শাঙ্কো মেঝেয় শুয়ে পড়ল। কোনো কথা বলল না। বিনেলোও ততক্ষণে জেগে গেছে। বলল, ফ্রান্সিস, কিছু একটা উপায় বের করো। এইভাবে সবাই এই ছোট ঘরটায় বন্দী হয়ে থাকা
উপায় নেই বিনেলো। আমার সব চিন্তাভাবনা কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। স্থির হয়ে কিছু ভাবতে পারছি না। বড় অসহায় অবস্থা আমাদের।
ফ্রান্সিস, তুমি ভেঙে পড়োনা। তুমিই আমাদের একমাত্র ভরসা। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।
ওদিকে সেনাপতি সৈন্যদের নিয়ে জাহাজঘাটে এসে উপস্থিত হল। ম্লান জোৎস্নায় ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ভালো করে দেখল। জাহাজের কোথাও আলো জ্বলছেনা। বোঝাই যাচ্ছে বিদেশিরা নিশ্চিন্ত ঘুমে।
সেনাপতি দাড়ি-গোঁফওয়ালা দলপতিকে ডাকল। গলা নামিয়ে বলল, দুজন জলে নামো। ডুব সাঁতার দিয়ে জাহাজটার হালের কাছে ওঠো। কোনো শব্দ না হয় যৈন। হাল বেয়ে জাহাজের ডেকে উঠবে। কেউ কেউ ডেকেও শুয়ে থাকতে পারে। ওদের দৃষ্টি এড়িয়ে কাঠের পাটাতনটা আস্তে আস্তে পেতে দেবে। পাটাতন দিয়ে উঠে সৈন্যরা আক্রমণ করবে। যাও। জলদি।
দাড়ি গোঁফওয়ালা দলপতিসঙ্গী জোগাড় করে সমুদ্রের ধারে এল। জলে কোনো শব্দ না তুলে নামল। ডুব দিল দুজনে। হালের কাছে গিয়ে ভেসে উঠল। হালে পা রেখে রেখে ঝুলন্ত দড়িদড়া ধরে ডেকে উঠে এল। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দেখল চার-পাঁচজন বিদেশি ডেকে শুয়ে ঘুমুচ্ছে।
দুজনে পা টিপে টিপে সিঁড়িঘরের কাছে এল। পাটাতনটা পড়ে আছে দেখল। দুজনে মিলে পাটাতনটা নিয়ে জাহাজের মাথার কাছে এল। আস্তে আস্তে পাটাতনটা তীরের বালিমাটিতে ঠেকিয়ে পেতে দিল। সমুদ্রের বাতাস জোরে বইছে। সিনেত্রা ও অন্যেরা আরামে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। তাদের মধ্যে নজরদার পেড্রো, জাহাজচালক ফ্লেজারও রয়েছে। হ্যারি কেবিনঘরে ঘুমিয়ে আছে।
অল্পক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা একে একে দ্রুত জাহাজের ডেকে উঠে এল। ঘুমন্ত সিনোদের ঘিরে দাঁড়াল ওরা। দাড়ি গোঁফওয়ালা এগিয়ে এল। খোলা তরোয়ালের ডগা দিয়ে সিনেত্রাকে এক খোঁচা দিল। বার তিনেক খোঁচা দিতে সিনেত্রা ধড়মড় করে উঠে বসল। খোলা তরোয়াল হাতে চারদিকে দাঁড়ানো সৈন্যদের দেখে ও তো হতবাক। দাড়ি গোঁফওয়ালা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চাপাস্বরে বলল, চুপ, কোনো শব্দ নয়। সিনেত্রার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরুলনা। সৈন্যরা এবারতবোয়ালের খোঁচা দিয়ে যে ছ-সাত জন ভাইকিং ডেকেঘুমোচ্ছিল তাদেরজাগাল। সবাইউঠেবসল। তখনও ওদেরঘুমেরভাবকাটেনি। সবাইবুঝললড়াইয়ের কোনো সুযোগ নেই। ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি এভাবে বন্দীদশা মেনে নিতে হবে। দাড়ি গোঁফওয়ালার নির্দেশে এবার সৈন্যরা সিঁড়িঘরের দিকে গেল। সিঁড়িতে কোনোরকম শব্দ না তুলে ওরা কেবিনঘরগুলোতে ঢুকতে লাগল। ঘুমন্ত ভাইকিংদের ঘুম ভাঙিয়ে ওপরে। ডেকে নিয়ে আসতে লাগল। মারিয়া, ভেনও বাদ গেল না। মারিয়াকে দেখে সৈন্যরা অবশ্য একটু অবাকই হল। কিন্তু তাকেও রেহাই দিল না। সবাইকে ডেকে এনে সারি দিয়ে বসান হল। সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।
রাত শেষ হয়ে এল। কালো আকাশে সাদা রং ধরল। একটু পরেই পূবে সূর্য উঠল। সকালের নিস্তেজ বোদ ছড়াল আকাশে সমুদ্রে জাহাজে।
দাড়ি-গোঁফওয়ালা গলা চড়িয়ে বলল, রাজা জোস্তাকের হুকুমে তোমরা সব বন্দী হলে। জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বা ছুটে পালাতে গেলে মরবে। চলো সবাই।
সৈন্যদের প্রহরায় ভাইকিংরা একে একে জাহাজ থেকে নেমে এলো। সৈন্যরা ওদের ঘিরে নিয়ে চলল রাজধানীর দিকে। সমুদ্রের দিক থেকে দমকা হাওয়া ছুটে আসছে। বালি উড়ছে। তোদও চড়েছে। তার মধ্যে দিয়ে ভাইকিংরা চলল।
হাঁটতে হাঁটতে সিনেত্রা হ্যারিকে বলল, ফ্রান্সিসরাও বন্দী। আমরাও বন্দী হলাম। মুক্তির কোনো উপায়ই তো দেখছি না।
ফ্রান্সিসের ওপর ভরসা রাখো। ও নিশ্চয়ই একটা উপায় বের করবে। হ্যারি বলল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকাল। দেখেই বুঝল–এই রোদের মধ্যে গরম বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে রাজকুমারীর বেশ কষ্ট হচ্ছে। ও ভাবল দাড়ি-গোঁফওয়ালাকে রাজকুমারীর এই কষ্টের কথা বলবে। দেখা যাক সৈন্যটি কী বলে?
ও দাড়ি-গোঁফওয়ালার কাছে এল। বলল, একটা কথা বলছিলাম।
কী কথা? সৈন্যটি বেশ গম্ভীর গলায় বলল।
সেনাপতি কি চলে গেছেন? হ্যারি জানতে চাইল।
হ্যাঁ। তাকে কীসের দরকার।
বলছিলাম, ঐ মেয়েটি আমাদের দেশের রাজকুমারী। উনি এই বন্দীদশা, এত কষ্ট সহ্য করতে পারছেন না।
সহ্য করতে হবে। রাজা জোস্তাকের হুকুম সবাইকে বন্দী করে নিয়ে যেতে হবে। কারো রেহাই নেই।
রাজকুমারীকে আর বয়স্ক ভেনকে জাহাজে রাখলে ভালো হত। ওঁরা তো আর জলে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে পারবেন না।
কোনো কথা নয়। সবাইকে অস্ত্রঘরে বন্দী থাকতে হবে। তোমার বন্ধুরা আমাদের ফাঁকি দিয়ে একবার পালিয়েছে। বারবার পারবে না। দাড়ি-গোঁফওয়ালা বলল।
হ্যারি আর কোন কথা বলল না। মারিয়ার কাছে এল। বলল, রাজকুমারী, বুঝতে পারছি আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে। ওদের বললাম সে কথা। কিন্তু আমার কথা কানেই তুলল না।
না না, মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ওদের কোনো অনুরোধ করতে যেও না। তোমরা কষ্ট সহ্য করছ আর আমি পারব না?
ঠিক আছে। এ ব্যাপারে ফ্রান্সিস কী করে দেখি। হ্যারি বলল।
