–কী ব্যাপার? বাইরে এত গোলমাল কীসের? সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।
আজ্ঞে কয়েদঘরে আগুন লেগেছে। প্রহরী হাঁপধরা গলায় বলল।
–সে কী? কী করে আগুন লাগল? সেনাপতির প্রশ্ন।
আজ্ঞে –তা তো বলতে পারবো না। প্রহরীটি মাথা নেড়ে বলল।
-তুই যা। রাজা মশাইকে খবর দে। কয়েদ ঘরে আগুন লেগেছে। উনি যেন আসেন। সেনাপতি বলল। প্রহরী ছুটে বেরিয়ে গেল।
ওদিকে ফ্রান্সিস দেখল-ঝোঁপ জঙ্গল এলাকা শেষ। ডানদিকে কিছু দূর দিয়ে সদর রাস্তা। টানা চলে গেছে জাহাজ ঘাটের দিকে।
ফ্রান্সিস রাস্তার ধারে এসে একঝলক পেছনটা দেখে নিল? জ্যোত্সার নিষ্প্রভ আলোয় দেখা গেল রাস্তা জনশূন্য। যাক নিশ্চিন্ত। তখনই দেখল কয়েদঘরের ছাউনিতে আগুন লেগে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে। ওরা প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। ঝোঁপ-জঙ্গলের বাধা নেই। উন্মুক্ত রাস্তায় ওদের চলার গতি বেড়ে গেল। সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া ছুটে আসছে। ধূলো বালি উড়ছে। চোখ কুঁচকে ওরা ছুটল প্রাণপণে।
সেনাপতি দ্রুত কয়েদঘরের দিকে চলল। জ্বলন্ত কয়েদ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি প্রহরীদের জিজ্ঞেস করল–ঘরে তিনজন বিদেশি ছিল। তারা কোথায়?
–বোধহয় পুড়ে মরে গেছে। একজন প্রহরী বলল।
কী করে বুঝলি? ওদের চিৎকার কান্নাকাটি শুনতে পেয়েছিলি? সেনাপতিজিজ্ঞেস করল।
–আজ্ঞে না। প্রহরীটি মাথা এপাশ ওপাশ করল।
–আগুনে পুড়তে থাকলে নিশ্চয়ই চীৎকার চ্যাঁচামেচি করতো। কথাটা বলে সেনাপতি এগিয়ে পোড়া ঘরের দিকে তাকাল। তখন কয়েদ ঘরের দরজা ভেঙে পড়ে গেছে। ওপরের জ্বলন্ত ছাউনি থেকে কাঠ পাথর ভেঙে পড়ছে। আগুনের আভায় ঘরের ভেতরে ভালো করে দেখল সেনাপতি। না কোন পোড়া শরীর পড়ে নেই। সঙ্গে সঙ্গে বুঝল বন্দীরা পালিয়েছে। পালাবার আগে আগুন লাগিয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে পালাল? সেনাপতি পোড়া কয়েদ ঘরের ওপাশে গেল। আগুনের আভায় সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখল পেছনের উঁচু গাছটার একটা মোটা ডাল থেকেকয়েদঘরের মোটা দড়িটা ঝুলছে। তার মানে যে করেই হোক খোদল দিয়ে দড়ি ধরে নেমে পালিয়েছে। একটু দূরে দাড়ি গোঁফওয়ালা দলপতি জল ছিটানোর তদারিক করছিল। সেনাপতি ইশায় তাকে ডাকল। জাহাজঘাটায় নোঙর করা আছে–তাই না?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। দলপতি মাথা ওঠানামা করল।
-বন্দীরা পালিয়েছে। নিশ্চয়ই জাহাজঘাটায় যাবে। তুমি সাতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্য নিয়ে এক্ষুনি এসো। জলদি। জাহাজে ওঠার আগেই ওদের বন্দী করতে হবে। বালির ওপর দিয়ে ওঁরা জোরে ছুটতে পারবে না। ধরা পড়বেই। সেনাপতি বলল।
দলপতি দ্রুত ছুটল সৈন্যবাসের দিকে।
তখনই রাজা জোস্তাক সেখানে এল। দেখল খোলা কয়েদঘরে কাঠামো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। সেনাপতি রাজার কাছে এল। যে যা ভেবেছে যা করেছে সে সব মৃদুস্বরে বলল। সেই সময় সাতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্যশূন্যে ভোলা তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে তাদের কাছে এল। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল–বিদ্যুৎগতিতে জাহাজঘাটের দিকে ঘোড়া ছোটাও। বন্দীরা ঐ জাহাজ ঘাটের দিকেই পালাচ্ছে। বন্দীদের পাকড়াও করো। সাতজন ঘোড়সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ছোটাল। এবার সেনাপতি বাকি সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল- তোমরাও যাও। ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের সাহায্য করবে। বন্দীদের ধরা চাই। কিন্তু ওদের দলকে ধরতে জাহাজে উঠবেনা। পরে এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে কবজা করবে। কাজেই ওদের সঙ্গে এখন লড়াই নয়।
