই ওরা উৎসুক হল বেশি। এই বিদেশিরা কোত্থেকে এল? এদের বন্দীই বা করা হল কেন? ওরা রাজা জোস্তাককে ভালো করে চেনে। যা বদরাগী রাজা এরা সহজে রেহাই পাবে না।
ফ্রান্সিস অস্ত্রঘরের মেঝেয় শুয়েছিল। বাইরে ঘোড়ার পায়ের শব্দ, সৈনদের চলার শব্দ ওর কানে গেল। ও উঠে বসল। মৃদুস্বরে বলল, শাঙ্কো, বোধহয় বন্ধুদের বন্দী করে আনা হল।
তখনই অস্ত্রঘরের দরজা খুলে গেল। হ্যারিরা একে একে ঢুকতে লাগল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, হ্যারি, লড়াই তো হয়নি?
আমরা তখন গভীর ঘুমে। কথাটা বলতে বলতে হ্যারি এসে ফ্রান্সিসের পাশে বসল।
একটা বিরাট ভুল হয়েছে আমার। তোমাদের সময়মতো সাবধান করতে পারিনি। পেড্রোকে যদি নজরদারির জন্যে রাখা হত তবে তোমরা এত সহজে বন্দী হতে না। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। ভুলের সে মাসুল দিতেই হবে। তারপর ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে বলল, এ কেমন কয়েদঘর? দরজা চেপে বন্ধ করা। একটা জানালাও নেই।
এটা অস্ত্র রাখার ঘর ছিল।
তাই এরকম দম বন্ধ করা পরিবেশ। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ। এখানেই থাকতে হবে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
মারিয়া এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, দাঁড়িয়ে থেকো না। বসো। বিশ্রাম করো। মারিয়া ফ্রান্সিসের পাশে এসে বসল। মৃদুস্বরে বলল, এ তো অন্ধকূপ হত্যা।
বন্দীদশা এরকমই হয়। বলে মারিয়ার শ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, তোমার শরীর ভালো আছে তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া ম্লান হাসল।
হ্যারি বলল, জান, রাজকুমারী আর ভেনকে জাহাজেই রাখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু গোঁফ ওয়ালা লোকটা আমার কথা কানেই তুলল না।
ওকে বলে কিছু হবে না। রাজা জোস্তাককে বলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা জোস্তাক আবার কেমন মানুষ কে জানে। হ্যারি বলল।
দেখা যাক। ফন্সিস উত্তর দিল।
বন্ধুদের মধ্যে তখন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ছোট ঘরে বেশ গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে সবাইকে। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে। তখনই ফ্লেজার বলল, ফ্রান্সিস, এই। ঘরে থাকলে আমরা বোধহয় বাঁচব না। যা হোক করে মুক্তির উপায় ভাবো।
ভাবছি। পাহারার ব্যবস্থাটা ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে। তারপর পালানোর ছক কষতেহবে।
সন্ধ্যেবেলা সেনাপতি এল। দরজার একটা পাল্লা খুলে গলা বাড়িয়ে হেসে বলল, শুনেছি তোমরা নাকি খুব কষ্ট সহিষ্ণু, বীর জাতি। এই অস্ত্রঘরে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কি?
খুব ভালো আছি আমরা। এখনও দম বন্ধ হয়ে মরে যায়নি। হ্যারি গলা নামিয়ে বলল।
সেনাপতি কথাটা ঠিক বুঝল না। বলল, কী বললে?
ফ্রান্সিস বলে উঠল, কিছু না। একটা দরকারি কথা বলছিলাম।
কী বলবে বলো।
বলছিলাম রাজা জোস্তাকের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
আগেই বলেছি কোন লাভ নেই। রাজা জোস্তাক এককথার মানুষ। তোমাদের মুক্তি দেবে না। সেনাপতি বলল।
ঠিক আছে। অন্তত একবার বলে দেখুন। আমরা মুক্তি চাই না। এভাবে দমবন্ধ হয়ে মরতে চাই না। বলবেন দরকারি কয়েকটা কথা বলব। ফ্রান্সিস বলল।
অত করে বলছ। ঠিক আছে, রাজাকে বলব। সেনাপতি চলে গেল, দরজার পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল।
রাতের খাওয়াটা ভালোই হল। পাখির মাংস, রুটি আর আনাজের ঝোল। ক্ষুধার্ত ভাইকিংরা পেট পুরে খেল। কিন্তু রাতটা কাটল বেশ কষ্টে। কারো প্রায় ঘুমই হল না। ফ্রান্সিস খুবই চিন্তায় পড়ল। বিশেষ করে মারিয়ার জন্যে। এভাবে কতদিন চলবে? হ্যারিরও সহ্যক্ষমতা কম।
সবে সকালের খাবার খাওয়া হয়েছে সেনাপতি এল। বলল, রাজা জোস্তাক খুবই দয়ালু। তোমার কথা শুনতে রাজি হয়েছেন। তবে আগেই বলেছি আজে বাজে কথা শত একদম বলবে না। রাজা চটে গেলে কিন্ত তোমাকে ফাঁসিতে লটকে দেবে। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।
চলে এসো। রাজসভার কাজ শুরু হয়ে গেছে। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এল। চারজন সৈন্য এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল।
ওরা সৈন্যদের পাহারায় সভাকক্ষে ঢুকল। তখন কোনো বিচার চলছিল না। দুদিকে পাথরের জানালা থাকা সত্ত্বেও সভাকক্ষ বেশ অন্ধকার। পাথরের সিংহাসনে রাজা বসে আছে। দু’পাশের আসনে সেনাপতি ও মন্ত্রী। সভাকক্ষে প্রজাদের বেশ ভিড়। সিংহাসনে বসেই রাজা একনাগাড়ে বলে চলেছে, কাজেই আমাদের সাবধান হবার সময় এসেছে। দক্ষিণের রাজ্যের জংলীদের সর্দার যে কোনোদিন আমার রাজত্ব আক্রমণ করতে পারে। ঐ দলপতি রাজা মিলিন্দার গোপন ধনৈশ্বর্যের সংবাদ জানে। ওদের লক্ষ্য সেই ধনৈশ্বর্য উদ্ধার করা। এই জন্যেই ওরা আমার রাজত্ব দখল করতে চায়। তখন লড়াই হবে। আমার সৈন্যবাহিনী রয়েছে। কিন্তু তোমাদেরও লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজা থামল। উপস্থিতপ্রজারা ধ্বনি তুলল, রাজা জোস্তাকের জয় হোক।
রাজা জোস্তাকের কথা শুনে ফ্রান্সিস চমকে উঠল। এই রাজত্বের কোথাও গুপ্ত ধনৈশ্বর্য আছে এটা ও প্রথম শুনল না। সেনাপতিও বলেছিল। রাজা জোস্তাক আর কিছু বলল না। গুপ্ত ঐশ্বর্য সম্বন্ধে ফ্রান্সিস আর কিছু জানতে পারল না। দরবারকক্ষ থেকে প্রজারা বেরিয়ে যেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দরবার কক্ষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ল।
