বেশ অল্পদিনের মধ্যেই জাহাজটা ইউরোপের কাছাকাছি এসে গেলো। তারপর দিন দশেকের মাথায় ভাইকিংদের রাজধানীর ডক-এ এসে লাগল। তখন ভোর হয়েছে। সবে। বন্দরে লোকজন বেশি ছিল না। এরকম কত জাহাজ তো আসে। ওরা সেইভাবেই এক নজর তাকিয়ে জাহাজটাকে দেখলো শুধু।
ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুদের আর তর সইল না। জাহাজ ডক-এ লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে ওরা লাফিয়ে নেমে পড়ল। যে যার বাড়িতে চলে গেল। ওদের মুখেই শহরবাসীরা প্রথম জানতে পারল ফ্রান্সিস দুটো বিরাট হীরের খন্ড আর জলদস্যু ক্যাপ্টেন লা ব্রুশের ধনসম্পদ বোঝাই করে ফিরেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল।
এদিকে জাহাজে হীরে দু’টো আর লা ব্রুশের ধনসম্পদ পাহারা দেবার লোকের অভাব পড়ে গেল। অনেকেই বাড়ি চলে গেছে, বাকি যারা রইল, তারাও বাড়ি যাবার জন্যে ছটফট করতে লাগল। ফ্রান্সিসকে তারা তাদের ছেড়ে দেবার জন্যে বারবার অনুরোধ করতে লাগল। ফ্রান্সিস আর কি করে? ও তখন একজনকে রাজার কাছে পাঠাল। সংবাদ দিল রাজাকে যে আমরা অত্যন্ত মূল্যবান কিছু জিনিস এনেছি, আপনি জাহাজ পাহারা দেবার জন্যে কিছু সৈন্য পাঠান।
কিছুদিনের মধ্যেই ঘোড়ায় চড়ে একদল সৈন্য এল। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হ’ল। এবার ওদের হাতে পাহারার ভার দিয়ে ও আর হ্যারি বাড়ি যেতে পারবে। কিন্তু ফ্রান্সিসদের আর বাড়ি যাওয়া হল না। সৈন্যদের মধ্যে যে নেতা ছিল, সে ফ্রান্সিসের হাতে একটা চিঠি দিল। রাজা লিখেছেন–তোমার কথামত সৈন্য পাঠালাম। তুমি আর হ্যারি জাহাজ থেকে নামবে না। তোমাদের উপযুক্ত সম্বর্ধনা জানাবার ব্যবস্থা করছি।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে চিঠিটা দেখাল। হ্যারি হেসে বললো–সোনার ঘন্টা আনার সময় তো আমরা ছিলাম না। তাই এবার আমাদের সম্বর্ধনা জানিয়ে সেটা পুষিয়ে দেবে।
কাজেই ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে জাহাজেই থাকতে হ’ল। ওদের আর বাড়ি যাওয়া হ’ল না। অন্য সব ভাইকিং বন্ধুদের ওরা বাড়ি চলে যেতে বললো।
এর মধ্যেই খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। জাহাজঘাটায় মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল। সবাই নির্বাক বিস্ময়ে হীরে দুটো দেখছে। আস্তে-আস্তে ভিড় বাড়তে লাগল। ঘন্টাখানেক না যেতেই বিরাট জনারণ্যের সৃষ্টি হ’ল। ডক-এর সামনে রাস্তাঘাট লোকে ভরে গেলো। সবাই ফ্রান্সিসকে দেখতে চায়। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে আসুক, জোর গলায় লোকেরা এসব বলতে লাগলো। হ্যরি বললো–ফ্রান্সিস একবার ডেক-এ উঠে ওদের সামনে দাঁড়াও। ওরা তোমাকে দেখতে চাইছে। ফ্রান্সিস বিরক্তির সঙ্গে বললো–এ সব আমার ভালো লাগে না।
–তবু ওরা চাইছে, তোমারই তো স্বদেশবাসী। যাও। হ্যারি বললো, ফ্রান্সিস ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল–তাহলে তুমিও চলো।
–বেশ—
