সে সব বুঝি না। রাজার হুকুম। সেনাপতি কথাটা বলে চলে যেতে উদ্যত হল।
ফ্রান্সিস বলল, আমরা রাজার সঙ্গে দেখা করব।
বললাম তো, রাজার সঙ্গে দেখা হবে না।
আমাদের অনুরোধ–রাজাকে একবার বলে দেখুন। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। বলছি। সেনাপতি চলে গেল।
শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, এরকম অনুরোধ আর করো না।
উপায় নেই শাঙ্কো, এরা আমাদের জাহাজ আক্রমণ করবে। বন্ধুদের বন্দী করবে। বন্ধুরা অস্ত্র হাতে নেবার সময়ও পাবেনা। বন্ধুদের বাঁচাতে রাজার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।
কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি অস্ত্রঘরের দরজার সামনে এসে বলল, তোমাদের কপাল ভালো। রাজা দেখা করবেন। রাজসভায় চলো।
প্রহরীদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা রাজবাড়ির দিকে চলল। রাজসভায় যখন পৌঁছল তখন সেখানে বিচারপ্রার্থী বেশি নেই। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
বিচার পর্ব শেষ হলে সেনাপতি তার আসন থেকে উঠে রাজার কাছে গেল। কিছু বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের রাজার সিংহাসনের দিকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে গেল।
বল, তোমাদের কী বলবার আছে। রাজা বেশ গম্ভীর গলায় জানতে চাইল।
মান্যবর রাজা, শুনলাম আমাদের জাহাজের বন্ধুদের বন্দী করার হুকুম দিয়েছেন।
হ্যাঁ, আজ রাতেই সবাইকে বন্দী করে আনা হবে। রাজা বলল।
কিন্তু কেন? আমাদের অপরাধ? ফ্রান্সিস বলল।
কৈফিয়ৎ চাইছ? তোমাদের সাহস তো কম নয়।
আমরা বন্দী। আপনার দয়ায় বেঁচেআছি। আপনার কাছে কৈফিয়ৎ চাওয়ার ধৃষ্টতা আমাদের নেই। শুধু এই অনুরোধ জানাই-বন্ধুদের বন্দী করবেন না।
আমরা পালিয়েছিলাম, কয়েদ ঘরে আগুন লাগিয়েছিলাম। এই অপরাধের জন্যে আমাদের তিনজনকে যে শাস্তি দেবেন মেনে নেব। দয়া করে বন্ধুদের বন্দী করবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
না, না। কাউকে রেহাই দেব না। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল রাজা মনস্থির করে ফেলেছে। কোনোভাবেই বোঝানো যাবেনা। রাজা ওদের জাহাজ আক্রমণ করবেই। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল, ঠিক আছে। একটা অনুরোধ রাখুন। অস্ত্রঘরে একটাও জানালা নেই। দরজা বন্ধ থাকে। দারুণ গরমে বদ্ধ ঘরটায় আমরা আর কিছুদিন থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়ব।
উপায় কি। অস্ত্রঘর তো শোবার ঘর নয়। রাজা বলল।
বলছিলাম, আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখুন। কিন্তু দরজাটা খুলে রাখতে বলুন। প্রহরীর। সংখ্যা বাড়ান। আমরা পালাব না।
তোমাদের বিশ্বাস কী? দরজা দিন রাত বন্ধ থাকবে। শুধু খাবার দেবার সময় খোলা হবে। রাজা মাথা এপাশ ওপাশ করল।
ফ্রান্সিস ভালো করেই বুঝল এই রাজাকে কোনো অনুরোধেই রাজি করানো যাবে না। উপায় নেই। পালাবার ছক কষতে হবে।
