–একটু দাঁড়াও। ফ্রান্সিস এত কাছে। ও নিশ্চয়ই আমাদের ডেকে কিছু বলবে। , তখনই ফ্রান্সিস মুখ তুলে জাহাজের দিকে তাকাল। বন্ধুদের হাতে তোয়াল দেখেই ও বুঝল বন্ধুরা লড়াইয়ের জন্যে তৈরি। ভোরের নরম আলোয় হ্যারি এবার ফ্রান্সিসদের মুখ চোখ স্পষ্ট দেখতে পেল। বুঝল ওরা ভীষণ ক্লান্ত অশ্বারোহী সৈন্যরা ওদের অনেক দূর তাড়া করে এসে ধরেছে। ফ্রান্সিস তখন বুঝতে পেরেছে। বন্ধুরা যে কোন মুহূতে নেমে আসতে পারে। ফ্রান্সিস রাস্তার দিকে তাকাল। দেখল সৈন্যদল আসছে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে গোঁফওয়ালা দলপতি। ভীষণ বিপদ সামনে। ও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যথাসাধ্য গলা চড়িয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব আমার কথা শোন। কেউ জাহাজ থেকে নামবে না। লড়াই নয়। আমরা ধরা দিয়েছি। যে করেই হোক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এখন লড়াইয়ে নামলে আমরা কেউ বাঁচবো না।
হ্যারিও দু’হাত তুলে বলে উঠল, ভাই সব, ফ্রান্সিসের কথা মেনে চলো। বন্ধুরা সব তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
ততক্ষণে খোলা তরোয়াল হাতে দলে দলে সৈন্যরা এসে জাহাজঘাটে জড়ো হলো। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা এবার বুঝতে পারল ফ্রান্সিস সঠিক কথাই বলেছে। এত সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করতে যাওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়।
ওদিকে বেশ কয়েকজন খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের পিঠে তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে রাজধানীর দিকে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে শুরু করল। ওরা এই ভেবে নিশ্চন্ত হল যে একটা অবধারিত লড়াই এড়ানো গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে বিনেলো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, খুব বুদ্ধি করে পালিয়েছিলাম কিন্তু ধরা পড়তে হল। এবার কোথায় আমাদের বন্দী করে দেখি।
নিশ্চয়ই মজবুত কোনো ঘরে আটকাবে। পাহারার কড়াকড়িও বাড়াবে। ওর মধ্যেই পালাবার ছক কষতে হবে।
পারবে? বিনেলো একটু হতাশার সঙ্গেই বলল।
সব দেখিটেখি। উপায় একটা বের করতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
— ফ্রান্সিসদের রাজবাড়ির সামনে নিয়ে আসা হল। রাজবাড়ির সদর দেউড়িতে সেনাপতি ফ্রান্সিসদের দেখে সেনাপতি দুজন প্রহরীকে কী বলল। প্রহরী দুজন এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। রাজবাড়ির পুব কোনায় একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে এসে প্রহরী দুজন দাঁড়াল। একজন প্রহরী কোমরে ঝোলানো চাবির গোল গোছা থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলল। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কয়েকজন এসো। অস্ত্রশস্ত্র বার করতে হবে। বোঝা গেল এটা অস্ত্রঘর। অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে ফেলে এই ঘরেই ফ্রান্সিসদের বন্দী করে রাখা হবে। প্রহরী আর সৈন্যরা মিলে ঢাল তরোয়াল বর্শা ঘর থেকে বের করে এনে ঘরের সামনে পাকার করল। সৈন্যরাও তাদের অস্ত্রশস্ত্র রাখল সেখানে।
ফাঁকা ঘরে ফ্রান্সিসদের ঢোকানো হল। দমবন্ধ করা ঘর। লোহা আর কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা। ফঁকফোকর বলে কিছু নেই। এই দিনের বেলায়ও ঘর অন্ধকার। ঘরের ভেতরে বেশ গরম। পাথরের মেঝেয় ঘাসপাতা বিছানো নেই। কঠিন পাথরের মেঝেয় ফ্রান্সিস বসে পড়ল। পাশেশাঙ্কো-বিনোলা বসল।
এই ঘরে তো দমবন্ধ হয়ে মরে যাব। শাঙ্কো বলল মৃদুস্বরে।
হুঁ। এখানে কীভাবে পাহারা দেয়, কীভাবে খেতে দেয় এসব দেখি। তারপর পালাবার ছক কষব। তবে পালানো খুব সহজে হবে না! লড়াইও করতে হতে পারে। দেখা যাক। তখনই ওরা দেখল চারজন প্রহরী এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। হাতে খোলা তরোয়াল। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।
দুপুরে দরজা খোলা হল। দুজন প্রহরী দরজায় দাঁড়াল। বাকি দুজন বাইরে রইল। দুজন রাঁধুনি খাবার দিয়ে গেল। রুটি, মাছ আর আনাজের ঝোল। ফ্রান্সিসরা খাবার– চেয়ে নিয়ে পেট ভরে খেল। সন্ধ্যা হল। প্রহরী একটা মশাল জ্বেলে দিয়ে গেল।
রাতে অসহ্য গুমোট গরমে ফ্রান্সিসদের প্রায় ঘুমই হল না।
ভোর হতে শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, আমরা তো গরমে সেধ হয়ে যাব।
দেখছি। সেনাপতির সঙ্গে কথা বলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সকালে সেনাপতি এলে দরজা খোলা হল।
সেনাপতি দরজায় এসে দাঁড়াল। একটু হেসে বলল, কয়েদঘরে আগুন লাগিয়ে পার পাবে ভেবেছিলে। এবার এই অস্ত্রঘরে মর।
এখনই মরবার ইচ্ছে নেই। শাঙ্কো বলল।
মরতে হবেই, সেনাপতি বলল।
একটা কথা বলছিলাম, ফ্রান্সিস বলল।
বলো। সেনাপতি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
ঘোড়ার আস্তাবলেও জানালা থাকে। এই ঘরে তাও নেই। ফ্রান্সিস বলল।
অস্ত্রঘরে কেউ জানালা রাখে না।
কিন্তু আমরা তো অস্ত্র নেই। মানুষ। আমাদের তো শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়।
তাহলে কি দেয়াল ভেঙে জানালা করে দিতে হবে? সেনাপতি একটু কড়া গলায় বলল।
তাহলে তো খুবই ভালো হয়। শাঙ্কো অমায়িক হেসে বলল।
আবদার! রাজাকে একবার বলে দেখ না। উল্টে তোমাদের হাত-পা বেঁধে রাখার হুকুম দেবে।
ঠিক আছে। এখন তো রাজা রাজসভায় আসবেন। আমাদের নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
কোনো লাভ নেই। সেনাপতি মাথা এপাশ-ওপাশ করে বলল।
তবু। আমাদের সমস্যার কথাটা একবার বলে দেখি।
তাহলে সত্যি কথাটাই বলি। সেনাপতি একটু থেমে বলল, আজ রাতেই তোমাদের জাহাজের সঙ্গীদের বন্দী করা হবে। সবাইকে এই ঘরে বন্দী করে রাখা হবে।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাহলে সেনাপতি অনেকদূর ভেবে রেখেছে।
বন্ধুদের আর সাবধান করার উপায় নেই। ওদের বন্দীদশা মেনে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস। বলল, আমাদের বন্দী করার অর্থ কি? আমরা তো রাজা জোস্তাকের কোনো ক্ষতি করিনি।