সৈন্যরা দলপতির নেতৃত্বে চিৎকার করতে করতে জাহাজঘাটের দিকে ছুটল।
ওদিকে ফ্রান্সিসদের ছোটার গতি কমে এল। কারণ বালির রাস্তায় এসে পড়েছে তখন। বালিতে পা হড়কে যাচ্ছে। পা চেপে বসছে না। ফ্রান্সিস আবার বাঁ পায়ে তেমন জোর করে পাচ্ছিল না। মাঝে মাঝেই একটু পিছিয়ে পড়ছিল। শাঙ্কো বিনোলা একটু থেমে ফ্রান্সিসের কাছে আসছিল। আবার তিনজন একসঙ্গে ছুটছিল। তিনজনেই তখন ভীষণ হাঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিস হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল। ওরই কষ্ট হচ্ছিল বেশি। ফ্রান্সিস দ্রুতএকবার পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল–ধূলোবালি উড়িয়ে একদল ঘোড়সওয়ার সৈন্য ছুটে আসছে। সামনে তাকিয়ে ওদের জাহাজটা দেখল। কিন্তু বেশ দূরে জাহাজঘাট। ফ্রান্সিস হাঁপানো গলায় বলল–জোরে ছোটো। ছুটতে ছুটতে তখন ওরা জাহাজ ঘাটের অনেক কাছে চলে এসেছে। ও আবার পেছন দিকে তাকাল? অশ্বারোহী সৈন্যদল দুরন্ত গতিতে অনেক কাছে চলে এসেছে। বুঝল–শেষ রক্ষা হবে না। জাহাজঘাট পর্যন্ত দূরত্ব আর বেশি বাড়ানো যাবো না। তবু ছুটল। প্রাণপণে। জাহাজঘাটের কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে অশ্বারোহী সৈন্যরা চীৎকার করতে করতে প্রায় ওদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। অশ্বারোহী সৈন্যরা ওদের ধরে ফেলল। জাহাজঘাটতখন হাত কুড়ি দূরে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বালির ওপর বসে পড়ল। মুখ হাঁ করে হাঁপাতে হাঁপাতে যথাসাধ্য গলা চড়িয়ে বলে উঠল–শাঙ্কো বিনোলা–দাঁড়াও ছোটার চেষ্টা করো না। ওরা তরোয়াল চালাবে। বসে পড়ো। সত্যি-সৈন্যরা নিরস্ত্র ওদের তরোয়োল চালিয়ে হত্যা করতে পিছু পা হবে না। দুজনেই বালির ওপর বসে পড়ল। হাঁপাতে লাগল। তখন পূর্ব আকাশে লাল রং ধরেছে। সূর্য উঠতে বেশি দেরি নেই। সৈন্যদের চিৎকারের শব্দে জাহাজে তখন ফ্রান্সিস সব বন্ধুদের অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেছে। হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও বাইরে সৈন্যদের চিৎকার হৈ হল্লা শুনতে পেল। বুঝল– নিশ্চয়ই ফ্রান্সিসরা কোন বিপদে পড়েছে। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির দিকে ছুটল। চিৎকার করে বলতে লাগল ভাইসব তরোয়াল নাও। ডেকএ চলো। ফ্রান্সিসরা বিপদে পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে দ্রুতপায়ে উঠতে গিয়ে হ্যারি সিঁড়ির ধাপে পা আটকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। পেছনে থেকে এক বন্ধু ওকে ধরে ফেলল। ভাইকিংরা ছুটে গেল অস্ত্রঘরের দিকে। তরোয়াল নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেক এ উঠে এল। হ্যারি রেলিঙের কাছে ছুটে গেল। তখন সূর্য উঠছে। ভোরের আবছা আলোয় দেখল তীরের কাছে বালিয়াড়িতে কয়েকটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। একদল সৈন্য গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। গোলের মাঝখানে তিনজন বসে আছে। তখনই সূর্য উঠছে। এবার দেখল সেই তিনজন ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর বিনোলা। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। শাঙ্কো আর বিনোলা সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে আছে। সূর্য উঠল। সমুদ্রে জাহাজে তীর ভূমিতে আলো ছড়াল। হ্যারি বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। তখনই একজন বন্ধু তরোয়াল হাতে হ্যারির কাছে ছুটে এল। গলা চড়িয়ে বলল–হ্যারি পাটাতন ফেলাই আছে। ফ্রান্সিসদের ওরা বন্দী করেছে। নেমে লড়াই করে ফ্রান্সিসদের মুক্ত করতে হবে। চলো আর এক মুহূর্ত দেরি নয়।