ফ্রান্সিসরা অস্ত্রঘরে ফিরে এলো। প্রহরীরা দরজা বন্ধ করে দিল। শাঙ্কো মেঝেয় বসতে বসতে বলল, তাহলে বন্ধুদের বন্দী করে এই ঘরেই রাখা হবে।
হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল, আবার পালাতে হবে। কিন্তু যা বুঝছি সেনাপতি খুব ধুরন্ধর মানুষ। ও বন্ধুদের সাবধান হবার সময় দেবেনা। মনে হচ্ছে আজ রাতেই আক্রমণ করবে। ওদের আগে থেকে জানাতে পারলে তবু একটা লড়াই হত। কিন্তু সেনাপতি সেই সুযোগ দেবে না।
খাবার দেবার সময় প্রহরীদের কজা করা যাবে না? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।
সম্ভব নয়। ওরা চার-পাঁচ জন অস্ত্র হাতে পাহারা দেবে। নিরস্ত্র আমরা এই ঘর থেকে বেরোতে পারব হয়তো। কিন্তু পালাতে পারব না। ধরা পড়ে যাব। আহত হব। আমাদের মেরে ফেলতেও কসুর করবে না। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো আর কোনো কথা বলল না। বুঝল ভীষণ বিপদে পড়েছে ওরা।
ওদিকে একটু রাত বাড়তেই সেনাপতি সৈন্যদের লম্বাটে ঘরের বারান্দায় এল। সঙ্গে সেই দাড়ি গোঁফওয়ালা সৈন্যটি। সেনাপতি তাকে বলল, যাও, সবাইকেঘুম থেকে ওঠাও। নতুন অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াতে বলল। দেখবে, বেশি গোলমাল হৈচৈ যেন না হয়।
দাড়ি-গোঁফওয়ালা দলপতি আরও কয়েকজন সৈন্য নিয়ে সৈন্যদের ঘরে ঢুকে সবার ঘুম ভাঙল। সেনাপতির আদেশের কথা বলল। সৈন্যরা নতুন অস্ত্রঘর থেকে তরোয়াল, বর্শা নিয়ে এসে সৈন্যাবাসের বারান্দায় দাঁড়াল। ঘোড়সওয়ার সৈন্যদেরও খরব দেওয়া হল। একটু পরে ঘোড়সওয়ার সৈন্যরাও ঘোড়া ছুটিয়ে এল। সেনাপতি সবাইকে বলল, জাহাজঘাটে বিদেশিদের একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। সেই জাহাজ আক্রমণ করে ওখানে যারা আছে তাদের বন্দী করতে হবে। সাবধান, কোনোরকম শব্দ যেন না হয়। নিঃশব্দে কাজ সারতে হবে। চলো সব।
প্রথম ঘোড়সওয়ার, পেছনে অন্য সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে জাহাজঘাটের দিকে চলল। সেনাপতি একটা সাদা ঘোড়ায় উঠে সৈন্যদের পেছনে পেছনে চলল।
সৈন্যরা একেবারে নিঃশব্দে কাজ সারতে পারল না। এতে সৈন্যের চলাচলে মৃদু কি কথাবার্তায় শব্দ হল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও অসহ্য গরমে প্রায় জেগেই ছিল। বুঝল সৈন্যরা ওদের জাহাজ আক্রমণ করতে যাচ্ছে। ও মৃদুস্বরে ডাল, শাঙ্কো?
জেগে আছি। সেনাপতি তার পরিকল্পনা মতো চলেছে। শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল। তারপর উঠে বসে বলল। বন্ধুদের সাবধান করতে পারলাম না। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আক্রমণ বন্ধুদের হার স্বীকার করতেই হবে।
সবই মেনে নিতে হবে। শুধু ভাবছি-বন্ধুদের এনে এই ঘরে বন্দী করবে। মারিয়া, বয়স্ক ভেনকেও রেহাই দেবে না। এই অসহ্য কষ্ট ওরা দুজন সহ্য করবে কী করে! তাছাড়া সবাইকে নিয়ে পালানোও প্রায় অসম্ভব।