দু’জনে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে ওপরে ডেক-এ এসে দাঁড়াতেই জাহাজঘাটার জনারণ্য আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল। সে কি বিপুল হর্ষধ্বনি দিতে লাগল।
হঠাৎ জনসাধারণের মধ্যে চাঞ্চল্য জাগলো। রব উঠল রাজা আসছেন–রাজা আসছেন। জনতা সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দিলো। সামনে সুন্দর পোষাক সজ্জিত রাজার দেহরক্ষীদল ঘোড়ায় চড়ে আসছে পেছনে রাজার গাড়ি। কালো দামী কাঠের গাড়ি। ধবধবে সাদা চারটে ঘোড়া টেনে আনছে। গাড়ির গায়ে সোনালি-রূপালী রঙের কত কারুকাজ। মাথাটা খোলা। সামনে কোচম্যান বসে আছে। লাল-সাদা কি সুন্দর পোষাক তার পরনে। মাথার টুপিতে সোনালি ঝালর। ঘোড়াগুলোর পিঠেও সোনালি ঝালর দেওয়া সাজ। গাড়ির ভেতরে মুখোমুখি দু’টো বসার গদি। তাতেও নানা কারুকাজ। একদিকের আসনে বসে আছেন রাজা আর রাণী। বিশেষ উৎসবের দিনে তারা যেমন পোষাক পরনে, আজকেও পরণে তেমনি পোক। রাণীর পরণে ধৰ্ধবে সাদা পোষাক, তাতে সোনালী জরির সূক্ষ্ম কাজ করা। রাজার পরণে সবুজ রঙের পোষাক। তবে বোতামগুলো সোনার। মাথায় হীরে বসানো সোনার মুকুট।
রাজা-রাণীকে দেখে সেই বিরাট জনারণ্যে হর্ষধ্বনি উঠল। রাজার দীর্ঘজীবন কামনা করে ধ্বনি উঠল। রাজা-রাণী হাসিমুখে সকলের দিকে হাত নাড়াতে লাগলেন। রাজার গাড়ির পেছনে আরো কয়েকটা সুসজ্জিত গাড়ি? তাতে আসছেন মন্ত্রী অর্থাৎ ফ্রান্সিসের–বাবা ও গণ্যমান্য আমাত্যরা।
রাজার গাড়ি এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজটার কাছে থামল। বাঁধানো ডক থেকে জাহাজ পর্যন্ত একটা কাঠের তক্তা আগে থেকেই ফেলা ছিল। রাজা-রাণী নামলেন। তারপর তক্তাটার ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে জাহাজটায় উঠলেন। ফ্রান্সিস আর হ্যারি এগিয়ে এল রাজা ফ্রান্সিসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হ্যারিকে। ফ্রান্সিস রাজাকে হীরের গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। একজন সৈন্য ছেঁড়া পালের ঢাকাটা খুলে দিলো। তখন সূর্যের আলো পড়ল হীরে দু’টোর ওপর। কি অপূর্ব তেজালো দ্যুতি বেরোতে লাগলো হীরে দু’টো থেকে। হাজার-হাজার বিস্ময়াবিষ্ট মানুষগুলোর মুখে কোন কথা নেই? রাজাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঘুরে-ঘুরে হীরে দুটো দেখতে লাগলেন। এত বড় হীরে? এতো অবিশ্বাস্য! রাজার চোখ-মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি এবার পেছন ফিরে জাহাজঘাটার জনারণ্যের দিকে তাকিয়ে হাত তুললেন। সব গোলমাল, গুঞ্জন থেমে গেল। রাজা গা চড়িয়ে বলতে লাগলেন দেশবাসীগণ, ফ্রান্সিস, হ্যারি আর তাদের বীর সহগামীরা যে দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে এই হীরে দু’টো এনেছে, তার জন্যে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাদের সম্মানার্থে আমি সারা দেশে আজ থেকে তিনদিন উৎসবের দিন বলে ঘোষণা করলাম। দেশবাসীগণ, –আপনারা তাদের দীর্ঘজীবন কামনা করুন!
